অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু বাড়ছে কি কর্মসংস্থান?

ভারতের অর্থনীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি, পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য, ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার স্বপ্ন- গত কয়েক বছরে এই শব্দবন্ধগুলি প্রায় সরকারি অভিধানের অংশ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু অর্থনীতির সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলির একটি হল কর্মসংস্থান। আর সেই জায়গাতেই ফের উদ্বেগের ঘণ্টা বাজাল জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস (এনএসও)-এর সর্বশেষ তথ্য।

মে মাসে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৫ শতাংশে। গত ১১ মাসের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ৫.২ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে ০.৩ শতাংশ বৃদ্ধি হয়তো সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু দেশের মতো বিপুল জনসংখ্যার অর্থনীতিতে এই সামান্য বৃদ্ধির পিছনেও লুকিয়ে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার বাস্তবতা। একটি চাকরি হারানো মানে শুধু একজন ব্যক্তির আয় কমে যাওয়া নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভোগক্ষমতা, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান।

উদ্বেগের বিষয়, এই বৃদ্ধি কেবল কোনও একটি অঞ্চল বা ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ ভারত, শহুরে ভারত, সংগঠিত ক্ষেত্র, অসংগঠিত ক্ষেত্র- প্রায় সর্বত্রই চাপের চিহ্ন স্পষ্ট। গ্রামে পুরুষদের বেকারত্বের হার ৪.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.২ শতাংশ হয়েছে। শহরেও বেকারত্ব বেড়েছে। অর্থাৎ সমস্যা আর বিচ্ছিন্ন নয়, ক্রমশ কাঠামোগত রূপ নিতে শুরু করেছে।

ভারতের অর্থনীতির একটি বড় বাস্তবতা হল, দেশের বিপুল শ্রমশক্তির একটি অংশ এখনও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে। ক্ষুদ্র শিল্প, নির্মাণ ক্ষেত্র, পরিবহণ, খুচরো ব্যবসা, ছোট উৎপাদন ইউনিট, কৃষি-নির্ভর কর্মকাণ্ড- এই ক্ষেত্রগুলিই কোটি কোটি মানুষের জীবিকার উৎস। কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির প্রথম ধাক্কা সাধারণত এই ক্ষেত্রগুলিই খায়। পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার প্রভাব দেশের উৎপাদন খরচে পড়া অবশ্যম্ভাবী।

জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পেট্রল বা ডিজেলের খরচ বাড়ে না।
পরিবহণ ব্যয় বাড়ে, কাঁচামালের দাম বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উপর। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন কমাতে হয়, নতুন নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়, কখনও কর্মী ছাঁটাইও অনিবার্য হয়ে ওঠে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘এমপ্লয়মেন্ট স্ট্রেস’। বর্তমানে ভারতের শ্রমবাজারে সেই চাপের লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, যে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রকে গত দুই দশক ধরে ভারতের মধ্যবিত্ত কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে দেখা হয়েছে, সেখানেও মন্থরতার ইঙ্গিত মিলছে। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে নতুন নিয়োগের চাহিদা কমার অর্থ হল শুধু কয়েকটি সংস্থার নিয়োগনীতিি বদল নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ধাক্কা ভারতের উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমবাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার ওঠানামা এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ব্যয় সংকোচনের প্রবণতা আগামী দিনে এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কি কর্মসংস্থান তৈরি করছে? গত এক দশকে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, কর্মসংস্থানের মান ও গুণগত উন্নয়ন নিয়ে ততটা হয়নি। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বহু দিন ধরেই ‘জবলেস গ্রোথ’ বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলে আসছেন। অর্থাৎ অর্থনীতি বড় হচ্ছে, উৎপাদন বাড়ছে, কর আদায় বাড়ছে, কিন্তু সেই হারে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ যুবসমাজ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়। বেকারত্ব তখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না; তা সামাজিক অস্থিরতা, হতাশা এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণও হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য পরিস্থিতির সম্পূর্ণ অন্ধকার দিকও নেই। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ চলছে। উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একাধিক প্রকল্প চালু রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো ক্ষেত্রে সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে হলে আরও সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন।

শুধু বড় শিল্পগোষ্ঠীকে বিনিয়োগে উৎসাহ দিলেই হবে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বাঁচাতে হবে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে, কৃষির বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পগুলিকে বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বাড়ানোর দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

মে মাসের বেকারত্বের পরিসংখ্যান তাই নিছক একটি সরকারি রিপোর্ট নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। দেশের অর্থনীতি যত বড়ই হোক না কেন, সেই অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে কত মানুষের হাতে কাজ পৌঁছচ্ছে তার উপর। ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের যুবক থেকে শুরু করে শহরের প্রযুক্তিকর্মী- সকলের জীবনে প্রতিফলিত হবে। অন্যথায় জিডিপির উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের আড়ালেও বেকারত্বের দীর্ঘ ছায়া দেশের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবে।

Dainik Digital: