কলকাতা, ২০ জুন- পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে ২০ জুন তারিখটিকে মান্যতা দেওয়ার জন্য একাধিকবার দাবি তুলেছিল বিজেপি। কিন্তু পূর্বতন তৃণমূল সরকার তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির দাবি মেনে নেয়নি। পালাবদলের পরে বাংলায় এবার মহা সমারোহে পালিত হল পশ্চিমবঙ্গ দিবস। শনিবার তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অনুষ্ঠান থেকে কংগ্রেস, বাম এবং তৃণমূলকে একযোগে আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অভিযোগ করলেন, ইতিহাসের হোয়াইট ওয়াশ করে পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে ভোলানোর চেষ্টা হয়েছে।
দুদিনের বঙ্গ সফরে এসে এদিন সরাসরি তারকেশ্বরের অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। রবিবার আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানেও অংশ নেবেন তিনি। আজকের অনুষ্ঠান থেকে নিজের বক্তৃতায় বারবার পশ্চিমবঙ্গ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরেন মোদি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কীভাবে এই রাজ্যটি তৈরি হয়েছিল সেই কথা মনে করিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ২০ জুন দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনেই নিশ্চিত করা হয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অংশ হিসাবে থাকবে। এর নেপথ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অমূল্য অবদান ছিল। ২০২৬ সালে আমরা তাঁর ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী পালন করছি।’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এদিনের অনুষ্ঠান থেকেই ঘোষণা করেন, বাংলায় ১২৫ ফুট উঁচু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি তৈরি করা হবে। তারকেশ্বরের অনুষ্ঠান থেকে পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্পকে তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সামনে বাউল গান, ছৌ নৃত্য পরিবেশিত হয়।
তারকেশ্বরের মঞ্চ থেকে দেশভাগের যন্ত্রণা ও নোয়াখালির দাঙ্গার ইতিহাস স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলার মানুষ বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে, নোয়াখালির দাঙ্গায় বহু নির্দোষ বাঙালি শহিদ হয়েছে। মাতৃভূমিকে টুকরো হতে দেখেছে বাঙালি, কিন্তু নিজেদের অস্মিতা এবং পরিচয় নষ্ট হতে দেয়নি।’ কংগ্রেস নেতৃত্বকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন পুরো বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করার একটা বড় চক্রান্ত চলছিল, তখন কংগ্রেস ষড়যন্ত্রকারীদের সামনে হাঁটু মুড়ে বসেছিল। তারা লড়াইয়ের হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই কঠিন সময়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বাংলা কোনওভাবেই পাকিস্তানের অংশ হবে না। আর সেখান থেকেই বাংলায় ‘হিন্দু হোমল্যান্ড মুভমেন্ট’ শুরু হয়।’ প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, দেশভাগের সময় কংগ্রেস বাংলাকে অনাথের মতো ছাড়তে চেয়েছিল কংগ্রেস। দেশভাগের পর বাংলায় তোষণের রাজনীতি খেলা শুরু হয়।
কেন ২০ জুন তারিখটির এই বিশেষ তাৎপর্য। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে, ১৯৪৭ সালের এই ২০ জুন দিনটিতেই অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত পাশ হয়। আর এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, আগামী ২৩ জুন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মবলিদান দিবস এবং ৬ জুলাই তাঁর ১২৫তম জন্ম-জয়ন্তী সাড়ম্বরে পালন করা হবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে কিনবে সরকার। সেখানে একটি লাইব্রেরি এবং স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হবে। হবে শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি।
তারকেশ্বরের সভামঞ্চে ডোকরার দুর্গামূর্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তারকনাথের একটি ছবিও প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন তিনি। মোদীর হাতে তুলে দেন রসগোল্লা এবং জলভরা সন্দেশও। রাজ্যে পালাবদলের পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাতেও কোনও খামতি রাখতে চায়নি রাজ্য সরকার তথা রাজ্যের শাসকদল বিজেপি। মঞ্চসজ্জার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মঞ্চ সাজাতে তাইল্যান্ড থেকে আনা হয়েছে অ্যান্থোরিয়াম। তামিলনাড়ুর উটি থেকে আনা হয়েছে জারবেরা এবং লিলি। এ ছাড়া, পাঁচ রকমের গোলাপ, ব্লু ডেইজ়ি, রজনীগন্ধা, গাঁদার মতো ফুল দিয়েও সাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী মঞ্চ থেকেই দাবি করেছেন, বাংলায় ডবল ইঞ্জিনের সরকার যেভাবে কাজ করছে তাতে বাংলার হারানো গৌরব ধীরে ধীরে ফিরছে। দাবি করেছেন, পরাধীনতার শিকলমুক্ত হয়েছে বাংলা। মঞ্চ থেকেই প্রধানমন্ত্রী আমজনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন, ‘পরিবর্তন ভাল লাগছে তো?’
রবিবার সকালে রেড রোডে যোগ দিবসে অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন মোদি। এদিন থেকেই তার প্রস্তুতি তুঙ্গে। রেড রোড থেকে প্রিন্সেপ ঘাটকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে আলোকমালায়। বিভিন্ন রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।