প্রি-ডায়াবেটিস কি ডায়াবেটিসের সতর্কবার্তা? জেনে নিন ঘুরে দাঁড়ানোর সহজ উপায়

আমাদের চারপাশে অসচেতনতা ও অনিয়মিত জীবনযাত্রার কারণে নীরবে বাসা বাঁধছে উচ্চ রক্তশর্করার সমস্যা। তবে রক্তে শর্করার মাত্রা বিপদসীমা ছুঁয়ে ফেলার ঠিক আগের ধাপটিই হলো ‘প্রি-ডায়াবেটিস’। এটি মূলত শরীর থেকে আসা একটি শেষ সুযোগ বা সতর্কবার্তা—যা নির্দেশ করে যে এখনই খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় লাগাম না টানলে তা পুরোপুরি ডায়াবেটিসে রূপ নিতে পারে। প্রি-ডায়াবেটিস আসলে কী? ভীতি দূর করে কীভাবে সঠিক ডায়েট ও রুটিন মেনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ শ্রেয়া চক্রবর্তী। সাক্ষাৎকার: আনন্দিতা সরকার।

প্রি-ডায়াবেটিস আসলে কী? এটাকে কি ডায়াবেটিস বলা চলে?
আজকাল ঘরে ঘরে অতি পরিচিত একটি শব্দ ‘ডায়াবেটিস’। তবে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটিকে বলা হয় ‘প্রি-ডায়াবেটিস’। প্রি-ডায়াবেটিস মানেই আপনি পুরোপুরি ডায়াবেটিক নন। রক্তে HbA1c-এর লেভেল যদি ৫.৭ থেকে ৬.৪-এর মধ্যে থাকে, তাকে প্রি-ডায়াবেটিস বলা হয় (৬.৪-এর বেশি হওয়া মানেই ডায়াবেটিস)। আসলে এটি শরীরে ডায়াবেটিস আসার একটা আগাম ‘অ্যালার্ম’। তবে এই ধাপে ধরা পড়লে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করা উচিত, কারণ সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চার মাধ্যমে এখান থেকে আবার পুরোপুরি সুস্থ জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।
এই সময়ে খাদ্যাভ্যাসে কী ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার?
চিনি, সাদা ভাত, আলু, চিপস, ভাজাপোড়া এবং কোল্ড ড্রিংকস একেবারেই বন্ধ করতে হবে। খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, ফল ও ফাইবারজাতীয় খাবার বাড়াতে হবে। হোল গ্রেইনস যেমন—ডালিয়া, ওটস, বাজরা, মিলেট বা রাগি খুব ভালো। এ ছাড়া বাদাম ও চিয়া সিড রাখা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতি বেলার খাবারে প্রোটিন থাকা বাধ্যতামূলক—তা সে নিরামিষ (সয়াবিন, পনির, টক দই, ডাল, ছোলা) হোক বা আমিষ (ডিম, চিকেন, মাছ)।
ভাত, রুটি বা আলু কি ডায়েট থেকে একেবারে বাদ দিয়ে দেওয়া উচিত?
একদমই নয়। কার্বোহাইড্রেট আমাদের শরীরের শক্তির মূল উৎস, তাই এটা বাদ দেওয়া যাবে না, শুধু পরিমাণ কমাতে হবে। সাধারণ শর্করা কমিয়ে ফাইবারযুক্ত কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট (ডালিয়া, ওটস, মিলেট) খেতে হবে। আলু এড়িয়ে চলাই ভালো, তবে মাঝেমধ্যে মিষ্টি আলু খাওয়া যেতে পারে।
প্রি-ডায়াবেটিসে ফল খাওয়া নিয়ে অনেক দ্বিধা থাকে। কোন ফলগুলো খাওয়া নিষেধ?
কিছু ফলে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে। তাই আম, লিচু, কলা এবং কাঁঠাল এড়িয়ে চলাই ভালো। পাশাপাশি ফলের রস না খেয়ে গোটা ফল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
যারা ব্যস্ততার জন্য বাইরে থাকেন বা চাকরি করেন, তারা কীভাবে রুটিন সামলাবেন?
বাইরে খেলে ভাতের পরিমাণ কমিয়ে ডাল, চিকেন বা সয়াবিনের মতো প্রোটিন এবং রুটি-সবজি বেছে নিন।
চাউমিন, এগ রোল, বিরিয়ানি বা স্পাইসি খাবার ছোঁয়াও চলবে না। বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো। দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে না থেকে বারেবারে অল্প করে খাওয়া উচিত।
স্থূলতা বা মেদ কতটা প্রভাব ফেলে এই রোগের ওপর?
ওবিসিটি বা স্থূলতা মেটাবলিক ডিসঅর্ডার ও হরমোনাল ইমব্যালান্সের অন্যতম প্রধান কারণ, যা পরবর্তীতে প্রি-ডায়াবেটিসের দিকে নিয়ে যায়।
ওজন কিছুটা কমাতে পারলেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আর রান্নায় বা পানীয়তে স্টেভিয়া বা মাঙ্ক ফ্রুট সুগারের মতো প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে।
সামাজিক অনুষ্ঠান বা নিমন্ত্রণে নিজেকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব?
নিমন্ত্রণবাড়িতে মিষ্টিজাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। রেস্তোরাঁয় খেলে রিচ খাবারের বদলে স্টার্টার হিসেবে স্যুপ বা চিকেন স্যালাড নেওয়া শরীরের জন্য অনেক ভালো।
ডায়েটে কি কোনো ‘চিট মিল’ বা পছন্দের খাবার খাওয়ার সুযোগ আছে?
মন খারাপ করে ডায়েট করা যায় না, তাই মাসে একবার-দু’বার চিট মিল করাই যায়।
তবে বাইরের তেল-মশলাযুক্ত খাবারের বদলে ছুটির দিনে বাড়িতেই স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ ভালো খাবার বানিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রি-ডায়াবেটিসে সময় মেনে খাওয়ার গুরুত্ব কতটা?
সঠিক সময়ে খাওয়া ভীষণ জরুরি। কাজের চাপে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা এদিক-ওদিক হতে পারে, কিন্তু ৩–৪ ঘণ্টার বেশি গ্যাপ দেওয়া শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এমনকী যে কোনও সুস্থ মানুষের জন্যও অনেকক্ষণ গ্যাপে খাওয়া ঠিক নয়।
ডায়াবেটিস নিয়ে তো সমাজে অনেক ভুল ধারণাও প্রচলিত রয়েছে?
হ্যাঁ, অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস হলেই কিডনি খারাপ হয়ে যায়, কিংবা গাজর ও মাটির নিচের সবজি একদম খাওয়া যায় না।
এমনকী অনেকে ভাবেন, এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এগুলো সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সঠিক নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শ মেনে ডায়েট ও শরীরচর্চা করলে এটি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
শিশু ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে কেন? তাদের কীভাবে সচেতন করা যাবে?
এর মূল কারণ জাঙ্ক ফুড, কেনা ফলের রস খাওয়া, কায়িক শ্রমের অভাব, স্ক্রিন অ্যাডিকশন (ফোন/টিভি) এবং মানসিক স্ট্রেস। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
তরুণদের স্ট্রেস কমাতে হবে, পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে, প্রচুর জল খেতে হবে এবং এক মিল থেকে অন্য মিলের সময়ের ব্যবধান সঠিক রাখতে হবে।
সাধারণ মানুষের ডায়াবেটিস প্রতিরোধে আগাম কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?
প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা করা।
খাবারে প্রচুর ফাইবার (সবুজ শাকসবজি, বীজ, বাদাম, গোটা ফল) রাখা।
প্রোটিনের ঘাটতি না রাখা (মাছ, মাংস, ডিম, ছানা, ডাল, রাজমা ইত্যাদি প্রতিদিনের তালিকায় রাখা)।
পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন।
এতে শরীর যেমন ঠিক থাকে, তেমনই আবার ঘুমের অভাব হলে মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। ডায়াবেটিস থাকুক বা না থাকুক, প্রত্যেকেরই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় মেনে খাবার খাওয়া উচিত।

Sumit Chakraborty: