ডাঃ দীপজ্যোতি দাস
উত্তর–পূর্ব ভারতের বহু মধ্যবয়স্ক ও প্রবীণ পুরুষ এমন একটি সমস্যায় ভুগছেন, যা নিয়ে তারা প্রায়শই খোলাখুলি আলোচনা করতে চান না। সেই সমস্যার নাম Benign Prostatic Hyperplasia বা সংক্ষেপে BPH। অনেকেই এটিকে “বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন” ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে এই সমস্যাটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রতিদিন দেখছি—৫০ বছরের পর বহু পুরুষ ঘন ঘন প্রস্রাব, রাতের বেলা বারবার উঠতে হওয়া, প্রস্রাবের গতি কমে যাওয়া বা সম্পূর্ণ প্রস্রাব আটকে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পেছনে রয়েছে BPH।
এই প্রবন্ধে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করছি—BPH কী, কেন হয়, এর জটিলতা কী হতে পারে এবং কীভাবে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্ভব।
প্রোস্টেট হল পুরুষদের একটি গ্রন্থি, যা মূত্রথলির নিচে অবস্থিত এবং মূত্রনালীকে আংশিকভাবে ঘিরে রাখে। এর প্রধান কাজ হল seminal fluid-এর একটি অংশ তৈরি করা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের প্রভাবে এই গ্রন্থির কোষ সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই অস্বাভাবিক কিন্তু non-cancerous বৃদ্ধি-ই হল Benign Prostatic Hyperplasia।
এটি ক্যান্সার নয়, তবে লক্ষণ অনেক সময় প্রোস্টেট ক্যান্সারের মতো হতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
BPH সাধারণত ৫০ বছরের পর বেশি দেখা যায়। ৬০ বছরের পর প্রায় অর্ধেক পুরুষের মধ্যে কোনো না কোনো মাত্রায় প্রোস্টেটের বৃদ্ধি দেখা যায়। ৭০ বছরের পর এই হার আরও বাড়ে। Testosterone ও Dihydrotestosterone (DHT) নামক হরমোনের পরিবর্তন এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।
প্রোস্টেট বড় হলে তা মূত্রনালীকে চাপ দেয়। ফলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ধীরে ধীরে মূত্রথলিকেও বেশি কাজ করতে হয়, যার ফলে bladder wall মোটা হয়ে যায় এবং সম্পূর্ণ খালি হতে পারে না।
BPH-এর লক্ষণকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—Obstructive symptoms এবং Irritative symptoms।
Obstructive symptoms-এর মধ্যে রয়েছে প্রস্রাবের গতি কমে যাওয়া, শুরু করতে দেরি হওয়া, মাঝপথে থেমে যাওয়া, শেষে টপটপ করে পড়া এবং সম্পূর্ণ খালি না হওয়ার অনুভূতি।
Irritative symptoms-এর মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন প্রস্রাব, রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য উঠতে হওয়া (Nocturia), হঠাৎ প্রবল বেগ অনুভব করা (Urgency) এবং কখনো কখনো Urge incontinence।
অনেক রোগী প্রথমে বিষয়টি অবহেলা করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে Acute urinary retention হয়—অর্থাৎ হঠাৎ সম্পূর্ণ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র পেট ব্যথা শুরু হয়। এই অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে catheter বসাতে হয়।
দীর্ঘদিন untreated BPH থাকলে কিছু গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। বারবার মূত্রথলি সম্পূর্ণ খালি না হলে Residual urine জমে থেকে সংক্রমণ (Urinary Tract Infection) হতে পারে। Bladder stone তৈরি হতে পারে। ক্রমাগত চাপের কারণে কিডনির ওপর প্রভাব পড়ে Hydronephrosis এমনকি Chronic Kidney Disease পর্যন্ত হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব (Hematuria) রোগীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং রক্তাল্পতা পর্যন্ত হতে পারে।
BPH নির্ণয়ের জন্য প্রথমেই একটি বিস্তারিত ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা জরুরি। Digital Rectal Examination (DRE)-এ প্রোস্টেটের আকার ও গঠন বোঝা যায়। Serum PSA (Prostate Specific Antigen) পরীক্ষা করা হয়, যাতে প্রোস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা যায়। Ultrasound KUB ও Prostate volume পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ। Post-void residual urine পরিমাণ জানা দরকার। কিছু ক্ষেত্রে Uroflowmetry করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—PSA বাড়লেই ক্যান্সার, এমন নয়। BPH, সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণেও PSA সামান্য বাড়তে পারে। তাই বিশেষজ্ঞ মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা নির্ভর করে উপসর্গের মাত্রা ও জটিলতার ওপর। Mild symptoms থাকলে প্রথমে Lifestyle modification ও Watchful waiting করা যেতে পারে।
জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। রাতে ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত জল পান না করা, অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন কমানো, নিয়মিত প্রস্রাবের অভ্যাস করা এবং দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে না রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কারণ অতিরিক্ত চাপ প্রোস্টেটের উপসর্গ বাড়াতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থূলতা BPH-এর উপসর্গ বাড়াতে পারে। High-fat diet ও metabolic syndrome-এর সঙ্গে প্রোস্টেট বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
মাঝারি থেকে তীব্র উপসর্গে ওষুধ প্রয়োজন হয়। Alpha-1 blocker যেমন Tamsulosin বা Alfuzosin প্রোস্টেট ও মূত্রনালীর মাংসপেশি শিথিল করে, ফলে প্রস্রাবের প্রবাহ বাড়ে। 5-alpha reductase inhibitor যেমন Finasteride বা Dutasteride প্রোস্টেটের আকার ধীরে ধীরে কমাতে সাহায্য করে। কিছু ক্ষেত্রে দুটি ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া হয়।
ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যেমন মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, যৌন ইচ্ছা হ্রাস বা ejaculatory সমস্যা। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন।
যদি ওষুধে উপকার না হয় বা জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে সার্জারি বিবেচনা করা হয়। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো TURP (Transurethral Resection of Prostate)। এটি বহু বছর ধরে প্রমাণিত ও কার্যকর পদ্ধতি। বর্তমানে Laser prostatectomy, HoLEP (Holmium Laser Enucleation of Prostate) এবং অন্যান্য minimally invasive technique ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তুলনামূলক কম রক্তক্ষরণ ও দ্রুত আরোগ্য প্রদান করে।
Acute urinary retention হলে প্রথমে catheterization করে মূত্রথলি খালি করা হয়। পরে স্থায়ী সমাধানের জন্য চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—BPH ক্যান্সার নয়, তবে দুইটি সমস্যা একসঙ্গে থাকতে পারে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা ও PSA মনিটরিং জরুরি।
প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে BPH আটকানো সম্ভব না হলেও কিছু ঝুঁকি কমানো যায়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার এবং রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। Mediterranean-type diet বা সবজি, ফল, বাদাম ও মাছসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস উপকারী হতে পারে।
৫০ বছরের পর প্রত্যেক পুরুষের বছরে অন্তত একবার প্রোস্টেট মূল্যায়ন করা উচিত। পরিবারে যদি প্রোস্টেট ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তাহলে আরও আগে থেকে স্ক্রিনিং শুরু করা দরকার।
অনেক পুরুষ লজ্জায় বা অস্বস্তিতে সমস্যাটি গোপন রাখেন। ফলে রোগটি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হয়। মনে রাখতে হবে, এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ও চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যাওয়া শুধু অস্বস্তিকর নয়, দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই উপসর্গকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হলে পুরুষদের প্রোস্টেট স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা, সঠিক জীবনযাপন ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই একমাত্র পথ। লজ্জা নয়, সচেতনতা হোক প্রথম পদক্ষেপ। উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, পরিবারকে সুস্থ রাখুন।
লেখক- এম.ডি. ফিজিশিয়ান (জেনারেল মেডিসিন),
ফেলোশিপ ইন ডায়াবেটিস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি। Ex – Apollo Hospital (New Delhi)