অরণ্য উচ্ছেদ, মানুষ উচ্ছেদ: কার স্বার্থে এই উন্নয়ন?

ইতিহাসের এক আশ্চর্য ও নির্মম পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে দূর সমুদ্রের বুকে, ভারতের এক প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপে। ১৯৪৯ সালে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই, ভারত রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছিল আন্দামান ও নিকোবরের নিবিড় অরণ্য এবং আদিম জনজাতির শান্ত বাসভূমির উপর। ‘দেশগঠন’ ও ‘সভ্যতা বিস্তারের’ এক সুপরিকল্পিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে তদানীন্তন সরকার যে ‘উপনিবেশীকরণ’-এর নীলনকশা প্রস্তুত করেছিল, আজ আট দশক পার হয়ে তা এক সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। সে যুগে পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা মূল ভূখণ্ডের প্রাক্তন সৈনিকদের পুনর্বাসনের অছিলায় যে অরণ্য নিধন যজ্ঞের সূচনা হয়েছিল, আজ তা নব্বই হাজার কোটি টাকার এক মেগা প্রজেক্ট তথা মহাসর্বনাশের পূর্বাভাসে রূপান্তরিত। তথাকথিত পরিকাঠামো উন্নয়নের যে রথ আজ এই দ্বীপের বুকে ছুটবার অপেক্ষায়, তা কেবল পরিবেশেরই অপূরণীয় ক্ষতি করবে না, বরং এই অরণ্যভূমিকে এক এমন অতলান্তে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন অসম্ভব।

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে তৎকালীন এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, গ্রেট নিকোবরে ‘সভ্য অস্তিত্ব’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেন এক প্রাচীন জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র ও সহস্রাব্দের মানব ইতিহাস ধন্য হয়ে যাবে রাষ্ট্রের এই রাজকীয় পদধূলিতে! এই ‘সভ্য’ করার অহমিকায় ১৭০০ হেক্টরেরও বেশি চিরহরিৎ অরণ্য নির্মম ভাবে কর্তন করে ফেলা হয়। চাষের জমি আর বসতি বানানোর এই হিড়িকে ভিটেমাটি হারাতে বসে দ্বীপে পরম শান্তিতে বসবাসকারী ‘শম্পেন’ জনজাতি। মাত্র তেইশ জনের এই আদিম গোষ্ঠী রাতারাতি নিজভূমে পরবাসী ও সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় মৈত্রী এই দ্বীপকে টিকিয়ে রেখেছিল, রাষ্ট্রের আগ্রাসী থাবায় তা ছিন্নভিন্ন হতে শুরু করে। সে সময়েও তীব্র প্রতিকূলতা, মহামারি এবং ফসলের ক্ষতির মুখে পড়ে বহু পুনর্বাসিত পরিবার এই দ্বীপ ছেড়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছিল। প্রকৃতি তখনই তার নিজস্ব ভাষায় সতর্কবার্তা দিয়েছিল, রাষ্ট্র তখন থমকেও গিয়েছিল। কিন্তু আজ সেই ইতিহাসই ফিরে এসেছে এক বহুগুণ বর্ধিত রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়ে।

আজকের এই মেগাপ্রজেক্টে জমি ও সমুদ্রের যে আমূল পুনর্নির্মাণ চলছে, তা পূর্বের সমস্ত আগ্রাসনকে ম্লান করে দেয়। আশ্চর্যের বিষয়, এই বিধ্বংসী উন্নয়ন যজ্ঞে আদিবাসীদের অধিকার যেমন পদদলিত, তেমনই পূর্বতন পুনর্বাসিত অধিবাসীদের জমিও আজ সস্তা দরে গ্রাস করা হচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে যেখানে শাস্ত্রী নগর বা গান্ধী নগরের কৃষকদের জমির দাম ধার্য হয়েছে বর্গমিটার প্রতি মাত্র ১১৩ বা ১৩১ টাকা, সেখানে পর্যটনের রঙিন স্বপ্ন মাখানো ভাইপার আইল্যান্ড বা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দ্বীপের জমির দর হাঁকা হচ্ছে কুড়ি হাজার টাকারও বেশি! সংখ্যার এই নগ্ন বৈষম্য স্পষ্ট করে দেয় যে, রাষ্ট্রের চোখে সব জমি এবং সব মানুষের জীবনের মূল্য সমান নয়। ক্ষমতার এই চরম অন্যায্য ও অযৌক্তিক আচরণে আজ সেই কৃষকেরাও মর্মাহত, যাদের একদা ‘সভ্যতার দূত’ করে পাঠানো হয়েছিল।

গ্রেট নিকোবর কোনো শূন্য স্লেট বা ফাঁকা মরুভূমি নয় যে, রাষ্ট্র যখন খুশি সেখানে নিজের অহংকারের আঁচড় কাটবে। এটি এক জীবন্ত, সংবেদনশীল এবং অতিশয় ভঙ্গুর প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

বিজ্ঞানের সতর্কবার্তা ও ইতিহাসের শিক্ষা অবহেলা করে এই বিপুল ধ্বংসলীলাকে ‘উন্নয়ন’ বলে চালিয়ে দেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় প্রবণতা, তা এক মস্ত বড় জালিয়াতি। বন ধ্বংস হবে, উপজাতিদের অস্তিত্ব লুপ্ত হবে, আর তার উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠবে বহুজাতিক পুঁজির স্বর্গোদ্যান- এই নীতিহীন আস্ফালন কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না। অরণ্যের এই ক্রন্দন এবং মানুষের এই উচ্ছেদ যদি আজও নীতি নির্ধারকদের বিবেকে দংশন না করে, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। এই সর্বনাশা অন্ধকার থেকে দেশ রক্ষা পাক, প্রকৃতি তার আপন মহিমায় বেঁচে থাকুক।

নাগরিকের কৃষ্ণসাধন আর অরণ্যের বলিদান কখনোই কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নীতিগত দূরদর্শিতার বিকল্প হতে পারে না। প্রশ্ন এখানেই, নব্বই হাজার কোটি টাকার এই বিধ্বংসী উল্লাস যদি সত্যই ‘উন্নয়ন’ হয়, তবে সহস্রাব্দের প্রাচীন জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের অস্তিত্বকে কেন আজ খাদের কিনারায় দাঁড়াতে হবে? পুঁজির এই করাল গ্রাসে কার স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে? শাসনযন্ত্রকে আজ এই নৈতিক কাঠামোর মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে- এই মহাসর্বনাশ কি তবে এক সুপরিকল্পিত ঐতিহাসিক অপরাধ নয়?

Dainik Digital: