সাক্ষাৎকার : ‘দার্শনিক অবস্থানকে প্রশ্ন করে আরেক দার্শনিকতায় উত্তরণই কবিতার একটি অন্যতম স্বভাব’

এই সময়ের বাংলা কবিতার কাঠামোকে নিপুণ দক্ষতায় বিশ্লেষণ করতে যে কয়েকজন তরুণ পারদর্শী সব্যসাচী মজুমদার নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম প্রধান একজন। চলতি বছরে, এই কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে সব্যসাচীর ‘চার মাত্রার কথা’। বইটি নিয়েই সব্যসাচী মজুমদারের সঙ্গে আলাপচারিচায় বাসব মৈত্র। আজ প্রথম পর্ব।

১/ আজকের কথোপকথন মূলত আপনার সাম্প্রতিক গদ্য গ্রন্থ “চার মাত্রার কথা” নিয়ে ।এই গ্রন্থে আপনি বাংলা ভাষার চারজন প্রধান কবিকে নিয়ে আলোচনা করেছেন। মণীন্দ্র গুপ্ত।বিনয় মজুমদার।দেবদাস আচার্য।দেবারতি মিত্র।
তিন জন পুরুষ কবি।একজন মহিলা কবি। এখন অবশ্য মহিলা কবি হিসেবে আলাদা করে উল্লেখ করা হয় না।অনেকক্ষেত্রেই।
কিন্তু পুরুষ ও মহিলা কবিকে লিঙ্গের ভিত্তিতে আলাদা করে না দেখলে,তাদের সামাজিক রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক, এমনকি যৌনতার ক্ষেত্রেও আলাদা অবস্থানকে কি প্রকৃত সম্মান দেওয়া হয়? তাদের কবিতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কি ভিন্নধর্মী ঢেউ,মনস্তত্ত্বর প্রতি অবিচার করা হয় না?

উঃ দেখুন, এ কথা আমরা সকলেই জানি, প্রতিটি বিষয়ের অনেকগুলো দিক থাকে। তারমধ্যে দুটো দিক খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে — তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক। আমরা যদি তাত্ত্বিকভাবে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হ‌ই, তবে, দেখতে পাব — বস্তুত লিঙ্গ বিভাজন বলে কিছু হয় না। প্রাপ্তি আসলে উভলিঙ্গ। পরিবেশের কারণে ধীরে সে এক লিঙ্গ আকৃতি গ্রহণ করেছে। তারপরও লিঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অর্থাৎ জন্মদানের জন্য দুই লিঙ্গকেই সমানভাবে প্রয়োজন। সুতরাং এভাবে দেখলে কিন্তু লিঙ্গ বিভাজন বিষয়টাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। আবার যদি বস্তুর ওপর ভিত্তি করে দেখা যায় — মানুষ শেষ পর্যন্ত বস্তুর একটা রূপ। সেক্ষেত্রে লিঙ্গ বিষয়টাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।

এবার যদি প্রায়োগিক দিক থেকে দেখি, অন্ততপক্ষে মানুষের গড়ে তোলা সমাজের সাপেক্ষে, মানুষ সবচেয়ে বেশি বেগ পেয়েছে যে সমস্যাগুলির সমাধান করতে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা এই লিঙ্গ বিভাজনের সমস্যা। সে তার একটি সত্তার অবদমক সত্তার কবল থেকে নিপীড়িত সত্তাকে রক্ষা করতে নারীবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছে। তার বিবর্তন ঘটেছে। ক্রমে ইকো ফেমিনিজম এসেছে। তাকেও অতিক্রম করে জন্ম নিয়েছে অ্যান্ড্রোজেনিক হয়ে ওঠার ভাবনা। এই অ্যান্ড্রোজেনিক চিন্তায় কিন্তু লিঙ্গের ধারণাটাই প্রচ্ছন্ন হয়ে যায়। বোধহয় এখন একটা সাম্যাবস্থা আসতে চলেছে। কিন্তু, এখনও পর্যন্ত আমাদের মানুষের সমাজের গঠন যেরকম, তাতে আলাদা করে লিঙ্গের কথা উল্লেখ না করলে,সত্তা বা লেখকের লড়াইটাকে, সাব্যস্ত হ‌ওয়ার পথটাকে অস্বীকার করা হয় বৈকি।

২/ মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতার ক্ষেত্রে আপনি বলছেন, অকিঞ্চিৎকর কোথাও একটা মান্যতা পায়। এই প্রবণতা কি আমরা জীবনানন্দের কবিতায় পাই না? যদি পেয়ে থাকি , তাহলে মনী ন্দ্র কোথায় কীভাবে আলাদা?

উঃ দেখুন এক্ষেত্রে ভাবতে গেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাতে বা জসিমউদ্দিনের কবিতাতেও এক‌ই স্বভাব দেখতে পাই। জসিমউদ্দিন অবশ্য আর‌ও একটি ভিন্ন ক্ষেত্র। যদি আমরা এভাবে দেখি, তুচ্ছ – অকিঞ্চিৎকরের সঙ্গে মহাজীবনের সম্পর্ক নির্মাণ প্রায় বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি কবির কবিতাতেই দেখা যায়। কিন্তু, তাঁদের প্রত্যেকের স্বাতন্ত্র্য এখানেই প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ও আবহাওয়ায় নির্মাণ করেছেন এই সম্পর্কের সেতু। জীবনানন্দের পরিবেশ যে রঙ ও পরিবেশ পায়, যে টপোগ্রাফি তৈরি করে মণীন্দ্র গুপ্ত একদমই সেখান থেকে স্বতন্ত্র। জীবনানন্দ একটা জগৎ গড়ে তোলেন। মণীন্দ্র দৃশ্য জগৎকে অবিকল ধরে রাখার চেষ্টা করেন। একজন উদ্ভট অথবা না দেখা ওঠা চিহ্নগুলোকে সংকলন করেন। আরেকজন নির্ভর করেন পোট্রেটে। জীবনানন্দের উটের গ্রীবা অন্ধকার হয়ে মানুষকে উদ্বাস্তু করে। আর মণীন্দ্রের গণ্ডার মানুষকে দুষ্টু প্রাণি ভেবে এড়িয়ে যায়। এখানেই পার্থক্য।বা মণীন্দ্রের স্বাতন্ত্র্য।

৩/ আপনার বিশ্লেষণে মণীন্দ্রর কবিতায় আধ্যাত্মিক মোড়কের স্বরূপ কীরকম?

উঃ আধ্যাত্মিক বলতে মণীন্দ্র গুপ্ত আমাদের চেনাশোনা ধর্ম ধারণার ধারাকে ভেঙেছেন। যদি আমরা আধ্যাত্মিক বলতে সমর্পণ বুঝি, মানুষের গড়ে তোলা দেবতার কাছে সমর্পণ— মণীন্দ্র গুপ্ত আধ্যাত্মিক নন। মেটাফিজিক্যাল নন। কিন্তু, যদি আমরা আধ্যাত্মিক সমর্পন বলতে বুঝি, আমাদের দৃশ্য জগতের বাইরেও বহু বিস্তারিত অনন্ত অস্তিত্বের কাছে আত্মসমর্পণ— মণীন্দ্র গুপ্ত অবশ্যই আধ্যাত্মিক। অবশ্যই মেটাফিজিক্যাল।

৪/ মার্কেজ জাদুবাস্তবতা সম্পর্কে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, যার মূল বক্তব্য আপনার বিশ্লেষণে,এক এক দেশে তার প্রতিবেশ অনুযায়ী বদলে যায় জাদু বাস্তবতাবাদ। মণীন্দ্র গুপ্তের ক্ষেত্রে আপনি দেখিয়েছেন, চর্যাপদের প্রসঙ্গ। যদিও বিচ্ছিন্ন আভাস বলেছেন একে। বিশদে একটু জানতে চাই।

উঃ দেখুন, জাদু বাস্তবতা— এই ধারণা অর্থাৎ বৈয়াকরণিক ধারণাটাই আমাদের দেশের নয়। এটা লাতিন আমেরিকার সাহিত্য থেকে জাত— আমরা জানি। এবার জাদু বাস্তবতা বলতে আমরা যা বুঝি— এমন কিছু ঘটনা বা দৃশ্য নির্মাণ যা আমাদের জগতে সচরাচর ঘটে না। ঘটে থাকলেও তার ভেতরে কার্য কারণ থাকে। আমাদের সামনে সেগুলো স্পষ্ট হয়েও থাকে। এখন, সেই কার্য কারণগুলোকে প্রচ্ছন্ন করে দিলে বা মুছে দিলেই সেটা জাদুর মতো মনে হয়। এমন জাদু যা বাস্তবতার ভেতরেই আছে। এই প্রবণতা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই অতি পুরোনো সময় থেকেই আছে। ধর্মীয় অলৌকিকতা তো এই জাদুর ওপরেই নির্ভর। সে কারণেই ম্যাজিক শব্দটার সঙ্গে ম্যাজাই শব্দের বুৎপত্তিগত মিল আছে।

এখন, আমাদের দেশেও জাদু বাস্তবতার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই ছিল। গদ্যেও, কবিতাতেও। কিন্তু, জাদু বাস্তবতার ধারণাকে না জেনেই স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রবণতা গড়ে উঠেছিল। যে তাঁর দেখার দৃষ্টিকে যেভাবে রেখেছেন— সেভাবেই ধরা পড়েছে জগৎ। কখনও কখনও তা জাদু বাস্তবতার সঙ্গে সাযুজ্য পেয়ে যেত। জাদু বাস্তবতার আধুনিক চর্চা সম্পর্কে জেনে তাকে সচেতনভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা কিন্তু নব্বই দশকের আগে অন্তত আমার বিশেষ চোখে পড়েনি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে। কখনও কখনও কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন অব্যবহিত পূর্বে। যেমন মণীন্দ্র গুপ্ত। হয়তো আধুনিক জাদু বাস্তবতা চর্চা সম্পর্কে সচেতন হয়ে মণীন্দ্র বাবু লেখেননি। এটা তাঁর কবিতার নিবিড় পাঠক মাত্র‌ই জানেন। তাঁর দৃষ্টি এমন উদার ও বিচিত্রমাত্রিক ছিল যে জগতের উদ্ভট স্বভাবের ছবি ধরা পড়তো স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী। এ কারণেই মণীন্দ্র বাবুর এই জাদু প্রবণতাকে বিচ্ছিন্ন ও স্বতন্ত্র একটি চর্চা বলেই মনে করি। অন্তত ষাট-সত্তরের দশকের প্রেক্ষিতে তো বটেই।

৫ . গণিত ও বিনয় মজুমদার-এর কবিতা।এই প্রসঙ্গ কীরকম ধাঁধার মতোন। গণিত ও প্রকৃতিও তো তাই।এর সঙ্গে অবচেতন। বিনয় মজুমদার কীভাবে এই তত্ত্বগুলোকে একটা অন্যমাত্রায় উত্তীর্ণ করলেন বলে আপনার মনে হয়? মূলত রান্নাঘরের কথা জানতে চাইছি।

উঃ এভাবে তো বলা অসম্ভব। একজন কবিই বলতে পারেন তাঁর শিল্পের কূট ও কুহকের বৃত্তান্ত। পাঠক হিসেবে আমি আমার ব্যখ্যা বা ধারণার কথা বলতে পারি বড়জোর।

এ কথায় আমরা সহমত হব যে, অংকের বিভিন্ন টার্মিনোলজিকে ব্যবহার করা মানেই অংকের দর্শনকে ব্যবহার করা নয়। অংক তো নির্ণয়ের উপায় নয়। অনিশ্চিতের দিকে, বহু মাত্রার, বহু সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার অবলম্বন। বিনয় মজুমদার এই অনিশ্চিতের ভাষ্যকে লিখেছিলেন। লিখেছেন অনেকেই। আসলে একটা পরিস্থিতিতে অংক আর কবিতার ভেদরেখা আর থাকে না সম্ভবত। ওই অনিশ্চিত এক করে সবাইকে।

কিন্তু, বিনয় মজুমদারের প্রসঙ্গ এলে বলা যায় অংক বিনয়ের কাছে কেবল সংখ্যার হিসেব নয়। কেবল বাজারের খতিয়ান নয়। জীবন ও অস্তিত্ব সমগ্রে অংকের যত রকম সম্ভাবনা থাকে, তাকেই অনুভব করার করার চেষ্টা করেছিলেন। একটা বিষয় বা দৃশ্যকে বহু স্তরিক করে তোলাই বিনয় মজুমদারের কবিতার লক্ষ বলে মনে হয়। আর এখানেই অংক আর কবিতা তাদের ভেদরেখা মুছে একাকার হয়ে যায় বিনয় মজুমদারের কবিতায়।

৬/ পিওরিটির প্রসঙ্গ আপনি তুলেছেন।বিনয় মজুমদারের কবিতা প্রসঙ্গে।বিনয়ের কবিতায় এই ধারণা বা বাস্তবতা যে ভাবেই বিষয়টাকে দেখুন তা কতটা বিনয়ের অবচেতনকে আহত করেছে বলে মনে করেন?

উঃ এখানে আমার একটা সন্দেহ আছে। পিওরিটির প্রতি সন্দেহ। আদৌ পিওরিটি বলে কিছু হয়! নাকি মানুষের সাপেক্ষে একটা ধারণা পিওরিটি ! একটা ফ্যালাসি ? যাকে আমরা পিওর বলছি না — সে কেন পিওর নয় — এ বিষয়ে জানতে গেলে দেখব ওই মানুষ কেন্দ্রিক একটা ধারণার কথাই শুনছি। সবটাই একটা দূর পর্যন্ত এগিয়ে থেমে যায়। পিওরিটির ধারণাও।বা অন্যভাবে দেখলে সবকিছুই পিওর। যে সারস উড়ে যাচ্ছে সেও প্রকৃত। যে উড়ে যাচ্ছে না , সেও প্রকৃত।

বিনয় মজুমদারের ব্যবহৃত ওই ‘প্রকৃত’ ( মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়) শব্দের ব্যবহারে আমার একটি সন্দেহ আছে। আমার ধারণা এই বিশেষণটির ব্যবহার বিনয় মজুমদারের কবিতাটিকে সন্দেহযোগ্য‌ও করেছে, জনপ্রিয়ও করেছে। এটুকুই।

৭/ দার্শনিকতা কবিতার কাঠামোকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করলে ভালো হয়?বিনয়ের কবিতায় রিলিফের ভূমিকা কতটা?
উঃ দার্শনিক অবস্থানকে প্রশ্ন করে আরেক দার্শনিকতায় উত্তরণ‌ই তো কবিতার একটি অন্যতম স্বভাব। একটি নতুন দর্শন আমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করাটাও তো কবিতার অন্যতম লক্ষণ। এখন, তাকে আপনি কীভাবে উপস্থাপন তার ওপর নির্ভর করে কবিতার বিস্তার ও প্রত্যাহার নির্ভর করে। কেউ কেউ এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা, প্রত্যক্ষ, স্পর্শকাতর। আবার কেউ কেউ ভাষা ও ইঙ্গিতের বর্ম ব্যবহার করে প্রত্যাহার করতে চান স্পর্শকাতরতাকে। এটুকুই পার্থক্য বলে মনে হয়।

বিনয় মজুমদারের কবিতার সবচেয়ে বড় রিলিফের জায়গা বলে আমার মনে হয় — বিস্ময়কর অক্ষরবৃত্ত।

৮/বিনয়ের কবিতায় প্রকৃতি প্রসঙ্গে সুমন গুণের বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করেছেন।কিন্তু আপনি কি মনে করেন,প্রকৃত প্রস্তাবে, প্রকৃতির উপাদান,চারপাশের উপকরণ ঝুলিতে তুলতে তুলতে বিনয়ের এগোনো ঘাড় হেঁট করে? শুধুই নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে? কেননা অভিজ্ঞতা তো একসময় জ্ঞান! জ্ঞানের চর্চা কি নাগরিক উদযাপনও নয়?

উঃ নিঃসন্দেহে। সুমন গুণের নির্ণয় আমাদের যে কথা জানাচ্ছে আগেও বলার চেষ্টা করেছি জীবনানন্দের কবিতা প্রসঙ্গে। জীবনানন্দ একজন সংগ্রাহক হিসেবে কুড়িয়ে নেন। কতটা নেবেন সেটা তিনিই ঠিক করবেন।

আর নিঃসন্দেহে বিনয় মজুমদার সমস্ত অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেন। আমরা বিনয় মজুমদারের কবিতার পড়লেই বুঝতে পারি, কি নিপুণ মনোলগধর্মী তাঁর ভাষা।

এবার আসা যাক জ্ঞান ও নাগরিক চর্চার প্রসঙ্গে। নগর যদি কেন্দ্র শব্দকে বোঝায় তবে জ্ঞান নগর গড়ে তোলে। কিন্তু জ্ঞান বলতে যদি উজ্জ্বলতাময় বিন্যাসকে বুঝি — জ্ঞান নাগরিক চর্চা নয়।

Sumit Chakraborty: