ফিচার : রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ সংহিতা

ড.সেবিকা ধর

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-সংহিতা শুধুমাত্র উপাসনা ছিল না। ব্যক্তি জীবনে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির যে ব্রাহ্ম পরিমণ্ডল, তা তাঁকে খানিকটা আচ্ছন্ন করলেও, উপনিষদের উপদেশময়তা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন একই সঙ্গে দেশাত্মবোধক চিন্তার রূপকার ও আন্তর্জাতিক। তিনি বাংলা আখ্যানের আদিপিতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেখান পথে গেলেন না। নিজের নির্মিত উপন্যাস— ঘরে বাইরে, চার অধ্যায়—এ তিনি হয়তবা উচ্চারণ করলেন কোনো এক বিপ্রতীপ ভুবনের কথা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ আখ্যান আনন্দমঠ-এর প্রেক্ষিতে। সেখানে, সেই নির্মাণে যেটুকু দ্বন্দ্ব, তা শিল্প, মনন ও দার্শনিক জিজ্ঞাসার দ্বন্দ্ব।
রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকো-বাড়িতে আদি ব্রাহ্ম সমাজের যে ভাবতরঙ্গ ছিল, পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজের যে ভাগ— আদি, নববিধান, সাধারণ ইত্যাদি, সেখানে ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের ভূমিকা। কেশবচন্দ্র সেনকে সামনে রেখে শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তি আন্দোলন, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনকে দিয়ে শ্রীচৈতন্য জন্ম-উৎসব করান, তাঁকে সমবেত কীর্তনে অংশগ্রহণ করান, এভাবেই শ্রীরামকৃষ্ণ ভেঙে দিলেন ব্রাহ্ম সমাজ, সম্পূর্ণ অহিংস পথে ভক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-সংহিতা, স্বদেশ ভাবনা, স্বাদেশিকতা বুঝতে গেলে, ব্রাহ্ম সমাজের যে ভাগ-বাঁটোয়ারা, দক্ষিণেশ্বরকেন্দ্রিক ভক্তি আন্দোলন, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীমা সারদা, স্বামী বিবেকানন্দ কথিত সিংহিনী— নিবেদিতা— সবাইকে বুঝতে হবে। সেই সঙ্গে স্বদেশী আন্দোলন, সশস্ত্র ও অস্ত্রহীন পথে— অহিংসা সম্বল করে, জানতে হবে সবটা। কিন্তু সেই জানা ও জানানোর পরিসর অনুপস্থিত এখানে। ফলে আমরা রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-সংহিতায় ফিরে আসি।
রবীন্দ্রনাথ, তাঁর বাল্যে, উত্তর-বাল্য অবস্থায় যে স্বদেশের স্বপ্নাঞ্জলি দেখেছেন, তা তো হিন্দুমেলা নামের এক প্রয়াস, হাম-চু-মু-হাফ ইত্যাদি, যার বিবরণ তাঁর নিবন্ধে আছে, সেই সঙ্গে স্বদেশী দেশলাই ও কাপড়ের পরিবর্তে গামছার নির্মাণ, সবই রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ভাবনাকে প্রকাশিত করে।
ঘরে বাইরে নামের আখ্যানে সন্দীপের তথাকথিত বিলাতি বর্জন, গ্রামের মানুষদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা, স্বদেশী ও বিলাতি বর্জনের নামে, ল্যাঙ্কাশায়ার, ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড়ের গাঁঠরিতে আগুন দেওয়া, অথচ সন্দীপের বিলাতি সিগারেট না হলে চলে না। এ হেন বৈপরীত্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মমগ্ন স্বদেশ-সংহিতা ভাবনার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দেখান।
সঙ্গে সঙ্গে পরাধীন স্বদেশদর্শন হয় আমাদেরও এবং রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতাবোধ।
আমরা অনেকেই জানি, অথবা জানি না, ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথ কী কী সব অসাধারণ সঙ্গীত নির্মাণ করেছেন, সুর দিয়েছেন, তাঁর বাণী ও সুর জাগিয়ে তুলেছে দেশের— পরাধীন দেশের একটি বড় অংশকে। যদিও পরে লক্ষ্য করেন রবীন্দ্রনাথ, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ বিপ্লবীরা যেখানে যেখানে যাচ্ছেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যাচ্ছে। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। যা রবীন্দ্রনাথ কখনও চাননি। বরং বিরোধিতা করেছেন সর্বশক্তি দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-সংহিতা, স্বদেশ ভাবনা তাই একই সঙ্গে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক। আমরা বলেছি, জীবনের ভোরবেলায় তাঁর যে ব্রাহ্ম আনুগত্য, তা স্বামী বিবেকানন্দের কালীচিন্তা, দক্ষিণেশ্বরকেন্দ্রিক, ভাবের ঠাকুর, প্রাণের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ-মথিত, নির্মিত, ভাবকেন্দ্রিকতা থেকে বহু দূরে।
রামকিঙ্কর বেইজ ছিলেন নন্দলাল বসুর ছাত্র। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সব-সর্বস্ব ভেঙে দিতে বলেছেন। মুক্তধারা নাটকের শিবতরাইও যেন উঠে আসে তাঁর স্বদেশ-সংহিতায়, স্বদেশ-চিন্তায়। সেখানে রবীন্দ্রনাথ মুক্তমনা বাউল। স্বদেশ তাঁর কাছে গ্রাম-উন্নয়নের বিষাণ। সেই গ্রামোন্নয়নের ভেতর আছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, আন্তর্জাতিক চিন্তা। চীন, জাপান, ইয়োরোপকে তিনি নিয়ে এসেছেন এই চৌহদ্দির ভেতর। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য মেলবন্ধন তাঁর স্বদেশ-সংহিতা-দেশ ভাবনায়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশ-সংহিতাকে প্রসারিত করেছেন, শুধুমাত্র লিখন-খেলার মধ্যে নয়। তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আমরা জানি। অজস্র গান তাঁর। সে সব নিয়ে আলাদা আলাদা করে বলতে গেলে রামায়ণ-মহাভারত হয়ে যাবে। জালিয়ানওয়ালাবাগের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড, জেনারেল ও’ডায়ারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের তাণ্ডব, এই বীভৎসতার বিরুদ্ধে তাঁর নাইটহুড ত্যাগ, যখন জাতীয় কংগ্রেস ও মহাত্মা গান্ধীজি-সহ জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব সম্পূর্ণ বিহ্বল, কী করবেন তাঁরা বুঝতে পারছেন না, তখন একা এক কবি এগিয়ে এলেন তাঁর স্বদেশ-সংহিতা-স্বদেশচৈতন্য নিয়ে। হ্যাঁ, তিনি রবীন্দ্রনাথ।
হিজলি জেলে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি এই ভাবেই সোচ্চার। প্রতিবাদী তাঁর নিজস্ব ভাবনা-বিন্যাসে, জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায়, মানবিকতায়, সত্যের নিজস্ব আবিষ্কারে। স্বদেশী করা ছেলেদের, মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অতি সংবেদনশীল রবীন্দ্রনাথ। চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের অন্যতম বীর কল্পনা দত্ত, পরে কল্পনা যোশী, কমিউনিস্ট নেতা পূরণচাঁদ যোশী— পি. সি. যোশীকে বিবাহের পর, তাঁর মুক্তি— ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কারাগার থেকে মুক্তির জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং মহাত্মা গান্ধীজি।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশ-সংহিতায় গ্রামোন্নয়নকে বার বার সামনে এনেছেন। তাঁর পরিকল্পিত হলকর্ষণ ও বর্ষামঙ্গল ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে, ঋতু বদলের সঙ্গে জীবনকে মিলিয়েছে। এই নতুন নতুন উৎসব নির্মাণের সঙ্গে তিনি নির্মাণ করেছেন নব নব সঙ্গীত ও সুর। গ্রামজীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি, আদিবাসী-মূলবাসী বন্ধুদের জীবন— সব কিছুকে মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি এক অন্যতর যাত্রাপথে নিয়ে যেতে চেয়েছেন স্বদেশ ও সমাজকে।
আমরা ঠাকুরবাড়ির হিন্দুমেলার কথা গোড়াতেই ছুঁয়ে এসেছি। সেই নরকরোটি, নিভু দীপালোক, একটি ছুরিকা— সব কিছুকেই স্বাদেশিকতার প্রতীক হিসাবে ধরে নিয়ে হাম-চু-মু-হাফ ইত্যাদি প্রভৃতি, যাবতীয় সমাবেশের মধ্য দিয়ে গুপ্ত সমিতির ভাবনা, রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনতা অর্জনের এই পথকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন গোড়া থেকে। কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার তিনি ছিলেন সর্বার্থে বিরোধী।
এই চূর্ণিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই রবীন্দ্রনাথকে স্বতন্ত্র করেছে অন্যদের থেকে। তিনি শুধুমাত্র ভারতভূমির ঋষিকল্প আলোকবৃত্ত ঘাড়ে অথবা মাথায় নিয়ে হেঁটে যেতে চাননি। আর ইউরোপ তাঁকে প্রথম জীবনে আচ্ছন্ন করে রাখলেও, পরবর্তী সময়ে তিনি সেই ঘোরকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন তাঁর পূর্ববঙ্গবাস পর্বে, শাহজাদপুরের জমিদারি সামলাতে গিয়ে। মানুষ নামের মণি-মাণিক্যদের তিনি আবিষ্কার করেছেন নতুন করে, যা দর্পণাভাস হয়ে জেগে ওঠে তাঁর নির্মাণে। তাই তিনি অনন্য। অসাধারণ। অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর স্বদেশ-সংহিতার পাতাগুলি তাই জীবন-আলেখ্য উত্তর-দার্শনিক কলচ্ছায়া।

Sumit Chakraborty: