কবিতা : পালসারের গ্রিপার

বাসব মৈত্র

পর্ব – ২
পালসারের গ্রিপার ছুঁয়ে দেখা তোমার দীর্ঘশ্বাস, মোবাইলের কুরকুর শব্দ,কথা বলতে বলতে সম্প্রতি তোমার বন্ধুর বঙ্গীয় রাজনীতির মতন উত্তেজক ফুটে যাওয়া জাতীয় স্তর থেকে।আড্ডায় কেমন ঘোলা জলের মাছ একলা পড়ে গেলে।
আমি বুঝতে পারি তোমার রণকৌশল,
বুকের লোমকূপ থেকে তোমার স্যাঁতস্যাঁতে ঘাম, চিৎকার।তোমার আমিত্ব প্রতিনিয়ত সংখ্যাগুরু না সংখ্যালঘু না রাজ্য রাজনীতির পালানো পুষ্পা!! বেকারত্বের উষ্মায় প্রাক্তন মন্ত্রীর গ্রেপ্তার অথবা দু’দিন পরেই জামিন— তুমি বুঝে উঠতে পারো না দলভাঙ্গা গল্পের শিস।

রোলকর্নারের হাতল ভাঙা চেয়ার, তুমি দেখেছ উচ্ছেদের বর্ণচ্ছটা।
বাপ ঠাকুরদার ফুটপাথের গামছা গেঞ্জির বিজনেস, তুমি দেখছ যে মিছিলগুলো
এতদিন চমকাত, ডানলপ থেকে হেঁটে সিঁথি মোড়, লোকে লোকারণ্য, গার্ডে গার্ডে ছয়লাপ সে সব কাউন্সিলর—

সব কেমন ভাঙা হাঁটু নিয়ে, বলিউড সার্কাসের থেকেও জমিয়ে দিয়েছে পুরসভার বালতি চুরির গল্প

তোমার প্রেমগুলোও কেমন ডিগবাজি খেতে খেতে ছুটে যাচ্ছে ব্যাঙ্গালোর।
অথচ একতরফাই তো প্রেম ছিল তোমার। মল্লারপুরের ইতু ছিল ঝুমা।
দীপা ছিল কালবেলার মাধবীলতা।
ঝুনু ছিল নীলু হাজরা হত্যা রহস্যের ঝিনুক।

১৯৯৬-এ তোমার মাধ্যমিক। তার কিছু আগেই অনন্যায় এসেছিল বিজয়া শান্তির তেজস্বিনী।
না,অনন্যায় তখনও পায়রা ওড়েনি। স্ক্রিনে যে কটা টাকা পড়ত, বেশিরভাগই ১ টাকার কয়েন কী আধুলি! ক’বার দেখেছিলে ক্রান্তিবীর?

নানা পাটেকর ভার্সেস সিটের ছারপোকা, সে এক অদ্ভুত কিংবদন্তি রুদ্রপলাশ। নানা পাটেকারের মতন সেই বিকেল সন্ধ্যায় কলার উঁচিয়ে বাঁচতে চাওনি তুমি? মনে হয়নি তোমার ডিম্পলের ওপর যাবতীয় অত্যাচারের বদলা নেবে?

না তখনও জিম আসেনি। তোমার ডিম্পল চলে গেল বালিগঞ্জ। সবে জয়পুরিয়া থেকে বিয়ের পিঁড়ি।সেখান থেকে স্টেটস।বাচ্চা হতে গিয়ে মৃত্যু— ওগো ১ লা মে,
বিকেল বিকেল খবর এলো।
তখনও তুমি টিউশন।
বাড়িতে চাকরির কথা বললেই ক্ষেপে যাচ্ছ।
ষাট টাকার নিপ, মাস শেষে টিউশনের না পাওয়া টাকায় তুমি সেই চালকলা পুরোহিতের মতো যজমান বাড়ির মতোই হিসেবে বসছ।

ওদিকে তোমার ছাত্র পরীক্ষা দিলো না।বন্ধুদের সঙ্গে দিঘার সাগরে। বলল, কটাকা রোজগার করো? এত যে পড়াশোনা নিয়ে বাতেলা।ফুটবল ম্যাচের ছদ্মবেশ, সে মঞ্চে প্রশ্ন উঠেছিল, পাড়ার মোড়ে যে কটা ট্যাক্সি ড্রাইভার, তুমি তার থেকেও দীন।

চাকরির ইন্টারভিউ সেও যেন আবহমানের এক শুয়োরের খোয়ার, ব্যতিক্রম তো থাকবেই। আধ ছেড়া দেড়শো টাকার ঘড়ির বেল্টের দিকে তাকিয়ে তোমারও মনে হয়েছিল:

বলুন তো…, “জন্মটাকে আমার নেহাতই খচরামো
বলে মনে হয়।” কার লেখা কোন উপন্যাস?

পালসারের গ্রিপার, তুমি সেই ইগো, তুমি সেই হীনমন্যতা ১৯৯৮-এর। শরতের নীল আকাশ তুমি জানতে পাড়ার ছেলেদের মধ্যে কীভাবে এডিকশনের মতো ছড়িয়ে পড়ে ডেনড্রাইটের নেশা, সোনাগাছির কন্ডোম।
অপরাধবোধ তবু অনেকটা কম মদের নেশায়।

রাতের ল্যাম্পপোস্ট, তুমি ভেবেছিলে ঝুমা এসেছে বারান্দায়। বারান্দার আলো জ্বলা থাকলেই তুমি ছুটে আসতে। এসে দেখতে ঝুমা নয়।ঝুমার বোন। রাতের ল্যাম্পপোস্ট, ঝুমার বোন কী অপয়া ছিল মনে আছে? বেলঘোরিয়া বাটার কাছে দীপার বাড়ি। ভৈরব গাঙ্গুলি কলেজ: কাছে পিঠে এত বাজে সিনেমাহল
বরং মুক্তি বেলঘরিয়া ব্রিজে। বেলঘরিয়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখতে ট্রেন চলে যাচ্ছে নিচ দিয়ে।ঝুঁকে দেখতে তোমার ভয় হতো। যদি পড়ে যাও। চারপাশে শীতের কুয়াশা। তুমি জানতে দীপা এত সকালে ঘুম থেকে ওঠে না। জংধরা সাইকেল,লেবেল ক্রসিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি দেখতে ছোট একটা ছাইগাদা— তোমার মনে হতো বাংলা দেশের কাঁটাতার।

ঢাকা দেওয়া খাবার,তুমি ভয় পেতে রাতের টিকটিকি। চেয়ার বেয়ে কেমন উঠে আসে।অথচ অষ্টমীর সকালে তুমি বাড়িয়ে দিয়েছিল ফুল। ছোটকুর গর্ভের কাছে দাঁড়িয়ে তুমি নিষ্পাপ তাকিয়ে ছিলে স্নান করা ছটকুর শান্ত মুখের দিকে। চুল থেকে চুঁইয়ে পড়ে জল। ছটকু তোমার বন্ধুর প্রেমিকা। চিঠি ছুড়ে দিত। ছটকুর প্রণামের ভঙ্গী, নেলপালিশ, ডানহাতের ঘড়ি, অন্ধকার ঘরে তোমাকে অনেকদিন তছনছ করেছে। স্থির তাকিয়েছ ছটকুর দিকে। রাত ১০টার পরে ছটকুর এলো মেলো পা, অসংলগ্ন কথাবার্তা, বাইকের পর বাইকে দেখেছিলে মেয়েদের। এআই-এর ছবি ভেবে আজ ওল্টাও ম্যাগাজিনের পাতা।

ভিখিরিকে ১০ টাকার কোল্ডড্রিংকস খাইয়ে পরমুহূর্তেই জিভ কামড়াও।কবিতা উৎসবে দেখো সাদামাঠা প্রচ্ছদে লিকলিকে একটা কাগজ।যেখানে অধিকাংশ কবিতাই তোমার।ওদিকে বাথরুমে তোমার ভাই লাইট জ্বালতে গিয়ে দেখে নর্দমা আটকে গেছে। মেয়েদের খোলা বাহুতে অসংখ্য তাবিজ, অটোর ধাক্কা লেগে খুলে যাওয়া নতুন ঘড়ির চেন।বাবার ইউরিন কালচারের রিপোর্টের জন্য বাকি ১০০ টাকা চাপা দেওয়া ফ্রিজের মাথায়। বিয়ে না হওয়া অন্তু পিসির বিকেলের ঘুরে ঘুরে এবাড়ি সে বাড়ি খবর।আর এর কথা তাকে, তার কথা একে। পকেট থেকে বার করা ঘামের রুমাল কারো দিকে বাড়ানো যায় না। তবু তুমি লড়ির গনগনে ধোয়ার মধ্যে জীবনানন্দের মৃত্যু ভেবে আঁতকে উঠেছিলে। তোমার মৃত্যু তুমি চেয়েছিলে বাড়িতেই। কাচের গাড়ি তুমি দেখেছিলে মার মৃতদেহ।মার নাভি নিয়ে ভাই নেমে যায় গঙ্গায়।ভাসিয়ে দেয়। জেটি থেকে তুমি দেখতে লঞ্চ চলে যাচ্ছে, ছেলেরা ডাইভ মারছে লঞ্চের কেবিন থেকে।গামছা। কোমরে ছিটকানো জল। ধরে নিচ্ছে লঞ্চের টায়ার। তুমি জানতে, তুমি জানতে,
মা তোমার নয়, ভাইয়ের হাতের আগুন চাইত।

Sumit Chakraborty: