ভারতের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি- শুধু একটি ৬ নির্বাচনি ফল নয়,এক ঐতিহাসিক প্রবাহের থমকে যাওয়া। প্রায় পাঁচ দশক ধরে যে বামপন্থী রাজনীতি দেশটির গণতান্ত্রিক পরিসরে এক স্বতন্ত্র বয়ান তৈরি করেছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি আজ কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এল। কেরালায় পিনারাই বিজয়ন-এর নেতৃত্বাধীন বাম সরকারের পতন সেই প্রতীকী মুহূর্ত, যেখানে ইতিহাস যেন নিজেই একটি রেখা টেনে দিল- ‘এখানেই আপাতত শেষ’।
১৯৫৭ সালে সিপিএমের নেতৃত্বে কেরালায় বিশ্বের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারের উত্থান ভারতের রাজনৈতিক চেতনায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। ১৯৭৭ থেকে ২০১১- পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসন, প্রায় একইসময়ে প্রথমে ১৯৭৮-১৯৮৮ এবং পরে ১৯৯৩ থেকে ২০১৮- ত্রিপুরায় বামদের প্রভাব, আর কেরালায় পালাবদলের মধ্যেও টিকে থাকা এক সুসংগঠিত উপস্থিতি- সব মিলিয়ে বাম রাজনীতি একসময় ছিল ভারতের ফেডারাল কাঠামোর এক অপরিহার্য স্তম্ভ।
কিন্তু ইতিহাসের এই দীর্ঘ যাত্রাপথেই জমা হয়েছে ক্লান্তি, স্থবিরতা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার ব্যর্থতা। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে পতন, ত্রিপুরায় ২০১৮-র পরাজয়- এই ধারাবাহিক ধাক্কার পর কেরালাই ছিল শেষ আশ্রয়। সেই দুর্গও ভেঙে পড়ায় এখন প্রশ্নটা আর ‘কোথায় হারল’ নয়, বরং ‘কেন হারল’।
প্রথমত, বাম রাজনীতির মূল শক্তি ছিল সংগঠন ও মতাদর্শের দৃঢ়তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংগঠন অনেক ক্ষেত্রেই যান্ত্রিক ও অনমনীয় হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থতা, শ্রমজীবী রাজনীতির পরিবর্তিত চরিত্র বোঝার অক্ষমতা এবং মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল না মেলানো- এই সবই তাদের সামাজিক ভিত্তিকে সংকুচিত করেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বয়ানের পরিবর্তন। যে সময়ে শ্রেণি-রাজনীতি ছিল কেন্দ্রীয় ইস্যু, সেই জায়গা এখন অনেকাংশে দখল করেছে পরিচয়ভিত্তিক এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বাম দলগুলো এক অদ্ভুত দ্বিধায় পড়েছে- তারা কি পুরনো মতাদর্শ আঁকড়ে থাকবে, না কি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে আপস করবে? এই দ্বন্দ্বই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
তৃতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশলগত সাফল্য। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের -নেতৃত্বাধীন জোট কেরালায় নিজেদের পুনর্গঠন করতে পেরেছে, অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্রমশ নতুন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ করে বিজেপির ভোট বৃদ্ধির একটি অংশ যে বামদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক থেকে এসেছে- তা শুধু নির্বাচনি পরিসংখ্যান নয়, এক গভীর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তার উপর যুক্ত হয়েছে সংগঠনের জড়তা। একসময় যে কাঠামো শক্তির উৎস ছিল, সেটাই আজ অনেক ক্ষেত্রে বোঝা। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব, নতুন নেতৃত্বের অভাব, এবং প্রজন্মান্তরের ব্যবধান- সব মিলিয়ে সংগঠন হয়ে উঠেছে আত্মমগ্ন। তরুণদের আকর্ষণ করার বদলে তারা যেন নিজস্ব বৃত্তের মধ্যেই আবদ্ধ থাকতে স্বচ্ছন্দ। বাম রাজনীতির অবক্ষয়ের আরেকটি বড় কারণ- দলের ভিতরে ‘বৃদ্ধতন্ত্র’-এর অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী দখল। যে রাজনৈতিক ধারার জন্মই হয়েছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে, সেই ধারারই সংগঠন আজ বহু ক্ষেত্রে পরিবর্তনকে ভয় পায়। নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার বদলে নেতৃত্বের স্তরে একই মুখের পুনরাবৃত্তি, একই চিন্তার পুনরুচ্চারণ- এ যেন স্থবিরতার এক স্বনির্মিত চক্র।
সমস্যাটা শুধু বয়স নয়, মানসিকতার। তরুণদের জায়গা না দিয়ে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে তাদের অংশীদার না করে বাম দলগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎকেই সংকুচিত করেছে। ছাত্র-যুব সংগঠনে এখনও কিছুটা প্রাণ থাকলেও, মূল দলে সেই শক্তির প্রতিফলন খুব কম। ফলে তরুণ কর্মীরা অনেক সময় নিজেদের ‘ক্যাডার’ হিসেবেই দেখে- নেতৃত্বের সম্ভাবনা হিসেবে নয়। এই বিচ্ছিন্নতাই ধীরে ধীরে আগ্রহ কমায়, সংগঠনের ভিত ফাঁপা করে।
অন্যদিকে রাজনীতির ভাষা দ্রুত বদলাচ্ছে- ডিজিটাল মাধ্যম, নতুন সামাজিক ইস্যু, পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা- এই সবকিছুর সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু যখন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকেন দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত নেতৃত্ব, তখন সেই পরিবর্তন আসে ধীর গতিতে, অনেক সময় আসে না-ই। ফলত, যে তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করা জরুরি, তাদের কাছেই বাম রাজনীতি ক্রমশ ‘পুরনো’ এবং ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে মনে হয়।
সব মিলিয়ে, নেতৃত্বের এই প্রজন্মগত অচলাবস্থা বাম রাজনীতিকে শুধু সংগঠনগতভাবে নয়, ভাবনাগত দিক থেকেও পিছিয়ে দিয়েছে। পরিবর্তনের রাজনীতি করতে গিয়ে নিজেরাই যদি পরিবর্তনকে আটকে দেয়, তাহলে পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে বাম রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-পুনরুজ্জীবন কি সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তবে কোন্ পথে? শুধুমাত্র অতীতের গৌরবগাথা স্মরণ করে নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক চাহিদাকে সামনে রেখে নিজেদের পুনর্গঠন করতে হবে। অন্যথায় তারা ক্রমশ প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হবে।
তবে এই পতনের মধ্যেও একটি বড় উদ্বেগ রয়ে যায়। ভারতের গণতন্ত্রে বামপন্থী রাজনীতি শুধু একটি দল বা জোট নয়; এটি ছিল একটি আদর্শিক ভারসাম্য, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রমিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সামনে এনেছে। সেই কণ্ঠস্বর যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্রের আলোচনার পরিসরও সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, বাম রাজনীতি একসময় ছিল ‘বিকল্প’- একটি নৈতিক অবস্থান, একটি ভিন্ন পথের প্রতিশ্রুতি। আজ সেই বিকল্প কোথায়? যখন সাধারণ মানুষ বিকল্প খোঁজে, তখন তারা বামেদের দিকে তাকায় না-এটাই সবচেয়ে বড় সংকেত। কারণ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা মানে শুধু আসনসংখ্যা নয়; মানে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া। কেরালার ফলাফল তাই কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তন নয়- এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনের অস্তিত্বসংকটের প্রতীক। ইতিহাসের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে বাম রাজনীতির সামনে এখন একটাই পথ- পুনরাবিষ্কার, না হলে বিস্মৃতি।