পশ্চিমবঙ্গে ভোট হওয়ার কথা ছিল তিন তিনটি দফার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের জমানার সিন্ডিকেটরাজ বনাম কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নমুলক কর্মসূচির। কিন্তু তা হয়নি।শেষ পর্যন্ত হিন্দু মুসলিম আর বাঙালি অস্মিতায় এসে দাঁড়িয়ে যায় এই রাজ্যের ভোট। এসআইআর এখানে প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির সাধারণ রাজনৈতিক লড়াই নয়। এ নির্বাচন এক অন্য রকম পরিস্থিতির ছবি দেখিয়েছে। রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের শাসক দল তৃণমূলকে একসঙ্গে দুই দিক থেকে লড়তে হয়েছে। একদিকে আছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিজেপি আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলি, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও আদালতের একাধিক সিদ্ধান্ত মিলিয়ে এ নির্বাচন স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে জরুরি অবস্থার পর সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
স্পষ্টতই এই হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো,ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনপ্রক্রিয়া,এসআইআর।প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি মানুষকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ২৭ লক্ষ মানুষের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে। এ তালিকা থেকে বাদ পড়া বা যাচাইয়ের মধ্যে থাকা মানুষগুলি অধিকাংশ মুসলিম, নমঃশূদ্র হিন্দু, বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজন। দরিদ্র পরিবারের মেয়েরাও এ প্রক্রিয়ার শিকার। নির্বাচন কমিশন একে সাধারণ নিয়মিত তালিকা সংশোধনের কাজ বলে দাবি করলেও বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। এই রাজ্যে ৩০ জন পর্যবেক্ষক পাঠানো হয়েছে, যেখানে উত্তরপ্রদেশে পাঠানো হয়েছে মাত্র ৪ জন। পশ্চিমবঙ্গে ৮ হাজার মাইক্রো-পর্যবেক্ষক রাখা হয়েছে। এটি অন্য কোথাও দেখা যায়নি। প্রায় সারা দেশের ৯৫ শতাংশ অফিসার বদলি হয়েছে শুধু এই এক রাজ্যে। এগুলোকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন।এর পেছনে রাজনৈতিক কারণই বেশ স্পষ্ট।
সাধারণভাবে নিয়ম হলো-প্রত্যেক নাগরিককেই ভোটার হিসেবে ধরা হয়, যতক্ষণ না প্রমাণ হয় তিনি অযোগ্য। কিন্তু এখানে বিষয়টা উল্টো হয়ে গেছে। এখন ভোটারদেরই প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে যে তারা সত্যিই ভোট দেওয়ার যোগ্য। এই প্রক্রিয়াকে যাঁরা রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁদের বক্তব্যেও নিরপেক্ষতার অভাব স্পষ্ট। এক বিজেপি নেতা সরাসরি বলেছেন, এক কোটি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। এসআইআরের কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই। ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ শব্দটি জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইনে কোথাও নেই। এই আইনের ২১ নম্বর ধারার তৃতীয় উপধারা অনুযায়ী বিশেষ সংশোধন করা যেতে পারে, কিন্তু তা কেবল একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা তার অংশের জন্য – পুরো একটি রাজ্যের জন্য নয়। নির্বাচন কমিশন বলেছে, গত ২০ বছরে জনসংখ্যার পরিবর্তনের কারণে এই সংশোধন দরকার ছিল। কিন্তু সেই কাজ করা হলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, নির্বাচনের ঠিক আগে। আইন এবং সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি- দুটোই বলছে, এমন কাজ অনেক আগেই করা উচিত ছিল।
২০২১ সালের নির্বাচনে যেসব আসনে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে এই বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছে। মোট ৫৭টি আসনে ৮ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে ফল হয়েছিল- এর মধ্যে ২৯টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, আর ২৮টি আসনে বিজেপি। এর মধ্যে ১৯টি আসনে ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ভোটেরও কম। সেই আসনগুলোর মধ্যে বিজেপি ১২ টিতে জয়ী হয়েছিল। এই তালিকার একটি আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৬৭৯ ভোট, অথচ সেখানে ৩৮ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে- যা জয়ের ব্যবধানের প্রায় ৫০ গুণ। নন্দীগ্রামে ব্যবধান ছিল ১,৯৫৬ ভোট, সেখানে বাদ পড়েছে ১৪,৪৬২ জন ভোটার। ভোটার তালিকা যাচাইয়ের আগেই দেখা যায়, প্রায় ১১১টি বিধানসভায় এমন সংখ্যার ভোটারকে যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছিল, যা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই সব আসনের জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। এই প্রক্রিয়া কার্যত এমন জায়গাগুলোতেই বিজেপিকে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে, যেখানে ভোটের ব্যবধান খুব কম এবং ফল যেকোনো দিকে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও থেকে যায়-যাদের নাম এখনো বাদ পড়েনি, তাদের মধ্যে কি নাগরিকত্ব হারানোর ভয় তৈরি হয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে তারা তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন? এই সম্ভাবনার বাস্তব প্রভাব জানার সময় এসে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ২৪০৭টি কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে যা প্রায় দুই লাখ চল্লিশ হাজার নিরাপত্তাকর্মীর সমান।এই সংখ্যা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মোতায়েন কেন্দ্রীয় বাহিনীর তুলনায় তিন গুণেরও বেশি এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। দেশের পাঁচটি প্রধান আধাসামরিক বাহিনীকে স্বাভাবিক কর্তব্যস্থল থেকে সরিয়ে এনে একটি মাত্র রাজ্যে কেন্দ্রীভূত করা হয়। অথচ এখানে কোনো সক্রিয় বিদ্রোহ বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পরিস্থিতিও নেই। তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী অবস্থায়, ছদ্মবেশী পোশাকে, সাঁজোয়া যানবাহনে চলাচল করতে দেখা যায়। এমনকী এই পাঁচ বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি সমন্বিত যৌথ কমান্ড কলকাতায় গঠন করা হয়। এটি কোনো রাজ্য নির্বাচনের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। স্পষ্টতই এই রাজ্যের ভোটারদের ওপর এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। ফলে স্বাধীনতার পর এই রাজ্যটিতে যত ভোট হয়েছে এই বারের ভোটে সর্বোচ্চ সংখ্যায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ভোটারেরা। এক কথায় রাজ্যটিতে ভোট কমেছে আবার ভোটার বেড়েছে। এই ভোট নিজ নাগরিকত্ব রক্ষার ভোট হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন ভোট না দিলে নাগরিকত্ব চলে যাবে- ফলে ভোটারেরা যতটা না বিভাজিত বিজেপি তৃণমূলে তাঁর চেয়ে বেশি এককাট্টা এসআরআইয়ে। তারই ফলাফল স্পষ্ট হবে গণনায়।