মনের অসুখ নিয়ে সমাজকাঠামোয় ট্যাবু

মনোচিকিৎসাবিদদের কাছে যথেষ্ট সিরিয়াস, গভীর চিন্তা জাগানো এক অসুখ। মনের অসুখ বা গভীর মানসিক অসুস্থতার প্রতীক।

সৌম্য ঘোষ

মনের অসুখ নিয়ে সমাজকাঠামোয় ট্যাবু আজকেও কাটল না। সমাজজোড়া, এক বিশাল হাঁ-মুখ রাক্ষস যেন সে। কিন্তু গিলে খেতে বসা চূড়ান্ত বিষণ্ণতার গভীর প্রচ্ছদে মোড়া অবসাদে ‘পাগলের ডাক্তার’, অর্থাৎ মনোচিকিৎসাবিদরাই কিন্তু হয়ে ওঠেন শেষ আশ্রয়।


সব চিন্তাগুলো জট পাকিয়ে কেমন যেন মনের ভেতরটা মাকড়শার জালের মতো হয়ে উঠেছে। সে জট ছাড়াতে গেলে সুতোগুলো পাকিয়ে আরও বিতিকিচ্ছিরি এক জটিল ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। আর তার মাঝখান দিয়ে উঁকি মারছে শ্রান্ত-ক্লান্ত, বিষাদ-অবসন্ন চোখ, যে নিজেকে খুঁজে চলেছে। অথবা বলা যায়, তার হারিয়ে যাওয়া মনের সুস্থ অন্দরমহল, নিজের সত্তাটাকে তন্নতন্ন করে ফিরে পেতে চেষ্টা করছে। কিন্তু কাজটা যে বড্ড কঠিন। কারণ একদম ছোট ছোট সাধারণ কাজগুলোই যে মোটে করতে ইচ্ছে করে না তার। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না, ইচ্ছে করে না দাঁত ব্রাশ করতে, পড়াশোনা করতে, খবরের কাগজ-ম্যাগাজিন পড়তে, টেলিভিশন দেখতে, বাইরে বেরোতে, আড্ডা মারতে, কারও সঙ্গে কথা বলতে— শুধুমাত্র ঘুম, ঘুমিয়ে থাকতে ভালো লাগে তার। কারণ, ঘুমের সময়টুকুই এক ফোঁটা শান্তির সময় তার। আসলে নিজের মনের সঙ্গে যে যুদ্ধটা সে চালাচ্ছে অবিরত, সেটা পাহাড়প্রমাণ। সেই যুদ্ধ করতে করতে সে দৃশ্যত খুব-খুবই ক্লান্ত। সেই যুদ্ধটা থেকে মুক্তি, সাময়িক শান্তি পেতে ঘুমকেই সে আপনজন করে নেয়, না নিয়ে তার বিকল্প কোনও উপায় নেই। অফিস এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানান ওঠাপড়া, আত্মীয়স্বজন-পাড়া-প্রতিবেশীদের সাঁড়াশি আক্রমণগুলো বিধ্বস্ত, ঘোরতর অবসাদের শিকার হয়ে উঠতে উঠতে সে বোঝে, ক্রমে আত্মনিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে বসেছে সে। অবশ্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাতে সেই ভগ্নস্তূপ বাইরে থেকে বোঝা না যায়। নিজেকে আপ্রাণ চেষ্টায় ছদ্মবেশে সাজাবার চেষ্টা করে। নিজেকে হাসিখুশি, কাজের প্রতি ডেডিকেটেড, পরিবারের প্রতি যত্নশীল সাজাবার, দেখানোর চেষ্টা করে সবসময়ই, প্রাণপণ। কিন্তু তবুও মাঝেমাঝেই খসে পড়ে মুখোশ। বেরিয়ে আসে অবসাদ-বিষণ্ণতার পলিস্তর মাখা আসল নগ্নতার চেহারা। তখন সে নিষ্কৃতি খোঁজে নিজের কাছ থেকেই। কী যেন হাতড়ে বেড়ায় চারপাশে, মনের ঘন-গভীর অন্ধকারে।


আর সেই অন্ধকার থেকে আলোয় পৌঁছনোর খোঁজে, ছন্নছাড়া জীবনে একটা দিশা পেতে নিজে একা যখন আর পেরে ওঠে না লড়াইটা চালাতে, বারবার হেরে যায়, তখন বাধ্য হয়ে সে একাই গিয়ে হাজির হয়, নিয়মিত যেতে থাকে কাউন্সেলরের কাছে। মনোবিশ্লেষণের সঙ্গে সঙ্গে খেতে হতে থাকে কিছু ওষুধপত্রও। এ কিন্তু সাধারণ ডিপ্রেশন, বাংলায় যাকে বলা হয়— ‘মনখারাপ’ ভাবা হয় এলেবেলে বলে, অসুখের জগতে একেবারেই সেরকম হালকা কিছু নয়। এ হল একেবারেই ‘Clinical Depression’। মনোচিকিৎসাবিদদের কাছে যথেষ্ট সিরিয়াস, গভীর চিন্তা জাগানো এক অসুখ। মনের অসুখ বা গভীর মানসিক অসুস্থতার প্রতীক।


এই মনের অসুখ নিয়ে গড়পড়তা আমজনতার ছুঁৎমার্গের শেষ নেই। যেন মনের অসুখে আক্রান্ত মানুষটি কোনো মারাত্মক অপরাধী, hardcore criminal। এক দলের মনোভাব— যত্তসব ন্যাকামি। হাতে অগাধ সময় অথবা কাজকর্ম থেকে দূরে আলসেমিতে ডুবে থাকার চেষ্টা, ঐ ঘ্যানঘ্যানানি ‘মনখারাপ’, ‘মন ভালো নেই’— এসব। আবার আর এক দল আছে, যারা এসব শুনেই চোখ কপালে তোলে— ‘তুই পাগলের ডাক্তারের কাছে যাবি?’ শেষ পর্যন্ত যদি তারপর মনোচিকিৎসাবিদ বা কাউন্সেলরের কাছে যেতেই হয়, তাহলে তো কথাই নেই। বাবা-মা-ভাইবোনেরা, কাছের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, এমনকি আপনার প্রিয়তম মানুষটিও পর্যন্ত অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকবে। শুনতে হবে— ‘শেষ পর্যন্ত তুই পাগলের ডাক্তারের কাছে যাবি? আমাদের মান-সম্মানের কথা একবারও ভাববি না? এরপর সবার কাছে মুখ দেখাবো কী করে?’ এরপর যদি সে বলে— ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাব। কেন, জ্বর, সর্দিকাশি, পেটের বা হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস হলে ডাক্তারের কাছে যাও না তোমরা?’ তখন শুনতে হবে অব্যর্থ উত্তরে— ‘সে তো অসুখ হলে যেতেই হয়।” অর্থাৎ সমাজকাঠামোয় গরিষ্ঠজনের মানসিকতার প্রতিফলনে আজও, এই আধুনিকতম কম্পিউটার সভ্যতার সাইবার যুগেও, মনের রোগটা কোনো অসুখই নয়। আরে, আমারও তো অসুখই করেছে—মনের অসুখ। সেটা সারাতে কেন সেই রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাব না? সেই প্রশ্নে সমাজের আমতা-আমতা উত্তর— ‘আসলে… ইয়ে… মানে, এটা তো ঠিক কোনো অসুখ নয়।’ মানসিক সমস্যা-স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের ছবিটাও আজকের দিনেও এতটাই নির্মম, নিষ্ঠুর।


সমাজ একে অসুখ না মানলেও, এটা যে সত্যিই একটা গভীরতর অসুখ, সেটা ভুক্তভোগীরা আর যারা তাদের সত্যি বন্ধু— কাছের মানুষ— তারা জানে, বোঝে, মানে।
তারা জানে, অনেক রকম সোশ্যাল স্টিগমাকে পেছনে ফেলে, অনেকটাই মনের জোর সঞ্চয় করে সে প্রথমটায় ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, তারপর সাইকোলজিস্টের কাউন্সেলিং— তাতেও যদি কাজ না হয়, তখন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতেও বাধ্য হয়েছে, গেছে। এবং অবশেষে সমাজের চোখে ‘পাগলের ডাক্তারের’ চিকিৎসাতেই শেষ পর্যন্ত সুস্থও হয়ে উঠেছে। বহু সামাজিক দুঃখ-যন্ত্রণাকে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দিয়ে বলতে পেরেছে, ‘it happens’। ভুলে যেতে পেরেছে পাহাড় সমান নৈরাশ্য, বিষাদ, অবসাদকে। অতীতকে একসময় ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে নিছক অতীত হিসেবে ভেবে। ফিরে এসেছে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে। সেটা সে করতে পেরেছে সাহস করে, সমাজকাঠামোর উপহাসকে তোয়াক্কা না করে পাগলের ডাক্তারের কাছে যেতে পেরেছিল বলেই। সে জানত, মনের জোর রেখেছিল— অন্যেরা ভুল, সেই ঠিক। আর সেটা পেরেছিল বলেই আজ তার সামনে খুলে গেছে বহু সম্ভাবনার সদর দরজা, যেসব স্বপ্ন দেখা সে ছেড়েই দিয়েছিল সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়ার আগে, অবসাদে ডুবে থাকা ভয়াবহ দিনগুলোতে।
অথচ, এই মেয়েটার মতো বহু মেয়েরা একসময় ভাবতে শুরু করে, বহুবার ভেবেছিল নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা। কিশোরী বয়স থেকেই বারবার তার মাথায় ভেসে উঠত অনতিক্রম্য এই চিন্তাটা। মানসিকভাবে তখন সে নিজেকে তৈরি করত দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য। সে বন্ধুর (পরবর্তীকালে কোনও পুরুষ বন্ধু, প্রেমিক) সঙ্গে বিচ্ছেদ হোক, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে খারাপ ফল হোক, বাবার-মায়ের থেকে বকা খাওয়া, ঝগড়া জাতীয় সাংসারিক অশান্তি হোক, কাজের জায়গায় নানা প্রতিকূলতা হোক— প্রতি ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়েছে। নিজেকে অপরাধী ভেবে নিয়েছে। মনে ক্রমে দানা বেঁধেছে অপরাধবোধ। প্রতিটি ঘটনায় নিজেকেই অপরাধী ভেবে নিয়ে গভীর অবসাদে ডুবে গেছে। আর প্রতিবারেই মনে হয়েছে, বেঁচে থেকে কী লাভ? এমনকি একাধিকবার লিখে ফেলেছিল সুইসাইড নোটও। শেষ পর্যন্ত নানান কারণে তা ভেস্তে গেছে, থমকে গেছে। শেষ মুহূর্তে নিজেই নিজেকে বলেছে— ‘ফাইট… ফাইট, ফাইট… লড়াই করো।’


অথচ, নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ করাটা কতটা কঠিন, তা অন্যেরা জানে না, বুঝবে না। এই সময়টাতে মনে হয় নিজের হাতে এক গ্লাস জল ভরে খাওয়াটাকেও মনে হয়— ‘অঙ্ক কী কঠিন!’ ঘুম ভেঙে চোখ খুললেই মনে হওয়া— উফ্, আবার একটা দীর্ঘ অবসাদ-বিষাদভরা দিন। এত লম্বা দিনটা কাটবে কী করে? এই এতটা সময়! প্রিয় বন্ধুর ফোন এলেও সেটা তুলতে ইচ্ছে না করা। তাহলে সে লড়াইটা করবে কীভাবে? কিন্তু সে সময় পাশে থেকেছেন ডাক্তাররা। লড়াই করতে সাহায্য করেছেন। হেরে যেতে দেননি চিকিৎসকরা। তা না হলে, ডাক্তারদের পাশে না পেলে সে হয়তো ভীষণ রকমের অসম এই লড়াইটা জিততে পারত না কিছুতেই। বেছে নিতে হতো মৃত্যু-ই অবশ্যম্ভাবী শেষ পথ হিসেবে।


এই অবসাদ কিন্তু কারও ক্ষেত্রেই একদিনের, হঠাৎই টুপ করে খসে পড়া, রাতারাতি গজিয়ে ওঠা কোনো অসুখ নয়। কিন্তু সব যুদ্ধেরই যেমন একটা ইমিডিয়েট ফ্যাক্টর থাকে, এই অসুখের ক্ষেত্রেও তাই হয়। যেমন ধরুন, অজন্তা নামের সাতাশ বছরের যুবতীটির কথা। আজ সে এক নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার সিনিয়র HRO পদে চাকরিরতা। কিন্তু যৌবনের প্রারম্ভে যাকে সে খুব ভালো বন্ধু ভেবেছিল, যাকে সব কথা বলা যায়, বিশ্বাস করা যায়, শর্তহীন ভালোবাসা যায়— তার হঠাৎই বদলে যাওয়া, কোনো কারণ ছাড়াই কথা বলা বন্ধ করা, ফোন না ধরা, মিথ্যাচার, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও দেখা না করা— কোনো কিছুই অজন্তা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। সবকিছুর জন্য নিজেকেই দায়ী করে অকারণ অপরাধবোধে ও অবসাদে ডুবে গিয়েছিল। এবং কিছুটা একতরফাভাবেই সেই বন্ধুটি যখন চিরতরে বন্ধুত্বের দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছিল, সেও ক্রমশ ধীরে ধীরে পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিল মনোরোগের দরজায়। চাগাড় দিয়ে উঠেছিল মনের অসুখ।


এই পর্যায়ে অজন্তার (তখন সে ক্লাস নাইনের ছাত্রী) মানসিক অবস্থা এমন হয়ে উঠেছিল, সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি দিনে এতটাই প্রবল হয়ে উঠতে শুরু করে যে, সে বুঝতে পারে যে ব্যাপারটা আর সে নিজে একা সামলাতে পারবে না। কোনো ডাক্তারের সাহায্য নিতেই হবে। তাই প্রথমেই সে কথা বলে তাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের সঙ্গে। তিনিই তার পরিচিত এক সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ দেন। জানাজানি হতেই বাড়ি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব— সবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়। শুনতে হয় নানান কটু মন্তব্য, রসালো আলোচনা। তবুও না দমে গিয়ে সেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে আট মাসের বেশি দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থেকে শেষ পর্যন্ত জীবনের সেই অন্ধকার পর্ব পেরিয়ে আসতে পেরেছিল অজন্তা। খুব ধীরে ধীরে হলেও ফিরে পেতে থাকে জীবনের ছন্দ। জীবনকে ছন্দে ফেরানোর সেই অমিত্রাক্ষর শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি আয়ত্তে আসে দেড় বছর মনোরোগ চিকিৎসার পর।
ঠোঁট থেকে যে হাসিটা উধাও হয়ে গিয়েছিল তার, তা এখন ফিরে এসেছে। হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফের ডানা মেলেছে। নিজেকে বিনা কারণে সব ব্যাপারে অপরাধী ভেবে নেওয়ার ভয়ংকর আগ্রাসী আত্মঘাতী প্রবণতা দূর হয়েছে। সবথেকে বড় কথা, জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন কালো পর্দায় ঘিরে দেওয়া অবসাদকে কীভাবে জয় করতে হয়, সেই যুদ্ধবিজয়ের মন্ত্র সে শিখে ফেলেছে মানসিক চিকিৎসার সময়েই। অবশ্যই এটাও বাস্তব সত্যি— সবারই, একশোতে একশো শতাংশ ক্ষেত্রেই সেই মন্ত্রে কাজ হয় না। একশোজনই পুরোপুরিভাবে সেরে ওঠেন না মনোরোগের চিকিৎসা করিয়েও। আজীবন তাদের সঙ্গী হয় অবসাদ, বিষণ্ণতা, সুইসাইডাল প্রবণতা। এসব নিয়েই সারা জীবন বেঁচে-বর্তে থাকেন তারা। কেউ কেউ মানসিক রোগের যন্ত্রণার চাপ সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুকে ডেকে নেন। তবুও ভালো থাকার শেষ চেষ্টা করতে তো ক্ষতি নেই। তাই, শুধু মনের দরজাটা হাট করে খুলে দিন। না হয় শুনতে হলোই— ‘শেষে কিনা পাগলের ডাক্তার…’ সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যান, কারও তোয়াক্কা না করেই। মনে রাখবেন, একমাত্র সামনের সেই পথের শেষেই আছে আপনার অবসাদ-বিষণ্ণতা-মুক্তির রাজপথের নিশ্চিত সদর দরজাটি।

Sumit Chakraborty: