কলকাতা অফিস, ২১ জুলাই- একুশের মঞ্চ থেকে প্রত্যাশিতভাবেই এবার ঋতব্রত শিবিরকে কড়া বার্তা দিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই শিবিরের কোনও নেতাকে আর তার ‘প্রয়োজন নেই’ বলে ঘোষণা করলেন তিনি। পাশাপাশি কে ‘আসল’ তৃণমূল সেই পরীক্ষাতেও সফলভাবে উতরে গেলেন মমতা। দলের নিচুতলার সিংহভাগ কর্মীর আস্থা যে মমতার প্রতি এখনও অটুট তা কালীঘাট তৃণমূলের একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ ফের একবার প্রমাণ করে দিল। আর সেই মঞ্চ থেকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও আক্রমণ করেছেন মমতা।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পরেই ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। একসময় যে নেতারা মমতার আস্থভাজন ছিলেন সেই অরূপ বিশ্বাস, মদন মিত্র, ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যরা হাত মিলিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ফলে একুশে জুলাইয়ের সমাবেশও এবার আড়াআড়িভাবে বিভক্ত। ঋতব্রতরা সভা করলেন মেয়ো রোডে, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিবারের মতো আর এবার ধর্মতলায় সভা করার অনুমতি পেলেন না, আদালতের নির্দেশে তার সভা হলো বিড়লা তারামন্ডলের সামনে ক্যাথিড্রাল রোডে। আবার তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়া তৃণমূলের কুড়িজন সাংসদ আবার দিল্লির রাজঘাটে একটি শহীদ সমাবেশের আয়োজন করেন। একইভাবে শহীদ মিনার ময়দানে সভা করে প্রদেশ কংগ্রেস। সেখানে হাজির ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য, দীপা দাশমুন্সির মতো নেতৃত্ব।
তবে রাজনৈতিক মহলের নজর ছিল মমতার সভাকে ঘিরে। সোমবার থেকেই এই সভাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে ওঠে। প্রতিবারের মতো এবারও সোমবার সন্ধ্যায় সভাস্থল পরিদর্শন করেন মমতা। কিন্তু রাত সাড়ে দশটা নাগাদ একুশে জুলাইয়ের সেই মঞ্চের ব্যানার কারা এসে খুলে দেয়। আর তা নিয়েই পরিস্থিতি যেন এক নাটকীয় মোড় নেয়। রাতেই সেখানে পৌঁছে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেনরা। তারপরে আবার মঞ্চ আগের মতো করে সাজিয়ে তোলা হয়। সকাল থেকেই সেখানে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতে থাকেন। তাদের সকলেরই দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে তৃণমূল করেছেন। তাই তার পাশেই আজও আছেন। আর সেই মঞ্চ থেকে ঋতব্রতদের তীব্র আক্রমণ করলেন মমতা। তার মন্তব্য, ‘সব চোর চলে গিয়েছে। বেঁচে গিয়েছি।’ তার পরেই তিনি দাবি করেন, ইডি-সিবিআইয়ের ভয় দেখানো হচ্ছে। তার সংযোজন, ‘ভয় দেখিয়ে কিছু মানুষকে কিছু ক্ষণের জন্য চুপ রাখা যায়।’ ঋতব্রত শিবিরকে ‘বিজেপির বি টিম’ বলে কটাক্ষ করে মমতার ভবিষ্যদ্বাণী, ওই টিমও দ্রুত ভেঙে যাবে। মমতার বার্তা, ‘ক্ষমা করুন, আপনাদের আর প্রয়োজন নেই। ধনে-মানে-প্রাণে ভাল থাকুন। আপনাদের বলব, পাশবালিশ না হয়ে তারকাটা বিজেপিতেই চলে যান।’ মমতার কথায়, ‘আসল তৃণমূল আমরা। শুধু সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলেই দল হয়ে যায় না। ওটা বিজেপির সাইনবোর্ড। কয়েকজন নেতা চলে গিয়েছেন, কিন্তু কর্মীরা আমাদের সঙ্গেই আছেন।’ জানিয়ে দিলেন, নতুনরাই তার সোনার খনি। আর তাই তাদের নিয়েই আবার নতুন করে শুরু করবেন।
নাম না-করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আক্রমণ শানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, কেবল তৃণমূলের কোল খালি করা হচ্ছে। এই সূত্রেই তিনি বলেন, ‘মুখ খুললে আপনি ১০ বছর তৃণমূলে থেকে কী করেছেন, মুখোশ খুলে দেব।’ মমতার এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার প্রায় দু’মাস পরে শুভেন্দু অধিকারীকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েও একই ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। সে সময়ও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, শুভেন্দু দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টি যে আন্দোলন করছে তাকেও সমর্থনের বার্তা দিয়েছেন মমতা। প্রয়োজন হলে তিনি নিজে ওই আন্দোলনে যোগ দেবেন বলেও জানিয়েছেন। তার মন্তব্য, ‘যে বেইমানি করবে তাকে সমর্থন করার দরকার নেই। দরকার হলে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিতে আমি নিজে যাব। প্রথম থেকেই আমাদের সমর্থন ছিল। যারা নিজের দেশের ছাত্রসমাজকেই ভয় পায়, তারা কেমন সরকার?’