কাটোয়া থেকে কলকাতায় এসে মডেলিং দিয়ে শুরু, তারপর অভিনয়ে নিজের জায়গা তৈরি– প্রিয়াঙ্কা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অভিনয় জীবন একেবারেই নিজের চেষ্টায়। কাজের ওঠা-নামার মাঝেও তার বিশ্বাস- ব্যস্ত থাকাই ভালো থাকার চাবিকাঠি। খোলামেলা আড্ডায় উঠে এল তার পথচলা ও জীবনের সহজ দর্শন। শুনলেন আনন্দিতা সরকার।
আপনার কেরিয়ারের শুরু কীভাবে?
আমি কাটোয়ার (পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ব বর্ধমান জেলা) মেয়ে। সেখান থেকে কলকাতায় এয়ার হোস্টেস পড়তে এসেছিলাম। সেই সময়েই একেবারে হঠাৎ করে মডেলিংয়ে ঢোকা। ২০১৭সালে এক বন্ধুর দাদার ফটোশুটে হেল্প করতে গিয়ে নিজেরই শুট করা হয়ে যায়। শুটটা ভালো হওয়ায় আমাকে কিছু পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। তখনই প্রথম বুঝি, এই ভাবেও কেরিয়ার করা সম্ভব। এরপর আরও কিছু মডেলিংয়ের অফার আসতে শুরু করে। এভাবেই ধীরে ধীরে মডেলিংয়ের জগতে ঢুকে পড়ি।
সবসময় এত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি- এর রহস্য কী?
আমি মনে করি, নিজের ক্রেডিটে কিছু করতে পারলে যে তৃপ্তিটা পাওয়া যায়, সেটাই আসল আনন্দ। আমি খুব ‘গো উইথ দ্য ফ্লো’ ধরনের মানুষ। কোনো কাজ না হলে সেটাকে নিয়ে বসে থাকি না, বরং ভাবি এরপর কী করা যায়। একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারলে আমি আরও খুশি হই। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারলেই আমার ভালো লাগে। নিজের মতো চলাই আমার আনন্দের পাসওয়ার্ড।
মডেলিং থেকে অভিনয়ে আসার যাত্রা কেমন ছিল?
প্রায় সাড়ে সাত বছর মডেলিং করেছি। ব্র্যান্ড শুট, ব্রাইডাল শুট, র্যাম্প- সবই করেছি। তারপর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। শর্ট ফিল্ম, মিউজিক ভিডিও- এসব করতে করতে অভিজ্ঞতা বাড়ে। ৭০টিরও বেশি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছি। এরপর ২০২৩ সালে ‘কথা’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের সুযোগ পাই, যা আমার টেলিভিশনে প্রথম বড় কাজ।
বর্তমানে কী কী কাজ করছেন?
জানুয়ারিতে ‘রানী ভবানী’ ধারাবাহিকের কাজ শেষ করেছি। এরপর কয়েকটা অফার এলেও সময় পাইনি, তাই করা হয়নি। মাঝে হইচই প্ল্যাটফর্মে ‘কালরাত্রি’ নামে একটি ওয়েব সিরিজে কাজ করেছি। বেশ কয়েকটা মেগা সিরিয়ালের অফার আসলেও সময়ের অভাবে করতে পারিনি। এরকম হলে পরের কাজ আসতে কখনো কখনো সময় লেগে যায়। তবে আমি বিশ্বাস করি, সঠিক সময়ে সঠিক কাজ আসবেই।
কাজের ওঠা-নামা তো এই পেশায় খুব স্বাভাবিক। সেই সময়টা কীভাবে সামলান?
অবশ্যই ওঠা-নামা আছে। কাজ থাকলে এক রকম, আর না থাকলে অন্যরকম লাগে। ডিপ্রেশন আসাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে আমি নিজেকে বোঝাই হয়তো অন্য কেউ আমার থেকে বেশি পরিশ্রম করছে, তাই সে কাজ পাচ্ছে। এই ভাবনাটা আমাকে ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করে। আমি বিশ্বাস করি, আমি যতটা খাটছি, ততটাই পাচ্ছি।
ইন্ডাস্ট্রিতে বন্ধুত্ব কতটা তৈরি হয়?
মডেলিংয়ের মাধ্যমে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। সিরিয়ালে কাজ করার পর নতুন মানুষদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তবে সত্যি বলতে, গভীর বন্ধুত্ব খুব একটা হয়নি। ইন্ডাস্ট্রির বাইরে আমার নিজের বন্ধুদের পরিধিই এত বড় যে আলাদা করে খুব বেশি কিছু দরকার পড়ে না। তবে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, সবার সঙ্গে যোগাযোগ আছে।
অনেকেই বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে পিআর খুব জরুরি। আপনি কী মনে করেন?
পিআর অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমি ওই জায়গায় খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই। স্ক্রিপ্ট নিয়ে সারারাত জেগে থাকতে পারি, কিন্তু শুধু সাজগোজ করে কোথাও গিয়ে নেটওয়ার্কিং করা- এটা আমার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। হয়তো এই কারণে কাজের সংখ্যা কিছুটা কম, কিন্তু তাতে আমার কোনো আপশোশ নেই।
শুনেছি নিজের টিম বা প্রোডাকশন নিয়ে কাজ করছেন?
হ্যাঁ, একটা ছোট টিম আছে। ছোট ছোট গল্প উপস্থাপনা করা হয় রিলসের মাধ্যমে। ডিরেক্টর, স্ক্রিপ্ট রাইটার আছে। অনেক সময় কনসেপ্ট আমি দিই। যেমন ‘আলো’ আর ‘অন্য বসন্ত’- এই কাজগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ প্রশংসা পেয়েছে। আমরা চেষ্টা করি নতুন কিছু করার।
ভবিষ্যতে পরিচালনা করার ইচ্ছে আছে?
অবশ্যই আছে। অনেকদিনের ইচ্ছে, কোনও ভালো পরিচালকের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করা। অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরা, সিনেমাটোগ্রাফি- এই দিকগুলো আমাকে খুব টানে। ক্যামেরার পেছনের কাজ করার খুব আগ্রহ।
অভিনয়ের বাইরে অন্য কোনও পরিকল্পনা?
হ্যাঁ, আমার মাথায় সবসময়ই বিকল্প কিছু থাকে। কাটোয়ায় আমাদের বাড়ির পাশে একটা জায়গা আছে। সেখানে একটা ক্লাউড কিচেন আর হোমস্টে বা ছেলে-মেয়েদের থাকার জন্য কোনও মেস তৈরি করার ইচ্ছে আছে। আমার বাবা ডাক্তার, চেম্বারের পাশের জায়গাটা ব্যবহার করতে চাই। আমি মনে করি, যতদিন সময় আছে, ততদিন যতটা সম্ভব কাজ করে নেওয়া উচিত।
আপনার জীবনদর্শন কী?
আমি খুব সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করি। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি, তাই ছোট ছোট জিনিসেই আনন্দ খুঁজে পাই। নিজের মতো করে এগোতে পারাটাই আমার কাছে বড় ব্যাপার।
এত শুটিং, ট্রাভেলের মধ্যে নিজের ত্বকের যত্ন কীভাবে নেন?
আমি খুব একটা রূপচর্চা করি না, একটু টমবয় টাইপ। তবে সানস্ক্রিন ব্যবহার করি, আর শুটিং থেকে ফিরে মেকআপ ভালো করে তুলে ফেলি। বাড়িতে থাকলে মা অনেক ঘরোয়া টোটকা দেয়, আর কলকাতায় আমার বোন আমাকে সাহায্য করে।
ফিটনেস বা ডায়েট নিয়ে কিছু বলবেন?
আমি খুব স্ট্রিক্ট ডায়েট ফলো করি না। সব রকম খাবারই খাই, তবে ব্যালান্স রাখার চেষ্টা করি। আর একটা কথা বলতে হবে- আমি ভীষণ চা-প্রেমী। কলকাতার নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে চা খেতে খুব ভালোবাসি। চিনি ছাড়া দুধ-চা আমার সবথেকে প্রিয়।
ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
ভালো কাজ করতে চাই, নতুন কিছু শিখতে চাই। অভিনয়,
পরিচালনা, নিজের ব্যবসা-সবকিছু মিলিয়ে একটা ব্যালান্সড জীবন চাই। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের মতো করে খুশি থাকতে চাই।