পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাস কি এক মহাপ্রলয় ঘটতে চলেছে?মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি চতুর্থবার বাংলায় শাসন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন?মমতা কি ফের একবার নীলবাড়ির (নবান্ন) মালিকানা বজায় রাখতে পারবে? নাকি সবকিছু এবার উলটপালট হয়ে যাবে?এবার বাংলায় কি আসছে গেরুয়া ঝড়? সেই ঝড়ে কি তছনছ হয়ে যাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাজানো বাগান? এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা নিয়ে এখন তোলপাড় হচ্ছে বাংলা ও দেশের রাজনীতি। একসঙ্গে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন হলেও, গোটা দেশবাসীর নজর শুধু পশ্চিমবঙ্গে। একসঙ্গে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ভোটগণনা হলেও, গোটা দেশবাসীর নজর শুধু বাংলার ভোটগণনা ও ফলাফলের উপর। অন্য রাজ্যগুলোর ভোটগণনা এবং ফলাফলের উপর দেশবাসীর তেমন কোনও উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এককথায় দেশের সব চোখ এখন বাংলায়। এই আগ্রহ ও উদ্দীপনার আরও একটি কারণ হলো, স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুহীন, বড় ধরনের কোনো অশান্তি ছাড়াই মানুষ নির্ভয়ে নিজের ভোট নিজেই দিতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে ভোটের হার সর্বকালীন রেকর্ড ছাড়িয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বাংলার জনগণ এবারই প্রকৃতপক্ষে উৎসবের মেজাজে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর কৃতিত্ব অবশ্যই দেশের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের। বাংলার ভোটকে শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য জাতীয় নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি, অন্যান্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছিল। যার ফলে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন বাংলা।
প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল ভোট মিটতেই জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন সমীক্ষা সংস্থা যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে ঘুম উড়েছে শাসক শিবিরের। এ নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তবে বঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও এসব পূর্বাভাস উড়িয়ে দিয়ে চতুর্থবার মমতার নেতৃত্বে সরকার গঠন হবে বলে দাবি জানিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তেজি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ বছরের শাসনের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারই সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ থেকে শুরু করে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিরোধী দল বিজেপির সামনে এবারই প্রথম কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়ছে তৃণমূল কংগ্রেস। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহল। দুই-একটি বাদ দিলে যাবতীয় বুথফেরত সমীক্ষা বা এগঞ্জিট পোলের ফলাফল অন্তত সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। ম্যাজিক ফিগার ছুঁয়ে সরকার গড়ার পথে বিজেপি? যদিও চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য আগামী ৪ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুপুরের মধ্যে মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যাবে নবান্নের দখল কার হাতে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গড়তে প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষে প্রকাশিত হওয়া একাধিক বুথফেরত প্রধান সমীক্ষক সংস্থার রিপোর্ট বলছে, বিজেপি এবার সেই গণ্ডি পার করে নবান্নের দখল নিতে পারে। কেউ কেউ আবার কড়া টক্করের আভাসও দিয়েছে। সমীক্ষকদের মতে, এবার তৃণমূলের অত্যন্ত মজবুত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি এবং হাওড়াতেও থাবা বসাতে পারে বিজেপি। শুধু তাই নয়, মুর্শিদাবাদ ও মালদার মতো জেলায় কংগ্রেস, সিপিএম ও আইএসএফ জোট তৃণমূলের চিরাচরিত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসিয়েছে বলে মনে করছে সমীক্ষা সংস্থাগুলো। এর সরাসরি সুবিধা পেতে পারে গেরুয়া শিবির-এমনটাই মনে করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে গত লোকসভা নির্বাচনের ধারা বজায় রেখে উত্তরবঙ্গে বিজেপি প্রায় সবকটি আসন জিততে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কলকাতা ও তৎসংলগ্ন শহুরে এলাকায় তৃণমূল কিছুটা লড়াই দিলেও মোদি ম্যাজিক বিজেপির ভোট শতাংশে বড় সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সমীক্ষা সংস্থাগুলোর মতে, সীমাহীন দুর্নীতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের ভাবমূর্তিতে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছেছে যে, দুর্নীতি একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলার মহিলারা বরাবরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সন্দেশখালি, আরজি কর মেডিকেল কলেজ এবং দুর্গাপুর মেডিকেল কলেজের মতো ঘটনাগুলো এই আস্থার মূলে আঘাত হেনেছে। মহিলাদের উপর নির্যাতনের অভিযোগগুলো বিরোধী দলগুলোর হাতে সরকারকে কোণঠাসা করার মতো একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। বিজেপি ক্রমাগত নারী সুরক্ষার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসে তৃণমূলের এই শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকার-বিরোধী হাওয়া, তৃণমূল স্তরে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের দাদাগিরি এবং ‘সিন্ডিকেট রাজ’ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে বলে অভিমত। বেকারত্ব, কর্মসংস্থান যুবসমাজের মোহভঙ্গ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।এই সবকিছু মিলিয়ে ২০১১ সালে যে বিজেপির ভোট-শতাংশ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, সেই দলটিই এখন বাংলার রাজনীতির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ফলে বাংলা ও নবান্নের দখল কার হাতে যাবে- তা জানতে আগামী ৪ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।