সুজয় গুহ (পর্ব-২)
মোবাইল থেকে শিশুদের দূরে রাখতে মনোবিদদের বার্তাগুলি পৌঁছে দিতে হবে। আর এই কাজে সহযোগিতা বা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে প্রথমত তার পরিবারের বাকি সদস্যরা, দ্বিতীয়ত বিদ্যালয়, তৃতীয়ত সমাজসেবী সংগঠন। শিশুদের প্রতি মনোবিদদের পরামর্শ—মোবাইল তোমার জীবন নয়, জীবনের একটি অংশ। রাগ, দুঃখ বা ভয় হলে কাউকে বলো। বাস্তব বন্ধুত্ব ও খেলাধুলা মানসিক শক্তি বাড়ায়।
যদি ব্যাপক অর্থে দেখি, এই সংকট কেবল একটি পরিবারের নয়—এটি একটি সামাজিক সতর্কবার্তা। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, আগামী প্রজন্ম মানসিকভাবে আরও একা ও দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়। কিন্তু মানবিক সংযোগ হারিয়ে গেলে প্রযুক্তিই সবচেয়ে বড় বিপদে পরিণত হয়—এই সত্য অস্বীকার করার আর জায়গা নেই। নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. আন্না লেম্বকে তার বহুল আলোচিত গবেষণা ও বই ‘ডোপামাইন নেশন’-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘আজকের স্মার্টফোন ও সমাজ মাধ্যম শিশুদের মস্তিষ্কে ঠিক সেই প্রক্রিয়ায় কাজ করে, যেভাবে নেশাদ্রব্য কাজ করে—ডোপামিনের অতিরিক্ত নিঃসরণ ঘটিয়ে।’
ডোপামিন হলো ‘রিওয়ার্ড কেমিক্যাল’। গেম জেতা, লাইক পাওয়া, নতুন ভিডিও—সবই ক্ষণিক আনন্দ দেয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন মস্তিষ্ক সেই আনন্দ ছাড়া আর স্বাভাবিক থাকতে পারে না। শিশু তখন বাস্তব জীবনের পড়াশোনা, খেলাধুলা বা পারিবারিক সময়ে আগ্রহ হারায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ২০১৯ সালে গেমিং ডিসঅর্ডার-কে আনুষ্ঠানিকভাবে মানসিক রোগ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি স্ক্রিন আসক্তি শিশুদের মধ্যে—আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বাড়িয়ে তোলে। মার্কিন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ভিক্টোরিয়া ডানকেল তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে দুর্বল করে দেয়—যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মসংযমের জন্য দায়ী।
ভারতের সাম্প্রতিক বেশিরভাগ ঘটনায় (চরমতম উদাহরণ আত্মহত্যা) একটি মিল লক্ষ করা যায়—ঘটনার ঠিক আগে অভিভাবক মোবাইল ব্যবহার নিয়ে কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই সিদ্ধান্ত শিশুর কাছে এত ভয়াবহ হয়ে ওঠে? বিশ্বখ্যাত শিশু মনোবিদ ড. ড্যানিয়েল জে. সিগেল ‘দ্য হোল ব্রেন চাইল্ড’-এর লেখক ব্যাখ্যা করেছেন, ‘কৈশোরে আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ অ্যামিগডালা অত্যন্ত সক্রিয় থাকে, কিন্তু যুক্তিবোধের অংশ প্রি-ফন্ট্রাল কর্টেক্স তখনও সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না। ফলে হঠাৎ মোবাইল কেড়ে নেওয়া শিশুর মনে তৈরি করে— নিরাপত্তাহীনতা, অপমানের অনুভূতি, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। যুক্তরাজ্যের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. টানিয়া বাইরন তার ‘ডিজিট্যাল চাইল্ড সাইকোলজি’ গবেষণায় জোর দিয়ে বলেছেন , ‘যেসব পরিবারে আবেগ নিয়ে খোলামেলা কথা হয় না, সেখানে মোবাইল শিশুদের জন্য আবেগগত আশ্রয়ে পরিণত হয়।’ অর্থাৎ মোবাইল আসক্তি অনেক সময় মূল সমস্যা নয়, বরং সমস্যার উপসর্গ। পরীক্ষার চাপ, তুলনামূলক মূল্যায়ন, অনলাইন অপমান—সব মিলিয়ে শিশুর মানসিক চাপ জমতে থাকে। মোবাইল কেড়ে নেওয়া তখন শেষ ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংকট থেকে বেরোনোর পথ দেখিয়েছেন কানাডীয় চিকিৎসক ও ট্রমা বিশেষজ্ঞ ড. গ্যাবর ম্যাতে। তার মতে, ‘আসক্তি কোনও চরিত্রগত ব্যর্থতা নয়; এটি অপূর্ণ আবেগ ও অবদমিত চাপের প্রতিক্রিয়া।’ সন্তানের সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক তৈরি না হলে নিয়ম কার্যকর হয় না। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং করানো উচিত। আর এই প্রসঙ্গে আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স বলছে, কাউন্সেলিং মানে দুর্বলতা নয়, সচেতনতা। অর্থাৎ, মোবাইল প্রযুক্তি নিজে বিপদ নয়। বিপদ হলো—যখন আমরা শিশুদের আবেগ বুঝতে ব্যর্থ হই, আর প্রযুক্তি সেই শূন্যতা পূরণ করে। আজকের শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা মানে আগামী সমাজকে রক্ষা করা। এটা শুধু পারিবারিক নয়—এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব।
(শেষ)