নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ক নয়, জনগণই তার ভরসা

লড়াইয়ে নজর কাড়ছেন লাবনী জঙ্গী

সুমিত চক্রবর্তী, কৃষ্ণনগর, নদিয়া– ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে যে বাম ও কংগ্রেস বিরোধী আসনে ছিল, একুশের বিধানসভা নির্বাচন সেই দুই দলই শুন্যে চলে যায়, দুই দলের একজন প্রার্থীও জিততে পারেননি গোটা রাজ্যে। ফের ছাব্বিশের নির্বাচনে দুই দলের টিকে থাকার লড়াই, ফের বাংলার মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়ার লড়াই। তবে একুশে এই দুই দল এক হয়ে লড়াই করলেও ছাব্বিশের ছবিটা বদলে গিয়েছে। এবার বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস আলাদা হয়ে লড়াই করছে গোটা রাজ্যে। আর সেই লড়াইয়ে নজর কাড়ছেন কৃষ্ণনগর দক্ষিণের সিপিআইএমএল প্রার্থী লাবনী জঙ্গী।
প্রতিদিন গোটা বিধানসভা এলাকার নানা প্রান্ত চষে ফেলছেন। মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ, তাদের অভাব অভিযোগের কথা শোনা, ছোট ছোট পথসভা করে নিজেদের দলের অবস্থানের কথা তুলে ধরা, মানুষের পাশে থাকার বার্তা দেওয়ার কাজটি নিবিড়ভাবে করে চলেছেন লাবনী। এই কেন্দ্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। রয়েছে মতুয়া ভোট। সেইসব ভোটব্যাঙ্কের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দিচ্ছেন প্রার্থী? প্রশ্ন করতেই সটান জবাব এল, ‘দক্ষিণপন্থী দলগুলি ভোটব্যাঙ্কের কথা ভেবে রাজনীতিটা করে। আমার কাছে কেউ ভিন্ন নয়। সকলেই আমার কাছে কাছের মানুষ। সবার মধ্যে বড় হয়েছি। এই যেমন আজ আমি বাহাদুরপুরে এসেছি জনসংযোগ করতে। এই গ্রামে আমার ছোটবেলার বন্ধুবান্ধরা থাকেন। এখানে কীভাবে আমি ঘোষস মাহিষ্য, মুসলমানকে আলাদা করতে পারব। এই ভোটভাগের রাজনীতি একটা সাম্প্রদায়িক উস্কানি তৈরি করে। আমারা যারা বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাস করি, তারা এই ভোট ভাগের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষজনও আমার কাছের মানুষ।’
এসআইআর ইস্যুতে যেভাবে রাজ্যের নানা প্রান্তে সমস্যা তৈরি হয়েছে তাও প্রচারে তুলে ধরছেন সিপিআইএমএল প্রার্থী। তার কথায়, ‘ভোটের রাজনীতির বাইরেও আজকের দিনে এসআইআর নিয়ে মানুষকে যেভাবে দূর্বিপাকে ফেলেছে এই কেন্দ্রীয় সরকার, তা কিন্তু ভোটের বাইরে গিয়েও একটি বৃহত্তর রাজনীতির প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে। ফলে লড়াইটা একসঙ্গে থাকার, ভোটব্যাঙ্কের নয়।’ একুশের বিধানসভা নির্বাচনে একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি বামেরা। সেই জায়গা থেকে এবার লড়াইটা কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বামেদের জন্য, মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বামেরা এই পরিস্থিতি থেকে সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বামেরা ধীরে ধীরে তাদের মাটি শক্ত করতে পারছে বলেই মনে করছেন কৃষ্ণনগর দক্ষিণের প্রার্থী। তার কথায়, ‘বিগত পাঁচ বছরে বিজেপি যেভাবে হানাহানি আর হিংসার রাজনীতি দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছিল, আগেও অনেক টাকা খরচ করা হয়েছিল, এবারও মেশিনারি নামিয়ে টাকা খরচ করা হচ্ছে। এসআইআর করে গোটা রাজ্যের মানুষের মধ্যে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তবে এটা সাময়িক। মানুষ কিন্তু বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে আসবেন। আমি আজ যে জায়গা থেকে কথাগুলো বলছি সেটা কিন্তু চৈতন্যদেবের জমি। আজ এখানে টাকা দিয়ে বিজেপি কিছু সুবিধা করতে পারে। কিন্তু দিনের শেষে মানুষ সেই ভালবাসার জায়গাটিকে বেছে নেবে। বামেরা মানুষের জন্য কথা বলেছে, কাজ করেছে। আগামীদিনে সেই রাস্তা শক্তিশালী হবে।’
কৃষ্ণনগর দক্ষিণের এই লড়াইয়ে সিপিআইএমএলের সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা মজবুত সেই প্রশ্নটিও সামনে আসছে। কারণ নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য এই সাংগঠনিক জোর প্রয়োজন। লাবনীর যুক্তি, একটি দলের সাংগঠনিক জোর মানুষই দেয়। সেই জোরের ওপর ভরসা করেই তিনি মানুষের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছেন। ১৯৭৭ সালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সাতাত্তরের সেই সময় দেখেছি আমরা। ওই সময় ফ্যাসিবাদীর কাছাকাছি একটি সরকার ছিল। অনেক বামপন্থী কমরেড সেইসময় ঘরছাড়া ছিলেন। কিন্তু ভোটের ফল অন্য হয়েছিল। তৃণমূল আজ পয়সা আর ক্ষমতার জোরে অনেক লোককে রাস্তায় নামাতে পারে। কিন্তু আমাদের পয়সা আর ক্ষমতার দম্ভের বাইরে দশ, কুড়ি বা পঞ্চাশজন আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অনেক বছর ধরে। সেই লড়াইয়ের জায়গাটা খুব মজবুত। এই মানুষগুলো পয়সার সামনে বিক্রি হন না। আমরা সেই জায়গা থেকে শক্তশালী।’ রাজ্যের বর্তমান সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে শুরু করে একাধিক সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে এসেছে। ভোটের ময়দানে তার প্রচারও চলছে। সেই প্রভাব তো পড়তে পারে? জবাবে লাবনী বললেন, ‘ভাতা নিয়ে যদি আজ রাজনীতি করা হয় সেটা খুব ভুল রাজনীতি হবে। এই প্রকল্পগুলি জলকল্যাণমুখী প্রকল্প। এগুলো নিয়ে রাজনীতি করা জলকল্যাণকামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হতে পারে না। এটা মানুষের টাকা মানুষকে দেওয়া হচ্ছে। কোনও রাজনৈতিক দল এটা দিয়ে দয়া করছে এমন নয়। ভাতার প্রয়োজনীয়তা আমরা বামপন্থীরাও বিশ্বাস করি। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে এর ব্যবহার অত্যন্ত অসংবেদনশীল।’ এত কিছুর পরেও একটা প্রশ্ন সামনে আসে, তা হল জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী লাবনী। উত্তরে বললেন, ‘আশা আমাদেরকে আগামীদিনের স্বপ্ন দেখায়। আজ অসংখ্য মানুষের যখন ভোটার তালিকায় নাম নেই তখন মানুষের কাছে ভোট চাওয়া বামপন্থীদের জন্যে খুব কষ্টের। তাই জয় পরাজয়ের উর্দ্ধে গিয়ে আমরা এটাকে লড়াই হিসেবে দেখছি। সেখানে মানুষের কথা বলতে হবে।’

Sumit Chakraborty: