সন্দীপ বসু
শারদোৎসব মানে সাজেরও মহাপার্বণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন দুর্গাপুজোর আঙ্গিকে বদল এসেছে, পুজো ফ্যাশনেও তাই। অতীতে পুজোয় বাঙালিকে সাজাত শহরের পোশাকের দোকান আর গ্রামের হাটগুলি। সেখানেই মিলত পছন্দমতো শাড়ি, জামা, জুতো। সঙ্গে স্নো, পাউডার, পমেটম, কাজল, সেন্ট।
আটপৌরে বাঙালির গন্তব্য ছিল বড়বাজার। আর পকেটের জোর থাকলে স্টাইলিশদের জন্য ছিল নিউ মার্কেট। এসব হিসাব এখন আর পুজোবাজারে মেলে না। শহরের খোলা বাজার আর শপিংমলে মিলেমিশে গিয়েছে বাঙালির কেনাকাটার সাতকাহন। তাতে নোঙর ফেলেছে অনলাইন শপিংও। কেনাকাটার এই ভোলবদলই এবার পুজোর থিম!
সেই ভাবনাকে এবার সামনে এনেছে সাউথ সিটি মল। প্রথমবার দশভূজার আরাধনায় নেমেছে এই মল কর্তৃপক্ষ। আর সেখানেই ভাবনায় চমকে দিতে চলেছে তারা। কেনাকাটার এই বিবর্তনের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে বাঙালির দুর্গাপুজোর একাল-সেকালও থাকবে মণ্ডপজুড়ে। এই থিম ভাবনার পোশাকি নাম ‘যাত্রা’।
পুজোর থিম আর্টিস্ট শুভঙ্কর দত্তের কথায়, আগে বনেদি জমিদারবাড়িতেই শুধু পুজো হতো। সেখান থেকে ধীরে ধীরে বারোয়ারি পুজোর প্রচলন এল। এরপর থিম পুজোয় মাতল বাঙালি। মণ্ডপে বিভিন্ন মডেলের মাধ্যমে দেখানো হবে এই পরিবর্তন। প্লাই, বাঁশ, লোহার কাঠামো, খড় দিয়ে গড়ে উঠছে মণ্ডপ। এখানে একদিকে যেমন থাকবে পুরোনো কেনাকাটার হাট-বাজারের হরেক মডেল, তেমনই থাকবে শপিং মল। মাঝখানে বিশাল বনেদি বাড়ির এক কাল্পনিক ঠাকুরদালানে বিরাজ করবেন দশভূজা।
সাউথ সিটির সেন্টার ডিরেক্টর তথা এই পুজোর অন্যতম কর্মকর্তা দীপনারায়ণ বিশ্বাস বলেন, ‘পুজোর দিনগুলিতে সাউথ সিটির পাঁচ হাজার কর্মী মলেই কাজ করেন। তাঁদের উৎসাহেই এই পুজো। আমরা কারও থেকে চাঁদা নিইনি।
সবচেয়ে বড়ো কথা, মলের সামনের বিশাল জায়গায় কোনও গর্ত না করে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শেই শালবল্লার খুঁটি বসিয়ে গড়ে উঠছে মণ্ডপ। তবে প্রতিমা নিয়ে কোনও পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে না। একেবারে বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে একচালার সাবেকি দেবীমূর্তি দেখা যাবে।’
শিল্পী সনাতন পাল তৈরি করছেন প্রতিমা। সব রকম সরকারি বিধি কঠোরভাবে মেনেই চলছে মণ্ডপ তৈরির কাজ। একেবারে পেশাদারি ঢংয়ে মণ্ডপ শিল্পীদের হেলমেট পরিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।
মল কর্তাদের কথায়, ‘পুজোর সময় সাউথ সিটি খোলাই থাকবে। কাজেই ক্রেতাদের সঙ্গে পুজো দেখতে আসার ভিড় আমরা অত্যন্ত সুচারুভাবে সামলাতে চাইছি। একাধিক বাঁশের চ্যানেল থাকবে দর্শনার্থীর ভিড় সামাল দিতে।’
সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়, বিশেষভাবে সক্ষম, অসুস্থ ও প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য থাকবে পুজো দেখার বিশেষ সময় বা আলাদা স্লট থাকছে। সাউথ সিটি মলের হেল্পলাইনে ফোন করে দর্শনার্থীরা মণ্ডপে ঢোকার স্লট বেছে নিতে পারবেন। যে সময় ভিড়ের চাপ কম থাকে, সেই সময় প্রবীণ এবং দিব্যাঙ্গরা নিশ্চিন্তে সাউথ সিটিতে ঠাকুর দেখতে পারবেন।
উদ্যোক্তারা আরও জানিয়েছেন, পুজো দেখতে আসা শিশুদের হাতে পরানো হবে এক ধরনের ব্যান্ড। সেখানে অভিভাবকেরা ফোন নম্বর ও নাম লিখে দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলে ব্যান্ডে লেখা ওই ফোন নম্বর শিশুটিকে খুঁজে দিতে পারবে।
আবার মণ্ডপ থেকেই প্রয়োজনে দেওয়া হবে স্যানিটারি ন্যাপকিন। মোট কথা, বাঙালির শারদ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও বর্তমানকে এক থিমে জুড়তে চলেছে আক্ষরিক অর্থেই শহরের প্রথম শপিং মলের কর্পোরেট স্টাইলের এই পুজো। মণ্ডপ তৈরির আগে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করতে হয়েছে। যাতে কোনওরকমভাবে পুজোর সময় শপিং মলে কোনও সমস্যা তৈরি না হয়।