বাসব মৈত্র
পিউকে কথা দেওয়া আছে বলে আর সুইসাইড করিনি।
সুইসাইড নোট: সেই এক কথা— ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’
দায়ী নয় যখন লড়ো।
সুইসাইডের জন্য সম্পর্ককে দায়ী করো না।
দাম্পত্যকে, প্রেমকে দায়ী করো না।
জেনারেশন গ্যাপ একটা প্রশ্ন।
এই যে পিউ অরিজিত সিঙ্ নিয়ে এত উত্তেজিত, তুমি তার থেকে ১৩ বছরের বড় হয়ে কীভাবে কুমার শানুতে আস্থা রেখেছ। কী লড়াই তোমার আর পিউর।বাপরে। এই খুনসুটির সামনে সুইসাইড নোট। পিউকে কিন্তু তুমি কথা দিয়েছ— সোরাইসিস যতই কনুই থেকে ছড়িয়ে পড়ুক পায়ে, মাথায়, পিঠে বুকে নাভিতে কানে ছড়িয়ে পড়ুক
তুমি ঠিক লড়ে যাবে। ওষুধের টাকা একটু বেশিই লাগে। সঙ্গে আবার নার্ভের প্রবলেম। পায়ের পেশী টেনে ধরছে। হাঁটতে পারছ না। টাল খাচ্ছ। কোনোদিন মেট্রো,কোনোদিন ট্যাক্সি। ভাড়া বিস্তর। খরচে পাগল পাগল দশা। এর ওপর আছে লিটল ম্যাগাজিন,বই কেনা। জামা। ঘড়ি। সবই সস্তার যদিও। লোকে আওয়াজ দেয়। তাতে কী!! তোমার তো ভালো লাগে। শুধু এত নিপাট যন্ত্রণায় ঘরটা গোছাতে পারছনা। চাদর,বালিশের ওয়ার থেকে একটা বাজে গন্ধ। পিউ কিন্তু তোমায় বারবার বলেছিল,এগুলো শিখে নিতে।বালিশে ওয়ার কীভাবে পড়াতে হয় শিখে নিতে। বলেনি ইন্ডাকশনে চিকেন রান্না করার কথা?
সেই পিউ কথা
বলে না তোমার সঙ্গে আর।ডিভোর্সের চোরাবালিতে তুমি।
তবু পিউকে ভুলতে পারোনি।সারাদিন তো পিউর সঙ্গেই কথা বলো মনে মনে। পিউ দেখো : জানলার পর্দাটা কী দারুণ। পিউ দেখো এই কাঞ্জিভরম। তোমার জন্য কিনব একটা?পিউ দেখো কী সুন্দর জলের জগ, খাবার ডিসগুলো, কাপগুলো কী সুন্দর দেখো পিউ, টাওয়েলগুলো কী অপূর্ব। ঘর গোছানো শখ পিউর।
পিউ একদিন আমার আলমারিটা গুছিয়ে দেবে? বুক সেলফ?
পিউকে জিজ্ঞেস করো মনে মনে,এই ওয়েব সিরিজটা দেখলে? তোমার প্রিয় নায়ক কে পিউ? অরবিন্দ স্বামী আর মধু— মনিরত্নমের রোজা দেখলেই তোমার কথা মনে পড়ে যায় পিউ। কিংবা যোধা আকবর।
মনে মনে তুমি অফিস যাওয়ার সময় ভাবো: পিউ খাবার বাড়ছে।তুমি স্নানে বাথরুম সং। পিউ চেঁচাচ্ছে : ‘আর কত দেরী করবে?’ তোমার হেলদোল নেই।
আজ সর্ষে ইলিশ, আজ বিউলির ডাল, মাটন— আজ সকালে লুচি আর কাস্টার্ড। তুমিও তো চেয়েছিলে সংসার পিউর সঙ্গে।
বদলে একটা সুইসাইড নোট সকাল থেকে শিস দিচ্ছে।
একটা ট্রেন লাইন,বাগবাজারে যেখানটায় তোমরা বসো, সেখানে কত ছোট ছোট গাছের জঙ্গল।
‘জঙ্গল কেন— অরণ্য বলতে পারো না? তোমার মনের ভেতরটা কি কেউ দেখছে? ‘পিউর সঙ্গে সেখানে কত কথা।
লোকের কত কিছুতে আগ্রহ থাকে। মানুষ কত গাছের নাম জানে,তোমারই বয়সি ছেলেরা, কত দেশের প্লেয়ারের নাম জানে।কত পাখির গল্প তাদের আড্ডায়। তুমি তো জানতে পারো এগুলো।পিউ কতবার বলেছে তোমায়।
পিউ বলেনি তোমায়: একা একা ঘোরো।কলকাতা শহরটা ঘোরো।লাইব্রেরি যাও। কলেজস্ত্রীট। নতুন বই এর গন্ধ নাও। কুমোরটুলিতে গিয়ে দেখোনা কীভাবে ওরা প্রতিমা রং করে।
পিউ বলেনি, সোরাইসিস তো কী হয়েছে। তোমার রোগটা না হয় ওপরে। কত লোকের ব্লাড ক্যান্সার, হার্টের প্রবলেম, সেগুলো দেখা যায় না বটে— কিন্তু সেগুলোও তো ভয়ংকর। পিউ তোমায় একটা ইলেকট্রিক হট ব্যাগ গিফট করেছিল, জন্মদিনে।মনে নেই? সব প্রেমিক তো সুস্থ হয় না। অসুস্থ হতে আর কতদিন!!!
সুইসাইড নোটটা ছিঁড়ে ফেলো।পিউকে কিন্তু কথা দিয়েছিলে।
ট্রামের মতোই না হয় ধীর গতিতে এগোবে তোমার জীবন।চাকচিক্য থাকলো না। বিলাস বৈভব থাকলো না।পিউর তো তাতে আপত্তি নেই। পিউ তো চেয়েছিল
তুমি শুধু বেঁচে থাকো। একটু সুস্থ থাকো। হাঁটাচলা করতে পারো যাতে।
পিউ বলেনি প্রত্যেকবার যখন তুমি দুমড়ে মুচড়ে গেছ
পিউ বলেনি
যাও: সুনীল গাঙ্গুলির শ্রেষ্ঠ কবিতাটা নিয়ে বসো। দেখবে জীবনের নেশা কাকে বলে!
কে বলেছিল কথাটা পিউ__ সুনীলের কবিতায় জীবনের নেশার কথা! কোনো কবি না সমালোচক?
ট্রামলাইন আর ট্রেনলাইনের
অনেক পার্থক্য।
পিউ বলেনি : চাঁদের আর গতি কী!! তুমি তো কর্কট রাশি।
জীবনের জ্যোৎস্না গতির ওপর নির্ভর করে না। পিউ শেখায়নি তোমায়?
অন্ধকার গঙ্গা, এত ভালোবাসো
না হয় গঙ্গার ধারেই গিয়ে বসো।
সুইসাইড নোটটা দেখবে বিরক্তিকর লাগছে।
রাতের গঙ্গায় দেখবে লঞ্চটা কেমন ঝলমল করতে করতে এগিয়ে চলে, পিউ তোমায় লঞ্চ দেখার নেশা ধরায়নি গঙ্গার ধারে?