ফিচার : সব্যসাচী মজুমদার

ঈশ্বরের মুগ্ধ বালক বিনয় মজুমদার

এ.আই. মৃত। এখন সিন্থেটিক এ.আই.-এর যুগ। এরকম একটা ঘোষণা কিন্তু সদর্পে ঘুরছে চতুর্দিকে। খুব সহজ ভাবে যদি বুঝতে হয় তবে, বলা যায় এ. আই. হল এমন একটি অস্তিত্ব যে মানুষের অতীতকে নকল করে। এই যেমন ছবি তৈরি করা, সুর, দুটো একটা গল্প , কবিতাও। কিন্তু, সিন্থেটিক এ. আই. বস্তুত সমান্তরাল বাস্তবতা তৈরি করে দেবে। কবিতা লিখবে। উপন্যাস। ছবিও আঁকবে। মোট কথা মানুষের শিল্পের একটি বিকল্প শিল্পধারা তৈরি হয়ে যাবে। কেন এ প্রসঙ্গে কথা বলছি ? তার কারণ এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সময়ে এসে সাইবর্গ হতে যাওয়া পরিস্থিতির মানুষেরা ক্রমশই কবিতা বিমুখ হবে এ স্বাভাবিক। আপাতত আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতেও আন্তর্জাতিক চিন্তার পরিসর, সাইবর্গ ম্যানিফেস্টো, এন্টিনেটালিজমের চিন্তা সক্রিয় উঠেছে। ফলত একটি ক্রান্তিকালে আমরা উপস্থিত— নিঃসন্দেহে। এই সময়ে যাঁদের ভাবনা আমাদের জীবনের কাছে, মানুষের অভিপ্রেত জীবনের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে, তাঁদের মধ্যে বিভূতিভূষণ পরবর্তী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বিনয় মজুমদার বলেই বিশ্বাস হয়।

রবীন্দ্রনাথ – বিভূতিভূষণ – জীবনানন্দ দাশ – বিনয় মজুমদার তাঁদের রচনায় নির্বিকল্প মানবিকতা কিংবা ওপেন ফেস অফ হেভেন’কে ধরে রেখেছেন — বোধহয় আমাদের জন্য, আমাদের টিঁকে থাকার রসদ হিসেবে।

বিনয় মজুমদার নক্ষত্রের ধারণা থেকে নারকোল গাছ, অসীম মণ্ডল থেকে ঈশ্বরীকে ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায়। আগম-নিগমের সংকোচন, প্রসারণ তাঁর অনায়াসগতি — আমরা জানি। আমরা এও জানি যে, বিনয় মজুমদার এই যাতায়াতটি সম্পন্ন করেছেন গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের বিবিধ প্রত্যক্ষ জ্ঞানকে ব্যবহার করে। এই সূত্র ধরে অর্থাৎ বিনয় মজুমদারের বিজ্ঞান চেতনার সূত্রে যদি আমরা তাঁর কবিতার আলোচনায় প্রবেশ করতে চাই, তবে, আমাদের কয়েকটি কথা মনে করে নিতে হবে।

প্রথমত, বিশুদ্ধ গণিত কোন‌ও সিদ্ধান্ত দেয় না। কবিতাও। এরা সম্ভাবনার কথা বলে। দ্বিতীয়ত, গণিত মানুষ বা অন্য প্রাণীর ভেদ রাখে না। বিশুদ্ধ কবিতাও একাত্ম হতে চায় তার পরিবেশের সঙ্গে। যে পরিবেশে নেবুলা-নাটোর-নেউল সকলে থাকে,সকলে সমান জরুরি। তৃতীয়ত, গণিত একটি বিষয় বা ঘটনার বহু স্তরকে স্বীকার করে, ভিন্ন মতের সম্ভাবনা নির্মাণ করে এক‌ই সঙ্গে। কবিতাও। চতুর্থত গণিত নির্দিষ্ট দর্শন বা মতের বাহক নয়, কবিতাও। পঞ্চমত, খাওয়া পরার হিসেব কিংবা বাজারের দৈনন্দিন হিসেব আসলে গণিত নয় যেমন কেবল শ্লোগান‌ও কবিতা নয়।

এই কথাগুলি মনে রেখে বিনয় মজুমদারের কবিতার প্রসঙ্গে প্রবেশ করার আগে আমরা মনে করে নিই বিনয় মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ গুলিকে।নক্ষত্রের আলোয় (১৯৫৮),গায়ত্রীকে (১৯৬১),ফিরে এসো চাকা (১৯৬২),ঈশ্বরীর (১৯৬৪),অধিকন্তু (১৯৭২),অঘ্রাণের অনুভূতিমালা (১৯৭৪),বাল্মীকির কবিতা (১৯৭৬),শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮২),আমাদের বাগানে (১৯৮৫),আমি এই সভায় (১৯৮৫),এক পঙক্তির কবিতা (১৯৮৮),কাব্যসমগ্র (১ম) (১৯৯৩),আমাদের মনে রেখো (১৯৯৫),আমিই গণিতের শূন্য (১৯৯৬),স্বনির্বাচিত ১৬ (১৯৯৭),এখন দ্বিতীয় শৈশবে (১৯৯৯)
কবিতা বুঝিনি আমি (২০০১),কাব্যসমগ্র (২য়) (২০০২),হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ (২০০৩), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত গ্রন্থ-২০০৫),সমান সমগ্র সীমাহীন (২০০৪),শিমুলপুরে লেখা কবিতা (২০০৫),পৃথিবীর মানচিত্র (২০০৬),বিনোদিনী কুঠী (২০০৬),একা একা কথা বলি (২০০৬)
নির্বাচিত কবিতা (২০০৬),ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য (২০০৬),আকাশে চাঁদ নেই অথচ আজিকে পূর্ণিমা যুগ্ম প্রেমের কবিতা গ্রন্থ,দুপুরে রচিত কবিতা (২০০৬),নির্মাণের খসড়া (২০১৭)

“সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,
এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
সঞ্চারিত হ’তে চাই, চিরকাল হ’তে অভিলাষী,
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে |
তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু,
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!”

বিনয় মজুমদার কবিতায় যেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ধরার চেষ্টা করেছেন মানুষের দৈনন্দিন যাপন বৃত্তান্তের অধিকন্তু ও দর্শনকে। তেমন‌ই সিদ্ধান্ত উত্তীর্ণ করে স্পর্শ করেছেন পরিশুদ্ধির নির্জনতম আলোটিকে,

“এরূপ বিরহ ভালো ; কবিতার প্রথম পাঠের
পরবর্তীকাল যদি নিদ্রিতের মতো থাকা যায়,
স্বপ্নাচ্ছন্ন, কাল্পনিক ; দীর্ঘকাল পরে পুনরায়
পাঠের সময় যদি শাশ্বত ফুলের মতো স্মিত,
রূপ, ঘ্রাণ, ঝ’রে পড়ে তাহলে সার্থক সব ব্যথা,
সকল বিরহ, স্বপ্ন ; মদিরার বুদ্বুদের মতো
মৃদু শব্দে সমাচ্ছন্ন, কবিতা, তোমার অপ্রণয়।”( এরূপ বিরহ ভাল)

বিনয় মজুমদারের কবিতায় অংকের বিবিধ শব্দ, শব্দের বিন্যাস আমরা লক্ষ করি। এবং এও জানি যে বিনয় মজুমদারের গণিত চেতনাকে আংকিক শব্দের ব্যবহারের সূত্রে নির্ণয় করতে গেলে বস্তুত ভ্রমের সম্ভাবনা। অনুমান করা যায় যে, গণিতের বুনিয়াদি শব্দের ব্যবহার আসলে বিনয় মজুমদারের ভাষা নির্মাণের একটি পদ্ধতি মাত্র। তাঁর গণিত চেতনা নিহিত রয়েছে বাংলা কবিতার অন্যান্য মহাজনের কবিতার মতোই, ‘ অসীম কালের যে হিল্লোলে/ জোয়ার ভাঁটায় ভুবন দোলে/ নাড়িতে মোর রক্ত ধারায় লেগেছে তার টান’- এর বিস্তারে ও ব্যপকতায়।

“চাঁদ নেই, জ্যোৎস্নার অমলিন জ্বালা নেই, তবু কী এক বিপন্ন আলো লেগে আছে এ-মাঠের আঁধারের মুখে। মনে হয় অকস্মাৎ ডুবে যেতে পারে মাঠ সমুদ্রের জ্বলে। হৃদয় বিস্মিত এক বিমর্ষ অসুখে। চাঁদ নেই দেখি দূরে নক্ষত্রেরা জ্বলে। যে নক্ষত্র নীল হয়ে আছে, দেখি তাকে। কখনো সে পৃথিবীতে আসবে না, জানি, তবু আসতে কি পারেনা সে মাঠের নিকটে? মাঝে মাঝে নক্ষত্র তো চাঁদ হয়ে পৃথিবীর কাছে এসে থাকে।”(নক্ষত্রের আলোয়)

এখানেই, অর্থাৎ, সুন্দরের অভ্যর্থনা ঘটে যেখানে, যেখানে চোখের জল ছাড়া আর কোনও সমর্পণ থাকে না, সেখানেই গণিত অথবা বিশুদ্ধ কবিতা জন্ম নেয় বলে অনুভূত হয়। সে বিস্মিত, কৌতুহলী, অনন্ত সম্ভাবনার কাছে শান্ত হয়ে থাকে। বিনয় মজুমদারের কবিতায় আমরা দেখি প্রতিটি বস্তুকে, বস্তুর দর্শন এবং প্রত্যক্ষের দ্বন্দ্বকে। প্রতিটি সম্ভাবনার মধ্যে প্রবেশ করে, উপবিষ্ট হয়ে বিনয় তার নির্যাসের সামর্থ্য ও ঐশ্বর্যকে যেমন সন্ধান করেন, তেমন‌ই দৃশ্যকে
তার মৌলিকতম পর্যায় পর্যন্ত যেন ছুঁয়ে দেখতে চান বিনয় মজুমদার,

“সেই কোন ভোরবেলা ইটের মতোন চূর্ণ হ’য়ে প’ড়ে আছি নানা স্থানে; কদাচিৎ যথেষ্ট ক্ষমতা, তুমি এসে ছিন্ন-ছিন্ন চিঠির মতোন তুলে নিয়ে কৌতূহলে এক ক’রে একবার প’ড়ে চ’লে যাও, যেন কোনো নিরুদ্দেশে, ইটের মতোন ফেলে রেখে।”

বস্তুত এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প গুলির কথা। কেন মনে পড়ছে ? এই কারণেই যে, আমরা যদি ‘আমার চাষী ভাইদের প্রতি ‘ প্রভৃতি গল্পের কথা মনে করি তবে, দেখতে পাব , যে ভাবে ছোট গল্পে অর্থনীতির প্রসঙ্গে, জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ অর্থনীতি সম্পর্কে কথা বলেছেন বিনয় মজুমদার, সেই অর্থে কিন্তু কবিতায় খাওয়া -পরার প্রসঙ্গে সোচ্চার নন বিনয়। ছোটগল্পে যেভাবে কলকাতায় মানুষের মাংস খেতে দেখেছেন , কবিতায় সম্ভবত অতটা প্রত্যক্ষভাবে নয়। বস্তুত সামাজিক মানুষ হিসেবে দায় পালন করেছেন বিনয় তাঁর ছোটগল্প গুলিতে। আর ঈশ্বরের মুগ্ধ বালক কিংবা নক্ষত্রের ধুলো হিসেবে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন বাংলা কবিতার অনিবার্য বিস্ময় বিনয় মজুমদার।

এই প্রসঙ্গে এই কথাটিও বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় যে, বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প চর্চার প্রয়োজন। তুলনামূলক এবং বিশদ বিনয় মজুদারকে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন বলেই মনে হয়। পূর্বাপরহীন একটি নতুন গদ্য ভাষায়, শ্লেষে, সারল্যে, প্রসন্নতায় কথা বলেছেন বিনয়। কথা বলেছেন যৌথ খামারের প্রসঙ্গে, কথা বলেছেন আমাদের জীবনের গভীরতম অন্ধকারগুলির প্রসঙ্গে। অথবা বাস্তবিক চাওয়া – পাওয়া গুলি সম্পর্কে মাথা ঘামিয়েছেন। যেমন এই গল্প গুলির একটি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হল লোকজনকে কবিতা লেখা বা ব‌ই ছাপানোর জন্য উৎসাহ দেওয়া,

‘তাহলে আপনি কবিতা লিখুন, গদ্য পদ্য যা পারেন। গোটা পঞ্চাশ কবিতা লিখে নিজের দুহাজার টাকা মূলধন দিয়ে ছাপুন। আপনার নিজের টাকায় ছাপা, যা খুশি লিখে ছাপবেন কারও কিছু বলার নেই, আপনার নিজের টাকায় ছাপা।’ ( লেখা লিখন রচনা)

অথচ কবিতায় লিখছেন,

“বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশের, অনন্তের সার পেতে পারি।
এই অজ্ঞানতা এই কবিতায়, রক্তে মিশে আছে মৃদু লবণের মতো, প্রশান্তির আহ্বানের মতো।” ( কবিতা বুঝিনি আমি )
আবার এক‌ইসঙ্গে ‘কবিতা লেখা’ প্রবন্ধে স্পষ্ট করে বলছেন,
” তবে একটা কবিতা রচনার পর দশ পনেরো বছর যেতে না দিলে তার আবেদনের গ্রাহ্যত্ব সম্পর্কে সংশয় থাকবেই।”

চিন্তার এই বিবিধ স্তরের বিন্যাসকে বোঝার জন্যেই সম্ভবত বিনয় মজুমদারের গদ্য চর্চা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বিনয় মজুমদার গণিতজ্ঞ। শিক্ষার দিক থেকে, এমনকি তাঁর মুক্ত পেশার দিক থেকেও। তাঁর বিভিন্ন স্তরের রচনা মানুষের অংক শেখার মাধ্যম। কিন্তু, মনে হয়, যেটা তাঁর সচেতন বুদ্ধির কাজ অর্থাৎ পাঠ্য অংকের বিশ্লেষণ, ফলাফল নির্মাণের সঙ্গে কবিতাকে এক করে দেখেননি কখনও। কাব্য ভাষা নির্মাণের উপাদান করেছেন, চিন্তার খোপ নির্মাণের জন্য নয়।

কখন‌ই বিনয় মজুমদারের কবিতা চিন্তার নির্দিষ্ট ধরন তৈরি করতে চায়নি। বরং তাঁর কবিতায় বড় হয়ে উঠেছে দায়হীনতা এবং জায়মানতার বহুমুখী ছবিকে দেখার প্রক্রিয়া,

“তোমার মুখাবয়বখানি করি তো সন্ধানই।
তখন কেবলি আমি দেখি প্রশ্নবোধক চিহ্নেরা আমার দৃষ্টির পথে করে ঘোরাফেরা।
তোমার মুখের বদলে এসব প্রশ্নবোধক চিহ্নের দেখা পাই, এরা এসে তোমাকে আড়াল করে রাখে। এইভাবে যাবে কত কাল?” ( তোমাকে দেখতে )

বস্তুত এই ‘প্রশ্নবোধক চিহ্নেরা’ই বিনয় মজুমদারের গণিত অথবা সম্ভাবনা ।

বিনয় মজুমদার পুনঃপঠিত হবেন, পুনরাবিস্কৃত হবেন। এই পৃথিবীর মানুষের শুদ্ধতম চিন্তার বাহক হিসেবে বিনয় সাব্যস্ত হবেন। বিশুদ্ধ কবিতার প্রেক্ষিতে কিংবা বহুস্তরিক পিচ্ছিলতায় প্ররোচিত করবেন পরবর্তী সময়কে। কিন্তু, আপাতত এই পাঠে যেটুকু বলা যেতে পারে, গণিতের পরিচিত শব্দ ব্যবহার বিনয় মজুমদারের কবিতার বহিরাবরণ কিংবা অঙ্গরাগ। বস্তুত সম্ভাবনার বহু মাত্রার কথা, সম্পর্কের বহু মাত্রার ব্যপ্তি আর ক্রম প্রসারিত হয়ে চলা পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে চলা ভাষায় লুকিয়ে রেখেছেন গণিতকে, জীবনকে, স্পন্দকে, স্পন্দমানতাকে। বিনয় মজুমদারের কবিতা স্পর্শ করে রয়েছে আমাদের সমগ্র ইতিবৃত্ত ও সম্ভাবনা।

Sumit Chakraborty: