ডা: সাগর নীল নন্দী
বিডিএস, এমডিএসসি (চেন্নাই)
ডায়াবেটিসের কারণে বা অন্য কিছু রোগের কারণে শুধু যে হৃদরোগ, কিডনি, স্নায়ুর সমস্যা দেখা দেয় তাই নয়— ডায়াবেটিস এবং অন্য কিছু কিছু রোগ ক্ষতি করতে পারে দাঁতেরও। ফলে যারা ডায়াবেটিক এবং আরো কিছু বিশেষ রোগের শিকার তাদের অবশ্যই তাতে যত্ন নেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন। ডায়াবেটিস এবং অন্য কিছু কিছু রোগের কারণে দাঁত ও মাড়ির বিশেষ করে পেরিও ডেন্টাল ডিজিজ মাড়ির রোগ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা লালায় গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়িয়ে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এর ফলে মাড়ি ফুলে যাওয়া, দাঁতের ক্ষয় থেকে শুরু করে দাঁত হারানোর মূল কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে নিয়মিত দাঁতের যত্ন এবং ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছিলাম ডঃ সাগর নীল নন্দী, বিডিএস, এমডিএসসি (চেন্নাই )- কনসালটেন্ট ওরাল সার্জেন-এর সঙ্গে।
ডায়াবেটিস থাকলে কীভাবে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে?
ডায়াবেটিস এবং কিছু কিছু অসুখের সঙ্গে দাঁতের সমস্যার মধ্যে ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। ডায়াবেটিস এবং শরীরের অন্য কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে সেগুলো গুরুতর ডেন্টাল ও মাড়ি রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডেন্টিস্ট-এর কাছে যোগাযোগ করতে হবে চিকিৎসকের কাছে যেতেই হবে। এবং সে ক্ষেত্রে তিনি হয়তো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নির্ণয় করার পরামর্শ দেবেন। রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকায় দাঁতের ক্ষয় রোগ দেখা দেবার কারণে ব্যাকটেরিয়া দাঁতের মধ্যে স্কেভিস বা গহবরের সৃষ্টি করে যা থেকে তাতে ব্যথা হয়। দাঁতের ব্যথায় কেউ যদি অবহেলা করেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করেন তাহলে পরে হয়তো এক সময় দাঁত বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আমরা অনেক ক্ষেত্রে সামান্য ব্যথা বা ফুলে যাওয়া অবহেলা করে থাকি। সেক্ষেত্রে কোন কোন সময় চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
শিশুদের ক্ষেত্রে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বড়দের ক্ষেত্রেও সমস্যার শুরুতেই যেতে হবে। না হলেই রোগ বেড়ে যাবে। প্রাথমিক স্তরে রোগীর যতটা সাহস থাকে দেরি করলে তা থাকে না। যেমন শিরশিরানি থাকলে আমি যদি স্থানীয় দোকান থেকে দুটো ওষুধ খেয়ে, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন দেখে কোনো সলিউশন ব্যবহার করে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে দিই, তিন চার মাস কাটিয়ে দিতে পারি ততক্ষণে কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে। হয়তো সেই ওষুধ খেয়ে বা সলিউশন লাগিয়ে সাময়িক সমস্যার সমাধান হলো কিন্তু দাঁত ততক্ষণে অনেকটা বিপদের মধ্যে চলে গেছে।
দাঁতের সমস্যা থেকে অন্যান্য অসুখের ইঙ্গিত কীভাবে পাওয়া যেতে পারে?
মাড়িতে সংক্রমণ বা দাঁত থেকে রক্ত পড়া কিছু ওষুধের কারণে হতে পারে। এমন উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বিপাকে ফেলতে পারে। ফলে একজন রোগী যার এই ধরনের সমস্যা হচ্ছে তিনি কী কী ওষুধ খান তা জানাটা খুব দরকার। যেমন অ্যামলোডিপিন। চিকিৎসক পরীক্ষা করে যদি দেখেন এই ওষুধের কারণেই রোগীর দাঁতের সমস্যা হচ্ছে তাহলে তিনি ওই ওষুধটি বদলে দিতে পারেন বা ডোজের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারেন। অবশ্যই সেটা ডেন্টিস্ট যদি পরীক্ষা করে দেখেন যে ওই ওষুধটার জন্যই দাঁতের সমস্যা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেই। আরেকটি বিষয় হলো মাড়ি লাল হয়ে যাওয়া বা ব্রাশ করলে রক্ত পড়া সঙ্গে মুখে দুর্গন্ধ —অনেক ক্ষেত্রে ওরাল হাইজিন সঠিক না হলেও এ ধরনের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে। একে বলা হয় পাইরিয়া। আবার এর পেছনে ডায়াবেটিক কারণও থাকতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে মুখের মধ্যে কোনো সমস্যা যেটি দুদিনে সেরে যাওয়ার কথা, তা যদি এক সপ্তাহের বেশি থাকে তবে তাকে চিকিৎসকের কাছে কি যেতেই হবে? এক্ষেত্রে আর কী কী সমস্যা হতে পারে?
অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ থেকেও বিপত্তি হতে পারে। সেক্ষেত্রে পান, সুপারি, তামাক খাওয়া ছাড়তে হবে। মুখের ভেতর কিছু কিছু আলসার হয় যেমন ঠোঁটের ভেতরের দিকে দেখা দিতে পারে— এটা ভিটামিন সি-এর অভাবে হয়। শরীর দুর্বল হলে মুখের ভিতর অনেক সময় আলসার হয় । স্ট্রেস থেকেও হয়। যেমন অনেকের ক্ষেত্রে পরীক্ষার আগে টেনশনে মুখে আলসার হতে পারে। ক্যালকার আলসার বলা হয় এগুলোকে।
সোর আলসারও বলা হয়। আবার হারপিস হতে পারে ঠোঁটের পাশে বা ঠোঁটের কোণেও হতে পারে। চোখের কোণেও হতে পারে। একসঙ্গে ঠোঁট, নাক, চোখেও হারপিস হতে পারে। ভাইরাসের থেকেই এই রোগ ছড়ায়। এখন যে প্রশ্নটা মাঝে মাঝেই আমাদের ভাবায়, মাড়ি থেকে রক্ত পড়াটা কি বড় কোন রোগের কারণ হতে পারে? এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বলছেন কারো কারো ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণভাবে তার দাঁতের সমস্যা হতে পারে এবং তার কারণ হিসেবে দাঁত সব পড়ে যেতে পারে ফলে হজমের সমস্যা এবং তার বাবল সিস্টেম বিকৃত হতে পারে। তাছাড়া এমনি মাড়ির নানারকম রোগেও মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে পারে। সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবেন একমাত্র চিকিৎসক দাঁত পরীক্ষা করার পর।
একটু বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে কি তাড়াতাড়ি দাঁতের রিপ্লেসমেন্ট সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। এখন অনেকের কম বয়স থেকেই দাঁতের সমস্যার শুরু হয়। তাদের সবার ক্ষেত্রেই সম্ভব তবে শুধু টাকা বা সামর্থ্য নয়, রোগীর শারীরিক কন্ডিশন সেই রোগীর ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা সঠিক হবে তা পরীক্ষা করে চিকিৎসককেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই ফিক্সড দাঁত দেওয়া সম্ভব হয় না তার শারীরিক সমস্যার কারণে বা অন্য কোনো কারণে। যেমন— যাদের খুবই উচ্চমাত্রায় ডায়াবেটিস থাকে বা কোলেস্টেরল থাকে তাদের ফিক্সড দাঁত দেওয়া সম্ভব নয়। দিলেও তা থাকে না। এছাড়াও রোগীর মাড়ির গঠন, দাঁতের পরিস্থিতি দেখে নিতে হয়। যাদের ফিক্সড দাঁত দেওয়া সম্ভব নয় তাদের ক্ষেত্রে খোলা পড়া সম্ভব এমন দাঁত দিতে হয়। ডেন্টাল ইমপ্লান্ট অনেকের ক্ষেত্রেই ফেলিওর হতে পারে। যেমন অনেকে আছেন ক্রনিক স্মোকার, তাদের ক্ষেত্রে ইমপ্লান্ট দেওয়া সম্ভব নয়। আবার অনেকের দুর্ঘটনার কারণে দাঁত রিকনস্ট্রাকশন করতে হয় তাদের ক্ষেত্রে যাতে তারা সঠিকভাবে খেতে পারেন সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সুতরাং কার ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা প্রযোজ্য তা দেখেই চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
অনেকেরই মনে একটা ভয়ে থাকে যে, দাঁতের সমস্যা কি ক্যান্সারের কারণ হতে পারে?
কোনো আলসার না সারলে সেই সম্ভাবনা থেকে যেতেই পারে। একদিকে যেমন ডায়াবেটিসের কারণে আলসার হতে পারে, আবার ক্যান্সারের কারণেও হতে পারে। তেমনি মুখের ভেতর কোনো গ্রোথ থাকলে, বা প্রিক্যান্সেরাস রোগীদের ক্ষেত্রে আরো অনেক রকম লক্ষণ থাকে যা দেখে ডেন্টিস্টরা বুঝতে পারেন যে ক্যান্সারের লক্ষণ বা ক্যানসার দেখা দিচ্ছে কিনা।
ব্যথা, একটা অস্বস্তি, ছোট বা ছোট থেকে কোনো কোনো গ্রোথ বা আলসার বড় হতে থাকলে চিকিৎসাকরা প্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে থাকেন। আবার অনেকের ক্ষেত্রে হাতে ধরে বা চোখে না দেখে সেটি ক্যান্সার কি না তা বলা সম্ভব হয় না। সেই রকম সম্ভাবনা মনে হলে বায়োপসি করে দেখে নেওয়া হয়।
এছাড়াও দাঁতের সমস্যার দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন যেসব রোগী তাদের ক্ষেত্রে আরো অনেক রকম লক্ষণ থাকে। তবে দুম করে ক্যান্সার বলে দেওয়া যায় না। মাড়ি থেকে রক্ত পড়লেই তা ক্যান্সার নয়। তার আরো অনেক আনুষঙ্গিক কারণ থাকতে পারে, থাকেও।
অনুলিখন : সৌম্য ঘোষ