প্রস্তরযুগে প্রস্তরীভূত

তার দেশের ভেতরের যে অসন্তোষ তাকে লেবেনচুষ দিয়ে ঠান্ডা করার একটি হাস্যকর প্রয়াস নিয়েছেন। যুদ্ধ কীভাবে বন্ধ হবে- এই সংক্রান্ত কোনও চিন্তাভাবনা বা পথনির্দেশই নেই তার কাছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দিচ্ছেন অন্যদিকে আমেরিকার পেট্রোল পাম্পে তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশবাসীকে শোনালেন, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর ক্ষমতাও শেষ। অন্যদিকে আমেরিকানদের মুদি সামগ্রী কেনার বাজেটে টান পড়তে শুরু করেছে। এই নিয়ে দেশের ভেতরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার রাশ টানতে চাইলেন জাতির উদ্দেশে ভাষণের নামে। ট্রাম্পের এই ভাষণ শুনতে শুধু তার দেশবাসী নয়, বিশ্বের মানুষ যারাই যুদ্ধ ও যুদ্ধের ফলিত রসায়নে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কোপে পড়েছেন প্রত্যেকেই উন্মুখ ছিলেন। কি দেশ কি আন্তর্জাতিক মহল- সবাইকেই নিরাশ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আসলে তিনি তার দেশের ভেতরের যে অসন্তোষ তাকে লেবেনচুষ দিয়ে ঠান্ডা করার একটি হাস্যকর প্রয়াস নিয়েছেন। যুদ্ধ কীভাবে বন্ধ হবে- এই সংক্রান্ত কোনও চিন্তাভাবনা বা পথনির্দেশই নেই তার কাছে। হোয়াইট হাউস যখন ঘোষণা করল যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো কোনো বড় ঘোষণা দিতে চলেছেন। কিন্তু বুধবার ২০ মিনিটেরও কম সময়ের বক্তব্যে ট্রাম্প কেবল তার পুরানো কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করলেন, যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চর্বিতচর্কন করে আসছেন। ইরান সম্পর্কে না যুদ্ধ সম্পর্কে কোনও ক্ষেত্রেই তার কোনও গভীর ভাবনার ছাপ এলো না। একেবারেই রদ্দিমার্কা ভাষণ, যা কেবল শ্রোতা বা দর্শকের সময়ই নষ্ট করলো।


প্রত্যাশা ছিল ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধের সমাপ্তি অথবা স্থল অভিযানের মতো কোনো অবাস্তব ও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেবল পুরোনো কড়া বুলি, হুমকি শুনিয়েই শেষ করলেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ট্রাম্প মূলত চারটি যুক্তি তুলে ধরেন। তার মতে ১)এই যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল.২) যুদ্ধে ইতিমধ্যে জয় অর্জিত হয়েছে। ৩) লড়াই চালিয়ে যেতে হবে এবং ৪) খুব শিগগিরই এর সমাপ্তি ঘটবে। কীভাবে কোন্ ফর্মুলায় যুদ্ধ শেষ হবে কিংবা ইরানের সঙ্গে তিনি ঠিক কী ধরনের চুক্তি করতে চান, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা রূপরেখা তিনি দেননি। ট্রাম্প গত ১১ মার্চ প্রথম বলেছিলেন, যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে। এর পর আর শীঘ্র বলছেন না দুই তিন সপ্তাহকাল বলে যাচ্ছেন। আর যখনই বলছেন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাচ্ছে তখনই ইরান- ইজরায়েলের সংঘাত আর এক দফা বেড়ে যাচ্ছে বা উপসাগরে মার্কিনী সেনা তাঁবুগুলিতে হামলার ঘটনা ঘটছে।তার জাতির উদ্দেশে ভাষণে তাই নতুনত্ব খুঁজে পাননি কেউ।


জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, ভাষণের কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য তার নজরে পড়েনি। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সির মতে, ট্রাম্প গত ৩০ দিনে যেসব টুইট করেছেন তার একটি ধারাবাহিক সারাংশ ছিল এই ভাষণ। এটি প্রমাণ করে যে যুদ্ধ নিয়ে তাঁর কাছে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা নেই। নতুন ঘোষণা না থাকলেও তার ভাষণে ক্লান্ত মার্কিন জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্প আর কয়েকমাস পর দেশে অন্তর্বর্তী নির্বাচনে যাচ্ছেন। এই সময়ে জনগণের সমর্থন তার দিকে থাকার কথা। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধে দেশটিতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি সহ পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এই নিয়ে ট্রাম্পের ওপর দেশের মানুষ প্রথম থেকেই অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান দেশের মানুষের সমর্থন, সহানুভূতির জন্যই সম্ভবত তিনি বয়ান তৈরি করেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এবং সেটি ব্যবহার করতে পারে, তাই আমেরিকা ও ইজরায়েলের এই অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু অভিযানে ফল হল উল্টো। মানুষ আরও বিগড়ে গেছেন।

Sujoy Guha: