ড. বুলবুল বিশ্বাস, ডক্টর অব ফার্মেসি
শহরের ব্যস্ত জীবনে হালকা বুকজ্বালা, ঢেকুর বা অম্বল যেন নিত্যসঙ্গী। আর সেই সঙ্গে নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে একটি পরিচিত ট্যাবলেট—Pan-D। ফার্মেসির কাউন্টারে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সহজলভ্য এই ওষুধটি অনেকের কাছেই ‘ইমিডিয়েট রিলিফ’-এর সমার্থক। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রশ্ন উঠছে—এই অভ্যাস কি নিরাপদ?
ওষুধ না ‘কম্বিনেশন থেরাপি’?
Pan-D আসলে একক কোনো উপাদান নয়; এটি দুইটি শক্তিশালী ড্রাগের সংমিশ্রণ—Pantoprazole এবং Domperidone।
প্যান্টোপ্রাজল প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI) শ্রেণির ওষুধ, যা পাকস্থলীর অ্যাসিড তৈরির প্রক্রিয়া দমন করে।
ডমপেরিডোন গ্যাস্ট্রো-প্রোকাইনেটিক এজেন্ট, যা পাকস্থলীর চলাচল বাড়ায় এবং বমি ভাব কমায়।
এই সংমিশ্রণটি মূলত Gastroesophageal Reflux Disease (GERD), গ্যাস্ট্রাইটিস বা পেপটিক আলসারের মতো নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
‘ডেইলি হ্যাবিট’ হলে কী হতে পারে?
চিকিৎসকদের মতে, সমস্যা শুরু হয় তখনই যখন এই ওষুধটি ‘প্রয়োজনমতো’ নয়, বরং ‘অভ্যাসবশত’ খাওয়া হয়।
১. পুষ্টির ঘাটতি—অদৃশ্য বিপদ
দীর্ঘদিন প্যান্টোপ্রাজল গ্রহণ করলে শরীরে ভিটামিন বি১২, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের শোষণ কমে যেতে পারে।
ভিটামিন বি১২ ঘাটতি → স্মৃতিভ্রংশ, স্নায়বিক সমস্যা
ক্যালসিয়াম ঘাটতি → হাড় ক্ষয়, অস্টিওপোরোসিস
ম্যাগনেসিয়াম ঘাটতি → পেশিতে খিঁচুনি, দুর্বলতা
২. সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি
পাকস্থলীর অ্যাসিড আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কমে গেলে Helicobacter pylori infection, Clostridioides difficile infection এমনকি নিউমোনিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
৩. হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা
ডমপেরিডোন দীর্ঘদিন ব্যবহারে হৃদ্যন্ত্রের ইলেকট্রিকাল সিস্টেমে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে QT interval বৃদ্ধি করে, যা অনিয়মিত হার্টবিট বা গুরুতর ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বাড়ায়।
‘রিবাউন্ড অ্যাসিডিটি’—নেশার মতো নির্ভরতা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল ‘রিবাউন্ড হাইপারঅ্যাসিডিটি’। দীর্ঘদিন ওষুধ খাওয়ার পর হঠাৎ বন্ধ করলে শরীর অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি করতে শুরু করে। ফলে রোগী আবার সেই একই ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এ এক চক্র—স্বস্তি, পুনরায় অস্বস্তি, এবং আবার ওষুধ। রোগ ঢাকা পড়ে, রোগ সারায় না।
গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল—এই ওষুধ মূল রোগের চিকিৎসা নয়, বরং উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করে।
অম্বলের পেছনে কারণ থাকতে পারে—
পিত্তথলির পাথর, Helicobacter pylori infection, অগ্ন্যাশয়ের সমস্যা, এমনকি পাকস্থলীর ক্যান্সার।
নিয়মিত প্যান-ডি খেলে উপসর্গ চাপা পড়ে, কিন্তু রোগ ভেতরে ভেতরে বাড়তে পারে—যা দেরিতে ধরা পড়লে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
তাহলে কি একেবারেই খাবেন না?
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে—খাবেন, তবে শর্তসাপেক্ষে।
চিকিৎসকের পরামর্শে, নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য, Self-medication এখানে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিকল্প কোথায়? জীবনযাত্রাতেই সমাধান।
চিকিৎসকেরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্যাস-অম্বলের মূল কারণ জীবনযাত্রা।
✔ অতিরিক্ত তেল-মশলাদার খাবার কমান
✔ রাতে দেরি করে খাবেন না
✔ খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শোবেন না
✔ ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
✔ মানসিক চাপ কমাতে যোগ বা মেডিটেশন করুন।
ওষুধ কখনোই শত্রু নয়—কিন্তু অযথা ব্যবহারে সেটাই ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। Pan-D এমন একটি ওষুধ, যা সঠিক প্রয়োগে কার্যকর, কিন্তু অভ্যাসে পরিণত হলে বিপজ্জনক।
স্বস্তির শর্টকাট যত সহজ, তার মূল্য ততটাই গভীর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়—নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দিন, কারণ উপসর্গ নয়, মূল কারণই চিকিৎসার লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অনুলিখন- ঈশানি মল্লিক।
যোগাযোগের নম্বর- ৮২০৭০৭৩৬৯৫