ফলহারিণী কালীপুজো : কর্মফল মোচন, মাতৃসাধনা ও মুক্তির মহাতিথি

চিঠিতে মাকে মনস্কামনা জানান, পূর্ণ করবেন মা ওঁলাই চণ্ডী

তথ্য সৌজন্যে: জ্যোতিষী প্রদীপ্ত চক্রবর্তী (ওঁলাই চণ্ডী মন্দিরের সেবাইত, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত জ্যোতিষী, বাস্তুবিদ, নিউমেরোলজিস্ট, তন্ত্রক্রিয়ায় পারদর্শী)

সাক্ষাৎকার: ঈশানী মল্লিক

বাংলার শাক্তধর্ম, তন্ত্রসাধনা ও লোকবিশ্বাসে ফলহারিণী কালীপুজো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আধ্যাত্মিক তিথি। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় পালিত এই পূজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচরণ নয়; এটি ভক্তের আত্মশুদ্ধি, কর্মফল মোচন, মাতৃশক্তির আরাধনা এবং জীবনের অশুভ শক্তিকে দূর করার এক বিশেষ সাধনা। বাংলার গ্রাম থেকে শহর, গৃহস্থের ঠাকুরঘর থেকে সতীপীঠ ও কালীমন্দির— সর্বত্র এই তিথিকে ঘিরে তৈরি হয় গভীর ভক্তি ও আধ্যাত্মিক আবহ।

“ফলহারিণী” শব্দের অর্থ— যিনি “ফল” অর্থাৎ কর্মফল হরণ করেন। তিনিই শক্তি, জ্ঞান, ইচ্ছা ও কর্মশক্তির আধার। বিশ্বাস করা হয়, মা প্রসন্ন হলে জীবনের দুঃখ, দুর্দশা, পাপফল ও অশুভ শক্তি নাশ হয় এবং মানুষ শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করে।

কলকাতার বুকে বেলগাছিয়ার ঠিক পরেশনাথ মন্দিরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে অতীব জাগ্রত মা ওঁলাই চণ্ডী মন্দির। এই মন্দির ২০২৬ সালের অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ৪৭৭তম বর্ষে পদার্পণ করল।

আগামী ১৬ মে ফলহারিণী অমাবস্যার দিন সকালে মায়ের বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে ভক্তদের অবশ্যই এই দিন মাকে দর্শন করতে মন্দিরে আহ্বান জানানো হয়েছে। পুজোর পর মায়ের অন্নভোগ বিতরণ করা হবে। অন্নভোগ নেওয়ার জন্য কোনও কুপন বা টাকা দিতে হয় না। ভক্তদের কাছে পুজোর জন্য বা দর্শনের জন্যও কোনও রকম চাঁদা বা নির্দিষ্ট প্রণামি দাবি করা হয় না।

মন্দিরের সেবাইত প্রদীপ্ত চক্রবর্তী জানান, সাদা কাগজে লাল কালি দিয়ে নাম ও গোত্র এবং নীল কালি দিয়ে মনস্কামনা লিখে সারা বছরের প্রতি অমাবস্যার দিন সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দশটার মধ্যে মন্দিরে এসে এই কাগজ মায়ের হোমের আহুতিতে দিলে মা মনস্কামনা পূরণ করেন। যত ভক্ত এই মনস্কামনার কাগজ নিয়ে আসেন, সকলের কাগজ গ্রহণ করে হোমে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া একমাত্র প্রতি অমাবস্যার দিনই মায়ের ঘটের জল মন্দির থেকে ভক্তদের দেওয়া হয়। যে জল পান করলে শরীর রোগমুক্ত হয়। পাশাপাশি ২৮টি শনিবার বা মঙ্গলবার ঘিয়ের প্রদীপ মায়ের মন্দিরে এসে জ্বালালে মা মনস্কামনা পূরণ করেন।

মা ওঁলাই চণ্ডী মন্দিরের ইতিবৃত্ত, মায়ের মাহাত্ম্য আমাদের পত্রিকায় খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। তবে ফলহারিণী অমাবস্যার দিন এই মন্দিরে এসে মা চণ্ডী, মা ষষ্ঠী, মা শীতলা, মা মনসা ও বাবা পঞ্চাননের দর্শন করে মাকে অবশ্যই আপনার মনস্কামনা মায়ের হোমের আহুতিতে দিয়ে মায়ের অপার কৃপা লাভ করুন।

ফলহারিণী কালীপুজো কেন করা হয়?

শাক্ত তন্ত্র মতে, মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা কর্ম করে এবং সেই কর্মের ফল ভোগ করে। মা কালী সেই কর্মফলের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ফলহারিণী কালীপুজোর মাধ্যমে ভক্তরা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন—

১) অশুভ কর্মফল নাশের জন্য
২) মানসিক শান্তির জন্য
৩) সংসারের মঙ্গল কামনায়
৪) মোক্ষ বা আত্মমুক্তির জন্য
৫) জীবনের বাধা দূর করার জন্য

বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে মা স্বয়ং ভক্তের মনের বাসনা পূরণের জন্য মর্ত্যে অবতীর্ণ হন।

“ফলহারিণী” নামের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা:

“ফল” অর্থ কর্মফল বা জীবনের সঞ্চিত সুখ-দুঃখের প্রতিফল। “হারিণী” অর্থ অপহরণকারিণী বা নাশকারিণী।

অর্থাৎ— ফলহারিণী মা সেই দেবী, যিনি সন্তানের অশুভ কর্মফল হরণ করে শুভফল ও মোক্ষফল প্রদান করেন। তন্ত্রে এই অমাবস্যাকে আত্মসমর্পণ ও আত্মশুদ্ধির রাত্রি বলা হয়।

২০২৬ সালের ফলহারিণী অমাবস্যার সময়সীমা:

বিশুদ্ধ শুদ্ধ পঞ্জিকা মতে: ২০২৬ সালে ফলহারিণী অমাবস্যা পালিত হবে ১৬ মে। ভোর ৫টা ১৩ মিনিটে অমাবস্যা শুরু। তিথি শেষ রাত ১টা ৩১ মিনিটে।

গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকা মতে: ১৫ মে। ভোর ৪টা ১ মিনিটে অমাবস্যা শুরু। তিথি শেষ রাত ১টা ৪৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে।

শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের ষোড়শী পূজা:

ফলহারিণী অমাবস্যার সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক ঘটনা হলো দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের “ষোড়শী পূজা”।

১২৮০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীকে জগজ্জননী রূপে পূজা করেন। তিনি সারদা মাকে “ত্রিপুরাসুন্দরী” বা “ষোড়শী” রূপে আসনে বসিয়ে শাস্ত্রমতে পূজা সম্পন্ন করেন। নিজের সমস্ত সাধনার ফলও তিনি সারদা মায়ের চরণে সমর্পণ করেন।

এই ঘটনা ভারতীয় আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কারণ—

১) নারীকে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়
২) মাতৃভাব সাধনার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে
৩) শক্তি ও চৈতন্যের মিলনের প্রতীক হয়ে ওঠে এই পূজা

আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে এই দিন “ষোড়শী পূজা” বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়।

ফলহারিণী কালীপুজোর শাস্ত্রমত গুরুত্ব:

তন্ত্রশাস্ত্রে এই অমাবস্যাকে অত্যন্ত শক্তিশালী তিথি বলে ধরা হয়। এই দিনে— কালীসাধনা বিশেষ ফলপ্রদ, জপ ও তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়, গুরুদীক্ষা ও প্রায়শ্চিত্তের বিশেষ মাহাত্ম্য থাকে, গৃহদোষ ও গ্রহদোষ নাশের জন্য বিশেষ পূজা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে মা কালীর উপাসনায় বহু গুণ ফল লাভ হয়।

ফলহারিণী কালীপুজোর নিয়ম:

গৃহস্থের পূজা, ভোরে স্নান, উপবাস বা নিরামিষ আহার, ঘর পরিষ্কার রাখা, কালীমন্ত্র জপ, প্রদীপ জ্বালানো, জবা ফুল ও ফল নিবেদন, চণ্ডীপাঠ বা কালীকীর্তন, রাতের বিশেষ পূজা, নিশিপূজা, দীপদান, তন্ত্রমতে হোম ও যজ্ঞ, মাতৃসঙ্গীত ও নামসংকীর্তন।

ফল নিবেদনের বিশেষ রীতি:

জ্যৈষ্ঠ মাসে আম, জাম, লিচু, কাঁঠালসহ নানা মরশুমি ফল সহজলভ্য হয়। তাই ফলহারিণী কালীপুজোয় ফল নিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বাস করা হয়— ফল নিবেদন মানে নিজের কর্মফল মায়ের চরণে সমর্পণ করা। মা সেই অশুভ ফল হরণ করে শুভফল প্রদান করেন। অনেক স্থানে ফুলের বদলে ফল দিয়ে দেবীকে সাজানো হয়, বিশেষত তারাপীঠের মতো মাতৃপীঠে।

বিশেষ লোকবিশ্বাস ও আচার:

১) প্রিয় ফল নিবেদন: এদিন মায়ের কাছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় ফল নিবেদন করার রীতি আছে। পূজার পর সেই প্রসাদী ফল বাড়িতে রেখে দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, মনোস্কামনা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ওই ফল আর খাওয়া যায় না।

২) গঙ্গাস্নান: এই দিনে গঙ্গাস্নান অত্যন্ত পুণ্যজনক বলে মনে করা হয়। গঙ্গা না থাকলে পুকুর বা অন্য জলাশয়েও স্নান করা যায়।

৩) মৌনী ব্রত: অমাবস্যা তিথিতে বাকসংযম বা মৌনী ব্রত পালনকে অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়।

৪) অশ্বত্থ গাছের পূজা: জন্মকুণ্ডলীতে চন্দ্র বা মঙ্গলের দোষ থাকলে অশ্বত্থ গাছ পূজা করলে শুভ ফল পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস।

৫) শিবপূজা: মা কালীর সঙ্গে শিবের পুজোও বিশেষ ফলদায়ী বলে মনে করা হয়। পঞ্চামৃত দিয়ে শিবপূজার রীতি রয়েছে।

৬) দানধর্ম: দরিদ্র মানুষকে বস্ত্র ও খাদ্যদান করলে সংসারে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে— এমন লোকবিশ্বাস প্রচলিত।

ফলহারিণী অমাবস্যায় অন্যান্য দেবীর পূজা:

বাংলার বহু অঞ্চলে এই দিনে শুধু মা কালী নন, আরও কয়েকজন দেবীর পূজাও হয়—

মা চণ্ডী: অশুভ শক্তি বিনাশের দেবী
মা মনসা: সাপের ভয় ও বিপদ থেকে রক্ষাকারিণী
মা শীতলা: রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করেন

গ্রীষ্মকালে মহামারী, সাপের উপদ্রব ও নানা দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য এই দেবীদের আরাধনা করা হয়।

সতীপীঠ ও তান্ত্রিক সাধনা

তারাপীঠ, কালীঘাট, কঙ্কালীতলা, আত্তাহাসসহ বহু সতীপীঠে ফলহারিণী অমাবস্যা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়।

বিশেষ আচার:

নিশিপূজা, তন্ত্রসাধনা, ভৈরব পূজা, শ্মশান সাধনা, সারারাত জাগরণ। তারাপীঠে এই রাতে শ্মশানকালী সাধনার বিশেষ গুরুত্ব থাকে।

বলিপ্রথা : ঐতিহ্য ও ব্যাখ্যা

অতীতে বাংলার বহু শাক্তপীঠে পাঁঠাবলি বা প্রতীকী বলির প্রচলন ছিল। বর্তমানে অনেক মন্দিরে কুমড়ো, লাউ বা আখের প্রতীকী বলি দেওয়া হয়।

তান্ত্রিক ব্যাখ্যায়— প্রকৃত বলি হলো মানুষের অহংকার, কামনা, লোভ ও অশুভ প্রবৃত্তির বিসর্জন।

ফলহারিণী কালীপুজোর ফল ও মাহাত্ম্য:

ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই পূজায়— বিদ্যা ও কর্মক্ষেত্রে উন্নতি হয়, অর্থভাগ্যের শুভ পরিবর্তন ঘটে, প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের বাধা দূর হয়, সংসারে সুখ ও শান্তি আসে, মানসিক ভয় ও অস্থিরতা কমে, আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই পূজা আত্মসমর্পণ ও মাতৃশক্তির প্রতি ভক্তির এক গভীর প্রকাশ।

ফলহারিণী কালীপুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাংলার শাক্তভক্তি, তন্ত্রসাধনা, মাতৃভাব এবং আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির এক গভীর ঐতিহ্য। জ্যৈষ্ঠের অমাবস্যার অন্ধকারে মা কালীর আরাধনার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের জীবনের অশুভ শক্তি, ভয়, দুঃখ ও কর্মফল মায়ের চরণে সমর্পণ করে। শ্রীরামকৃষ্ণের ষোড়শী পূজার ঐতিহাসিক ঘটনা এই তিথিকে আরও মহিমান্বিত করেছে। তাই ফলহারিণী অমাবস্যা আজও বাঙালির ধর্মচেতনা, লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য মহাতিথি হিসেবে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

যোগাযোগঃ ৭৪৩৯৭৪৩৭২৯

Sumit Chakraborty: