রাজনীতির পাঠশালায় মমতার নতুন অধ্যায়!!

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। ফলও বেরিয়েছে।কিন্তু ভোট-পরবর্তী রাজনীতি এখনও থিতু হয়নি। বরং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনের জাতীয় বিরোধী রাজনীতির চরিত্রই বদলে দিতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে এখন দাঁড়িয়ে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। যে নেত্রী গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় স্তরে কংগ্রেস-বিরোধী রাজনীতির মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তিনিই এখন আবার কংগ্রেসকে পাশে নিয়েই বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথে হাঁটতে চাইছেন। রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু হয় না- এই বহুচর্চিত প্রবাদটির বাস্তব উদাহরণ যেন ফের সামনে এলো।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক বলেই তুলে ধরতে শুরু করেছিল তারা। দিল্লিতে গিয়ে একের পর এক বিরোধী নেতার সঙ্গে বৈঠক, গোয়া-ত্রিপুরা-মেঘালয়ে সংগঠন বিস্তার, এমনকী কংগ্রেস ভাঙিয়ে নেতা টানার রাজনীতিও করেছে তৃণমূল। সংসদে কংগ্রেসের ডাকা বৈঠক এড়িয়ে গিয়ে আলাদা সমীকরণ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। কখনও অখিলেশ যাদব, কখনও অরবিন্দ কেজরীওয়াল, কখনও আবার উদ্ধব ঠাকরেদের সঙ্গে সমান্তরাল বিরোধী মেরু গড়ার প্রয়াস দেখা গিয়েছে। সংসদীয় করিডরে ‘জিঞ্জার গ্রুপ’ নিয়ে যতই চর্চা হোক না কেন, তার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট-কংগ্রেসকে বাদ দিয়েও বিরোধী রাজনীতি সম্ভব।

কিন্তু বাংলার ভোটের পরে হঠাৎ করেই সেই রাজনৈতিক ভাষা বদলে গিয়েছে। এখন তৃণমূলের তরফে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে-“কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে কিছু করা হবে না।” এই একটি বাক্যই আসলে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি। কারণ তৃণমূল বুঝে গিয়েছে, বিজেপির মতো সুবিশাল সাংগঠনিক শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরে একক লড়াইয়ের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঞ্চলিক দলগুলির প্রভাব রাজ্যভিত্তিক হতে পারে, কিন্তু দিল্লির ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে গেলে এখনও কংগ্রেসকে পাশ কাটানো অসম্ভব।

আর এখানেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন রাহুল গান্ধী। নির্বাচনি প্রচারে তৃণমূলকে নিশানা করলেও ফলপ্রকাশের পর তার সংযত রাজনৈতিক অবস্থান এবং মমতার পাশে দাঁড়ানোর বার্তা কার্যত তৃণমূলকে নতুন রাজনৈতিক অক্সিজেন দিয়েছে। বিজেপি-বিরোধী রাজনীতিতে রাহুল এখন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মুখ। বিরোধী জোট রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। ফলে তৃণমূলও বুঝতে পারছে, কংগ্রেসকে ক্রমাগত আক্রমণ করতে থাকলে জাতীয় বিরোধী রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আসলে বাংলার নির্বাচন শুধু একটি প্রাদেশিক ভোট ছিল না। তা হয়ে উঠেছে জাতীয় বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্র। ভোটে ‘সার্বিক অনিয়ম’-এর অভিযোগকে সামনে এনে দিল্লিতে বৃহত্তর বিরোধী মঞ্চ গড়ার যে উদ্যোগ নিচ্ছেন মমতা, তার লক্ষ্য শুধু নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপে ফেলা নয়। এর মাধ্যমে তিনি আবারও জাতীয় বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে উঠতে চাইছেন। কারণ জাতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার জন্য শুধু বাংলা জেতাই যথেষ্ট নয়, দিল্লির বিরোধী সমীকরণেও প্রভাব বজায় রাখা জরুরি।

তবে সেই পথে বাধাও কম নয়। অরবিন্দ কেজরীওয়াল-এর আপ ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, কংগ্রেসের সঙ্গে একই মঞ্চে যাওয়া তাদের পক্ষে কঠিন। পাঞ্জাবের রাজনীতি সেখানে বড় কারণ। আবার দক্ষিণে এম কে স্ট্যালিন -এর দল ডিএমকের অবস্থানও এখন ভিন্ন বাস্তবতায় আবদ্ধ। ফলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের পুরনো কাঠামো ফিরিয়ে আনা এত সহজ হবে না। কিন্তু তৃণমূলের রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট- বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে আপাতত সংঘাত নয়, সমন্বয়ই অগ্রাধিকার।

সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবর্তন তৃণমূলের রাজনৈতিক বাস্তববোধেরও প্রতিফলন।দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতিতে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর তত্ত্ব সামনে আনা হলেও বাস্তবে দেখা গিয়েছে, বিরোধী ভোটের কেন্দ্রীয় সঞ্চালক হিসেবে কংগ্রেসকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এখন নতুন কৌশল নিচ্ছেন মমতা।

রাজনীতির ভাষায় একে কেউ বলবেন ‘ইউ-টার্ন’, কেউ বলবেন ‘প্রাগম্যাটিক পলিটিক্স’। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন একটাই- এই নতুন বিরোধী সমীকরণ কী সত্যিই বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারবে, নাকি আবারও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক স্বার্থের সংঘাতে ভেঙে পড়বে বিরোধী ঐক্যের স্বপ্ন? বাংলার ভোট-পরবর্তী রাজনীতি আপাতত সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে।

Dainik Digital: