বনলতা চরিত্রকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
‘কনে দেখা আলো’ আমার কাছে একেবারেই আলাদা স্বাদের একটি কাজ। এখানে নায়ক-নায়িকা একে অপরকে ভালোবাসে না, যা খুব কমই দেখা যায়। পুরো গল্পটাই একটি জটিল সম্পর্কের আবর্তে তৈরি, যেখানে প্রায় প্রতিটি চরিত্রই কোনও না কোনওভাবে সংগ্রাম করছে। বনলতা নিঃসন্দেহে একটি বিতর্কিত চরিত্র। কেউ তাকে সঠিক মনে করবেন, কেউ ভুল; কেউ তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন, কেউ সমালোচনা করবেন। তবে আমার মনে হয়, সে জীবনের এক কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাধারণ মেয়ে। মানুষ মাত্রই ভুল করে, বনলতার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। কিন্তু সে যাকে ভালোবাসে, তাকে মন থেকে ভালোবাসে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে। আমার কাছে বনলতা আজকের সময়ের এক আধুনিক, যুক্তিবাদী অথচ আবেগপ্রবণ মেয়ে— যে ভালোবাসাকে বোঝে, ভালোবাসতে জানে, আর নিজের অনুভূতির প্রতি সৎ থাকতে চায়।
বনলতার মতো পরিস্থিতি যদি নন্দিনীর বাস্তব জীবনে আসত, তাহলে তিনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখতেন?
প্রথমেই নন্দিনী বুঝতে চাইত, সে ঠিক কী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। যদি দেখত দু’জন মানুষই একে অপরকে সমানভাবে ভালোবাসে, কিন্তু কোনও বাহ্যিক চাপের কারণে এক হতে পারছে না, তাহলে সে সম্পর্কটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। কারণ আজকাল ভালোবাসা কিংবা সম্পর্ক খুব সহজে তৈরি হলেও, তা ধরে রাখার ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। আমার বিশ্বাস, সম্পর্ক তখনই গভীর হয় যখন তুমি প্রিয় মানুষটিকে বারবার ক্ষমা করতে পারো। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে ভালোবেসেও কখনও কষ্ট দেয়নি। এমনকী মা-বাবার সঙ্গেও আমাদের মতভেদ হয়, তবু আমরা সম্পর্ক ছেড়ে দিই না। তবে নন্দিনী বাস্তববাদী। সে হিসেব করে দেখত, সম্পর্কে সে কতটা ভালো আছে। যদি ৮০ শতাংশ সুখ আর ২০ শতাংশ অসন্তোষ থাকে, তাহলে মানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু যদি ৩০ শতাংশ ভালো আর ৭০ শতাংশ কষ্ট থাকে, তাহলে সেই সম্পর্কে থাকার অর্থ হয় না। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু শুধু ‘ভাঙব না’ বলেই জোর করে টিকিয়ে রাখা ঠিক নয়। আর একটি বিষয়— নন্দিনী যদি অনুভব করত, যাকে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছে তার কাছ থেকে সেই ভালোবাসার মর্যাদা বা প্রতিদান সে পাচ্ছে না, তাহলে সে নিজেই সরে আসত। অন্য কোনও নারীকে দোষারোপ করত না, কারণ তার বিশ্বাস— একটি সম্পর্কের দায়িত্ব দু’জন মানুষেরই, তৃতীয় কারও নয়।
‘কনে দেখা আলো’ ধারাবাহিকের ফিডব্যাক কেমন পাচ্ছেন?
ধারাবাহিকটি যেভাবে নির্মিত হয়েছে, তাতে লাজু ও অনুভবের প্রতি দর্শকদের সহানুভূতি অনেক বেশি। এখনকার দর্শক বেশ প্রগ্রেসিভ। তারা মনে করেন ভালোবাসার কোনও হিসেব-নিকেশ হয় না, সেখানে ঠিক-ভুলের অঙ্ক চলে না। সেই কারণেই গল্পের প্রেক্ষিতে বনলতার পক্ষে সমর্থন তুলনামূলকভাবে কম, তার প্রতি সহানুভূতিও খুব বেশি নয়। খুব কম সংখ্যক দর্শকই মনে করেন বনলতা ঠিক করেছে। তবে আমার বিশ্বাস, বনলতা এমন একটি চরিত্র, যাকে বুঝতে সময় লাগে। হয়তো এখনও সেই ধরনের দর্শক পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অনেক সময়ই দেখা যায়, কোনও সিনেমা বা সিরিজ মুক্তির সময় তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায় না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ তার গভীরতা ও বার্তাটি উপলব্ধি করে। ঠিক সেরকমই, বনলতা সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একটি চরিত্র। বলা যায়, পুরো ধারাবাহিকটিই সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একটা গল্প।
এই চরিত্রে অভিনয় করার আগে আপনার নিজের কোন দৃষ্টিভঙ্গিটা সবচেয়ে আগে কাজ করেছিল?
আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে সাধারণত কোনও ধারাবাহিক শুরু হওয়ার সময় একটি মূল ভাবনা বা বেসিক কনটেন্ট থাকে, কিন্তু গল্পের সম্পূর্ণ বিস্তার বা ভবিষ্যৎ মোড় সবসময় আগে থেকে স্পষ্ট থাকে না। প্রথমে জানানো হয়েছিল জি-বাংলায়, দুই জোড়া নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে নিয়ে একটু অন্য ধরনের কাজ শুরু হতে চলেছে। শুরুতে কয়েক মাসের একটি প্রাথমিক ট্র্যাক ভাবা থাকে, তারপর গল্প কোন দিকে যাবে তা অনেক সময় লেখক বা পরিচালকও আগে থেকে জানেন না। এছাড়াও আমাকে বলা হয়েছিল, গল্পটি ‘নৌকাডুবি’ থেকে অনুপ্রাণিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পের ছায়া রয়েছে— এটা স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি করে। পাশাপাশি রাইমা সেন অভিনীত যে ধরনের চরিত্রের রেফারেন্স আমাকে দেওয়া হয়েছিল, সেটিও আমার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছিল। আর লীনাদি-র গল্প বলার ভঙ্গির ওপর ভরসা ছিলই। এই কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখেই আমি বনলতা চরিত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
নন্দিনীর কাঙ্ক্ষিত চরিত্র কেমন?
আমি এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই, যেখানে অভিনয়ের গভীরতা থাকবে এবং মানসিক টানাপোড়েন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে। যেমন ‘দেবী’ ছবির প্রধান চরিত্র—সেই ধরনের মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকায় কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে। আবার মহিলা-কেন্দ্রিক, প্রতিবাদী ও বিপ্লবী চিন্তাধারার চরিত্রও আমাকে ভীষণ টানে যেমন ‘গঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি’-তে আলিয়া ভাট-এর চরিত্র। কিংবা ‘মণিকর্ণিকা: দ্য কুইন অব ঝাঁসি’-তে কঙ্গনা রানাউৎ-এর চরিত্র। এই ধরনের দৃঢ়, আত্মনির্ভর ও লড়াকু চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছে আছে। একই সঙ্গে অ্যাকশনধর্মী কাজ যেমন ভালো লাগে, তেমনই একেবারে নির্মল প্রেমের গল্পও করতে চাই। এক কথায়, তীব্রতা আর কোমলতার মেলবন্ধনে নানা স্বাদের চরিত্রে নিজেকে আবিষ্কার করতে চাই।
নন্দিনী নিজের জীবনকে কীভাবে দেখতে পছন্দ করেন?
আমি একদম ফেক হতে পারি না। যদিও প্রফেশনে কখনও কখনও ডিপ্লোম্যাটিক হতে হয়, আমি চেষ্টা করি রিয়েল থাকতে। তাই কিছু মানুষ আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। যা বলার তা আমি সামনে বলি, পেছনে নয়। তবে ইদানীং আমি এই ব্যাপারে একটু সংযত হয়েছি। আমি মাঝে মাঝে নিজের জীবনে ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। কতটা রাস্তা পেরিয়েছি, কোন পরিস্থিতি সামলিয়েছি— এর থেকে প্রেরণা পাই। মানুষ বলে পিছনে তাকানো ঠিক নয়, কিন্তু আমার মনে হয়,পিছন ফিরে তাকালে এগিয়ে যাওয়ার মোটিভেশন পাওয়া যায়। সাধারণত কাজ না থাকলে আমি বাড়িতে থাকতেই পছন্দ করি। আমার গুটিকতক বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিই, ক্যাফেতে গিয়ে কফি খাই— এই ছোট ছোট সাধারণ আনন্দেই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি। আমি একেবারে সাধারণ ও সিম্পল মেয়ে।
সাধারণ জীবন থেকে বিনোদন জগতে ওঠা— এতে পরিবার কতটা সাপোর্ট করেছে?
বাবা-মার পক্ষ থেকে কখনওই কোনও বাধানিষেধ ছিল না। শিক্ষার গুরুত্ব সবসময় তারা বুঝিয়েছেন। ছোটোবেলা থেকেই আমি নাচ শেখার সুযোগ পেয়েছি। ডান্সের শো করার সময়ই একটা প্রজেক্টের জন্য কল আসে, আর প্রথম কাজেই হিরোর বোনের চরিত্রে সুযোগ পাই। প্রাথমিক সময়ে মানসিকভাবে কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। কাজের জায়গায় অনেক মানুষের আচরণ কিছুটা কঠিন মনে হতো, তাই ভাবতাম হয়তো এই ইন্ডাস্ট্রি আমার জন্য নয়। তবে ধীরে ধীরে সেই ভালোবাসা বেড়েছে, এবং এখন মনে হয়— এটাই আমার সঠিক জায়গা। এর থেকে ভালো কিছু করতে পারতাম না।
কেরিয়ারের বাইরে অন্য কাজ শুরু করার ভাবনা আছে?
আমার একটা ফিটনেস স্টুডিও রয়েছে, যা গত বছর নভেম্বর মাসে উদ্বোধন হয়েছিল। সেখানে জুম্বা, যোগা, নিয়মিত হেলথ চেকআপ, সাপ্লিমেন্টারি স্টোর এবং ডায়াটিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করার ব্যবস্থা আছে। বাবা এবং পরিবার এই স্টুডিও পরিচালনায় সাহায্য করেন। আমার কাছে এটা শুধুমাত্র আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়। অভিনয় থেকে ৫-৬ মাসের ব্রেকের সময় মেন্টালি মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকী ডিপ্রেশনের মধ্যে চলে যায়। তাই আমি মাইন্ডকে ব্যস্ত রাখতে চাই— যেমন রান্না বা ফিটনেস। একাধিক কাজ করলে মন সবসময় সক্রিয় থাকে এবং চাপ কম অনুভূত হয়। অতিরিক্ত উদ্যোগের মূল লক্ষ্য তাই শুধু অর্থ নয়, মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা।
বর্তমানে সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের সুযোগ বাড়লেও টেলিভিশন আপনার জন্য কী অর্থ বহন করে?
অভিনেতাদের সাধারণত মূল লক্ষ্য সিনেমা, আর এখন সিরিজের সুযোগও অনেক বেড়েছে। সিনেমা বা সিরিজে কাজের জন্য টেলিভিশন থেকে খানিকটা বিরতি নিতে হতে পারে। তবুও টেলিভিশন আমাকে শিখিয়েছে ক্যামেরার সামনে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে টেকনিক্যালি সাউন্ড হতে হয়। তাই টেলিভিশন আমার প্রথম ভালোবাসা।