ছাব্বিশের মহারণে নিবিড় জনসংযোগ তার লক্ষ্য

জনসংযোগে ব্যস্ত জঙ্গিপুরের বিজেপি প্রার্থী

সুমিত চক্রবর্তী, জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ –


সেটা ১৯৯১ সাল। বাম জমানা। সেবছরের বিধানসভা নির্বাচনে বামেরা ফের সিংহভাগ আসনে জয়লাভ করে সরকার গড়ে। সেই বছরেই একটি ঘটনা রাজনৈতিক মহলে কিছুটা হলেও সাড়া ফেলেছিল। তা হল মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর কেন্দ্রের ভোটের ফল। বেশ অবাক করে দিয়ে এই কেন্দ্রে সেসময় বিজেপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসেন চিত্ত মুখোপাধ্যায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুর এই সময়ে বাংলায় বিজেপির আধিপত্য প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এই আসনটিতে বিজেপি প্রার্থীর দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা অবাক করেছিল অনেককে।
১৯৯১ সালের সেই ইতিহাস সময়ের নিয়মে হয়তো অনেকটাই ফিকে। এরপর থেকে একের পর এক নির্বাচন হয়ে গেলেও টিকিট পাননি চিত্তবাবু। সাড়ে তিন দশক পরে আবার বিজেপির টিকিটে এই জঙ্গিপুরেই প্রার্থী চিত্ত মুখোপাধ্যায়। স্থানীয় অনেক বাসিন্দাই মনে করেন, বিজেপির দলীয় সংগঠন ১৯৯১ সালে মজবুত ছিল না ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে সুসম্পর্কের জোরে বিজেপিকে এই কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে সেই সময়ে তুলে আনতে পেরেছিলেন চিত্তবাবু। আর সেই জনসংযোগে ফের শান দিয়ে প্রচারে এবারও নেমে পড়েছেন তিনি। আবার দল তার ওপর ভরসা করার পরেই জোরদার প্রচারে নেমে পড়েছেন চিত্ত মুখোপাধ্যায়। এবারও তাকে পুরনো সেই জনসংযোগ এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন বিজেপি প্রার্থী। মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে তাদের অভাব অভিযোগের কথা শুনছেন, জিতে এলে এলাকার জন্য কী কী কাজ করতে চান তাও তুলে ধরছেন প্রচারে।
বিজেপির হাত ধরেই রাজনৈতিক জীবনের শুরু নয়। বরং একজন দাপটে কংগ্রেস করেছেন। সিপিএমের কর্মীদের অত্যাচারও তাকে সহ্য করতে হয়েছে। ‘এই জঙ্গিপুরে কংগ্রেসকে জেতাতে সিপিএমের কম আক্রমণের মুখে পড়তে হয়নি। মার খেতে হয়েছে। কিন্তু রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। দলকে টিকিয়ে রাখাই ছিল আসল লক্ষ্য’- বলছিলেন চিত্তবাবু। তারপরেই কিছুটা আফসোসের সুরে বললেন, ‘যে দলের জন্য মার খেলাম, যে দলের সংগঠনকে মজবুত করতে এত লড়াই করলাম। সেই দলের কিছু নেতা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আমাকে দল থেকে তাড়িয়ে দিল। জনসভাতে অপমান করে আমাকে বের করে দেওয়া হল।’ এতকিছুর পরেও ভেঙে পড়ার মানুষ ছিলেন না তিনি। রাজনীতি যার রক্তে তিনি কী করে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারবেন। বরং মনে জেদ চেপে গিয়েছিল।
চলে আসেন বিজেপিতে। গেরুয়া শিবিরে ভরসার লোক হয়ে ওঠেন। টিকিট পান জঙ্গিপুরে। আর সেবারই বিজেপি এই কেন্দ্রে উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম স্থানে উঠে আসাই তার লক্ষ্য। জঙ্গিপুরের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তার নিবিড় জনসংযোগকেই কাজে লাগাচ্ছেন। সংখ্যালঘু ভোট এই কেন্দ্রে একটা বড় ফ্যাক্টর। ৭৫ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন এই কেন্দ্রে, ২৫ শতাংশ হিন্দু, এই ২৫ শতাংশ তার ঝুলিতে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত বিজেপি প্রার্থী। আর বাকি সংখ্যালঘু ভোট, সেই ভোট তাহলে কী হবে, কোথায় যাবে? ‘দেখুন, সংখ্যালঘু ভোট আগে এখানে বিজেপি পায়নি ঠিকই। কিন্তু এবার আমি নিজে গিয়ে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কথা বলছি। অনেকেই তাদের সমস্যার কথা আমাকে বলেছেন। আমি তাদের আশ্বাসও দিয়েছি। তারা আমার পাশে থাকবেন আশা রাখছি’- বলছিলেন বিজেপি প্রার্থী চিত্তবাবু।
রামনবমীর দিনে জঙ্গিপুরেই একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। কিছু মানুষ হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরিকল্পিতভাবে এমন ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে দাবি বিজেপির প্রার্থীর। বললেন, ‘আমাদের কর্মীদের ওপর কীভাবে পুলিশ অত্যাচার করল। অনেককে তুলে নিয়ে গিয়েছে। এতে আমাদের সাময়িক কিছু অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু মানুষ এর জবাব দেবে।’ তৃণমূল বারবার দাবি করেছে, বিজেপি বাংলার সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করছে। জঙ্গিপুরের বিজেপি প্রার্থীর মন্তব্য, ‘এমন একটা প্রমাণ দেখাক তৃণমূল।’ জঙ্গিপুরে তৃণমূলের প্রার্থী জাকির হোসেন। গোটা মুর্শিদাবাদ জেলায় তৃণমূলের পরিচিত মুখ জাকির। তার বিরুদ্ধে তাই লড়াই কী কঠিন হবে? উত্তরে চিত্ত মুখোপাধ্যায়ের জবাব, ‘বাংলায় নতুন শিল্প নেই, চাকরি নেই। চারদিকে শুধু কাটমানি আর কমিশনের দাপট। তাই এবার এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী তৃতীয় স্থানে চলে যাবেন।’

Sumit Chakraborty: