দুই ভারতে আমরা বাস করছি।এক ভারত হচ্ছে বিত্তশালীদের।যাদের প্রভূত অর্থ, প্রচুর সম্পত্তি, সবকিছুতেই রাজত্ব করছে তারা।তবে এরা সংখ্যায় নেহাতই কম।এরাই সবকিছুতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সবকিছুতেই তারা লগ্নি করে বেড়ান। এদের বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজার কোটি টাকা খরচা হয়। অর্থাৎ এরা একেক জন রাঘববোয়াল। এরাই সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন। দেশের অর্থনীতি থেকে রাজনীতি। উল্টোদিকে বিবর্ণ ভারতের চিত্রও রয়েছে। যেখানে গরিব, মেহনতি, দুঃস্থ মানুষ প্রতিদিন রোজগারের জন্য, দুমুঠো ভাতের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। এদের কেউ কেউ আদিবাসী, কেউ দলিত, কেউ প্রান্তিক চাষি, কেউবা খেটে খাওয়া মজদুর, কেউবা পরিযায়ী শ্রমিক। যাদের দেখেছে গোটা দেশ কীভাবে কোভিডকালে রেল লাইনে হাঁটার সময় প্রাণ চলে গেছিল তাদের। এরা ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক। কোভিডকালে তাদের ঘরে ফেরার জন্য কোনো যানবাহন ছিল না। অগত্যা রেললাইন ধরেই হাঁটা শুরু করেন তারা। পরে ট্রেনে কাটা পড়েন। এই ঘটনাও গোটা দেশ দেখেছে।
সম্প্রতি এই বিবর্ণ ভারতের এক চিত্র গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বলা যায় হাড়হিম করা এক ভিডিও দেখে দেশ স্তম্ভিত হয়ে গেছে। এই চিত্র দেখে গোটা দেশ বলছে এটাই কি বদলে যাওয়া ভারতের চিত্র? এটাই কি নিউ নর্মালের চিত্র। ওড়িশার কেওনঝাড় জেলাতে এক আদিবাসী ব্যক্তি তার মৃত বোনের কিছু জমানো টাকা ব্যাঙ্কে তুলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাঙ্ক তাকে কোনো মতেই সেই টাকা দিচ্ছিল না শুধুমাত্র প্রমাণের অভাবে। আদিবাসী অশিক্ষিত জীতু মুন্ডা ব্যাঙ্কের সিস্টেমের কিছুই বোঝেন না। ফলে তার পক্ষে তার মৃত বোনের জমানো ১৯২০০ টাকা তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। এই টাকাটা তার কাছে ছিল অমূল্য। সেজন্যই তিনি বারবার ছুটছিলেন ব্যাঙ্কের কাছে। কিন্তু না ব্যাঙ্ক, না কোনো ব্যক্তি, না কোনো সিস্টেম জীতু মুন্ডাকে সাহায্য করতে রাজি ছিলেন। ব্যাঙ্কের কাছে দরকার ছিল জীতু মুন্ডার মৃতা বোনের শুধুমাত্র একটি প্রমাণ। কিন্তু জীতু মুন্ডার কাছে তা ছিল না। অগত্যা তিনি মৃতা বোনের কবর থেকে তোলা দেহ (কঙ্কাল) নিয়ে প্রায় তিন কিমি হেঁটে পৌঁছান ব্যাঙ্কে। তার এই ভিডিও ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে একেবারে হৈচৈ পড়ে যায়।
আমরা বিশ্বগুরু।গোটা বিশ্ব আমাদের দিকে নাকি তাকিয়ে থাকে। আমরা নাকি চতুর্থ অর্থনীতির দেশ হয়ে গেছি, আমরা নাকি আত্মনির্ভর হচ্ছি, এই নিউ নর্মালে। অথচ বিবর্ণ এই ভারতের চিত্র কী তা বলে? এক ব্যক্তি মাত্র ২০ হাজার টাকার জন্য নিজের বোনের কবর থেকে তুলে আনা দেহ নিয়ে রাজপথ দিয়ে তিন কিমি পথ মাড়িয়ে ব্যাঙ্কে যাচ্ছে এই দৃশ্য আজকের জেট যুগে, ডিজিটাল যুগে আমাদের দেখতে হচ্ছে, এর থেকে লজ্জার কি আর কিছু আছে? মুখ লুকোবার জায়গা কি আমাদের থাকবে এরপর?
সিস্টেম কতখানি দায়ী এর পেছনে এ নিয়ে তর্কবিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওড়িশার প্রত্যন্ত গ্রামের এক আদিবাসী কতখানি দারিদ্র্যতার সাথে লড়াই করলে এ ধরনের সত্যের মুখোমুখি হতে পারে তার এর জ্বলন্ত উদাহরণ রাখলেন জীতু মুন্ডা গোটা দেশের কাছে। বিবর্ণ ভারত যেখানে মাত্র ২০ হাজার টাকা পাবার আশায় এক আদিবাসী ব্যক্তি বোনের কঙ্কাল নিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা আবদার করে। এরপর পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ লজ্জায় পড়ে তার টাকা তাকে ফিরিয়ে দেয়। এক ভারতের চিত্র হচ্ছে ব্যাঙ্কের হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে শিল্পপতিরা, এক ভারতের চিত্র হচ্ছে শিল্পপতিদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ মাপ হয়ে যায়, আর উল্টোদিকে অপর বিবর্ণ ভারতের চিত্র হচ্ছে জীতু মুন্ডাকে ২০ হাজার টাকার জন্য বোনের মৃতদেহ কবর থেকে তুলে নিয়ে ব্যাঙ্কে ছুটতে হয়। হায়রে ভারত! এই দিনও কি দেখার ছিল?