ড. খেলন দাস হালদার
(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা)
সাহিত্যসাধনার এক নিরলস সাধক প্রাবন্ধিক মিঠুন রায়। নিষ্ঠার সঙ্গে নানারকম গ্রন্থ রচনা করে চলেছেন তিনি। ‘ভারতীয় রমণী: বীরাঙ্গনা থেকে বিদূষী’— একটি নারীকেন্দ্রিক মূল্যবান প্রবন্ধগ্রন্থ। যেখানে লেখক দেশ ও সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে নারীর অনবদ্য অবদানের কথা তথ্য ও সত্যের নিরিখে সহজ ভাষায় এবং সাবলীল ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন। ৪৩তম আগরতলা বইমেলায় এই নতুন গ্রন্থের আবরণ উন্মোচন হয়েছে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে নবপ্রজন্মের সাহিত্যসেবী তথা ব্যাঙ্গালোর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপিকা ড. ইন্দুলেখা গুহকে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সুপরিকল্পিতভাবে নারীর জন্য নির্দিষ্ট করেছিল অবনত সামাজিক অবস্থান। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষার অধিকার নিষিদ্ধ করে রুদ্ধ করে রেখেছিল নারীর ব্যক্তি বিকাশের সমস্ত সুযোগ, বাধ্য করেছিল তাদের অসহায়, পরাধীন জীবনযাপনে, যার ফলে নারীর প্রতি তৈরি হয় অবহেলা, অবজ্ঞা, করুণা বা ঘৃণার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এইরূপ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অত্যাচারিত, নির্যাতিত হয়ে চলে নারী। বিনষ্ট হতে থাকে সামাজিক ভারসাম্য। সুদীর্ঘকালের অভ্যাসে সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব আজকের দিনেও ক্রিয়াশীল, যে জন্য সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও যে নারীরা পরিবার, সমাজ বা দেশের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং বর্তমানকালে মানবিক অধিকারপ্রাপ্ত নারীরা পুরুষের পাশাপাশি প্রায় সর্বক্ষেত্রে দক্ষতা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, সেসব প্রকাশ বা প্রচারের আলোয় সেভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে না। উপরন্তু তাদের হীন ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা, কিংবা বিজ্ঞাপন ইত্যাদির মাধ্যমে ভোগ্যবস্তু রূপে উপস্থাপন করার প্রবণতা সমস্ত রকম প্রচারমাধ্যমে লক্ষণীয়। কিন্তু সমাজ-মানসের সুস্বাস্থ্যের বিধানের জন্য নারীর প্রতি মর্যাদাময় দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা একান্ত আবশ্যক। নারীর কৃতিত্বের স্বীকৃতি, সমাজে তার অবদানের কথা প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে নারীর প্রতি উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব। যারা মানুষ ও সমাজের তথা দেশের কল্যাণ ও উন্নয়ন বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেন এবং তাদের ভাবনার ফসল ফলাতে কলম ধরেন, নারীর কৃতিত্ব প্রকাশের আলোয় আনা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রাবন্ধিক মিঠুন রায় এই গ্রন্থরচনার মাধ্যমে সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার আন্তরিক প্রয়াস করেছেন।
এই গ্রন্থে লেখক তিনশত বৎসর পূর্বকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত দীর্ঘকালপর্বে চৌদ্দ জন নারীর জীবনকথা তুলে ধরেছেন, সংক্ষেপে হলেও নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে।
গ্রন্থের প্রথমেই রয়েছে তিনশত বৎসর পূর্বে আবির্ভূত মহীয়সী মানবী অহল্যাবাঈ হোলকারের (১৭২৫ খ্রিঃ-১৭৯৫ খ্রিঃ) কীর্তিময় জীবনকথা, যিনি ছিলেন নারীশক্তির মূর্ত প্রতীক। তিনি এক সাধারণ পরিবারের কন্যা হয়েও মালবের রাজগৃহে বধূরূপে নির্বাচিত হয়েছিলেন সেবাধর্ম ও মাধুর্যগুণে। রাজ্য রক্ষার্থে স্বামী-পুত্রের অবর্তমানে তিনি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন মালবের শাসনভার। দক্ষতার সঙ্গে প্রায় ত্রিশ বৎসর ধরে তিনি শাসনকার্য সম্পাদন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নির্ভীকতা ও জনহিতকর কার্যক্রম তাঁকে এক জনপ্রিয় শাসকে সম্মানিত করেছিল। কৃষক ও বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতা, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পকলা ইত্যাদির উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি ইন্দোরকে এক সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত করেছিলেন। দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে তিনি ধ্বংসের শতবর্ষ পর বিশ্বনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু মন্দির, ধর্মশালা নির্মাণ করেছিলেন। একটি ছোট্ট রাজ্যের শাসক হয়েও তিনি একটি সর্বোত্তম রাষ্ট্রপরিচালনার আদর্শ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি নারীসংক্রান্ত যাবতীয় দুর্বলতার মিথ ভেঙে দিয়ে নারীশক্তির এক প্রেরণাময় প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। আজকের দিনে তাঁর এই কৃতিত্বের ইতিহাস নারীর প্রতি মর্যাদাময় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে একান্ত উপযুক্ত দৃষ্টান্ত।
এই গ্রন্থে রয়েছে আরও কয়েকজন নারীর গৌরবগাথা, যেমন ঊনবিংশ শতকের কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কথা, যিনি জীবনাচরণে, পোশাক-পরিচ্ছদ ও চালচলনে, আদবকায়দায় সংস্কারমুক্ত, প্রগতিশীলতার পথ প্রদর্শন করেছেন। গ্রন্থে রয়েছে ত্রিপুরার এক মহীয়সী নারী রাণী প্রভাবতীর জীবনকথা, যিনি স্বীয় উদ্যোগে আগরতলা রাজপরিবারের অন্দরমহলে স্ত্রীশিক্ষা, রাজগৃহের অঙ্গনে সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন এবং মন্দির, ধর্মশালা ইত্যাদি নির্মাণ দ্বারা জনহিতকর কার্য সম্পাদন করেছিলেন। ঊনবিংশ শতকের খ্যাতনামা কবি কুসুম কুমারী দাশের জীবনকথা বিবৃত হয়েছে, যিনি দেশের কল্যাণভাবনায় ভাবিত হয়ে সেই ভাবনার নির্যাস সাহিত্যে পরিবেশন করেছেন; তিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে অন্বেষণ করেছেন দেশের জন্য আদর্শ ছেলে। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’
কবি কামিনী রায়, যার জীবনদর্শনের মূলে ছিল পরোপকার, যা ধ্বনিত হয়েছে তাঁর রচিত সাহিত্যে, কবিতার প্রবাদপ্রতিম চরণে।
যেমন— “আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে/ আসে নাই কেহ অবনী পরে,/ সকলের তরে সকলে আমরা,/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।” মানুষের তথা সমাজের মঙ্গলার্থে এমন পরার্থপরতার কথা রয়েছে এইসব লেখিকাদের অসামান্য রচনায়, যা পাঠ করলে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়।
রয়েছে ঊনবিংশ শতকের নারীজাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার কর্মকাণ্ডের কাহিনি, স্বাধীনতা সংগ্রামী চারুশীলা দেবী ও লীলা নাগের মতো বিপ্লবী নারীদের কৃতিত্বের কথা, রয়েছে প্রথম মহিলা প্রকৌশলী এ. ললিতা সহ প্রত্নবিজ্ঞানী দেবলা মিত্র প্রমুখ নারীদের অবদানের কথা, যাঁরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। যদিও মিঠুন রায় বরাবরই নারীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান নিয়ে লেখার চেষ্টা করেন। অতীতে তিনি ‘প্রাতঃস্মরণীয়া ভারতীয় নারী’, ‘ভারতীয় নারী যুগে যুগে’ সহ নারীদের জীবনগাথা সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করে পাঠকমহলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬৪।
লেখক গ্রন্থের সীমিত পরিসরে কতিপয় নারীর কৃতিত্ব তুলে ধরেছেন যত্নের সঙ্গে। প্রাচীনকালে এমন আরও বহু কৃতিত্বময়ী নারী রয়েছেন, যেমন— ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ, রাণী রাসমণি, মাতঙ্গিনী হাজরা প্রমুখ আরও অনেকে; এবং আধুনিক যুগে বিচিত্র কর্মক্ষেত্রে অসংখ্য নারী কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন প্রচারের অপেক্ষা না করে, যেমন— সেনাবাহিনীতে আর্মি অফিসার প্রিয়া ঝিঙ্গান, নৌবাহিনীতে ভাইস অ্যাডমিরাল পুনিতা আরোরা, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট গুঞ্জন সাক্সেনা, কার্গিল যুদ্ধে যিনি অসাধারণ বীরত্ব ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, গ্যালেন্টারি অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত কর্ণেল মিতালি মধুমিতা, অস্ত্রবিদ্যা প্রশিক্ষণে মহিলা কমান্ডো ট্রেইনার সীমা রাও; সাহিত্য, শিল্পকলাতেও বহু নারী তাঁদের দক্ষতা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন প্রচারের আশা না করেই। কারণ, প্রচারযন্ত্রটা এখনো নারীর কৃতিত্ব প্রচারে সহায়ক নয়। সেদিক থেকে প্রাবন্ধিক মিঠুন রায় দায়িত্বসহকারে নারীর কৃতিত্ব প্রকাশের যে মহৎ উদ্যোগ এই গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে নিয়েছেন এবং যত্নের সঙ্গে সহজবোধ্য ভাষাভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন, তাতে গ্রন্থটি পাঠকের নিকট সাদরে গৃহীত হবে এবং নারীর ভূমিকার প্রতি মর্যাদাসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। ভূমিকা লিখেছেন রাজ্যের অন্যতম কবি তথা খুমুলুঙ সরকারি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক মণীশ রুদ্রপাল। প্রচ্ছদশিল্পী উমা মজুমদার। গ্রন্থটির আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু ও সাবলীল রচনাশৈলী আগ্রহী পাঠকের নিকট অবশ্যই হবে তৃপ্তিদায়ক।
ভারতীয় রমণী বীরাঙ্গনা থেকে বিদূষী
মিঠুন রায়
প্রকাশক: দিগন্ত প্রকাশনী, ধর্মনগর, উত্তর ত্রিপুরা
মূল্য: ২৫০ টাকা