শুভাশিস চৌধুরী
শেষপর্ব
মালপত্র বলতে যা আছে সে তো শুধু ধৃতির।তাও একটা ট্রলি স্যুটকেস।বাকি একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলানো কাপড়ের কাঁধ-ব্যাগ।মানসের এইখানে এসে জামা কাপড় কেনাতে, বাড়তি একটা ক্যারিব্যাগ।তা ও অনায়াসে ওর ঝোলানো ব্যাগে ঢুকে গেল। প্রদীপের গাড়িতে যথা সময়ে পৌঁছে গিয়ে দেখে, স্টেশন চত্বর ফাঁকা। ওরা দুজন যাত্রী সারা স্টেশন জুড়ে।মাত্র দুটো চায়ের সাথে হালকা খাবারের ভ্যান, প্ল্যাটফর্মের ভেতর।বাইরে বলতে, টিকিট কাউন্টারের সামনে তেমন কোনো বসার জায়গা নেই।চারদিক দেখে নিয়ে ভেতরে গিয়ে বসল।দুজনের কারোর কাছেই টিকিট নেই।কাউন্টারে গেলে স্টেশন মাষ্টার জেনারেল টিকিট দিয়ে বলল,অনেক সিট খালি হবে,টি টি র সাথে কথা বলবেন,রানিং স্ট্যাটাস দেখে বসিয়ে দেবেন।
তখন অন্যান্যা যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে আসছে।ওরাও ভেতরে গিয়ে বসে ধৃতিই প্রথম বলল,হ্যাঁ রে তুই এখন কোথায় ফিরবি?নাকি স্টেশনে নেমে আবার–
আর তো কোথাও যাওয়ার নেই।যার জন্য এতদিন শুধু একবার ফিরে দেখতে নিরুদ্দেশে বেরিয়ে পড়া,সেই তোকে তো পেয়েই গেলাম।এবার ঘরে ফেরার পালা,খালি হাতে।
মানস ধৃতির দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল।
ট্রেনের চার্ট দেখছে ধৃতি। সকাল সাড়ে ন টায় আগরতলা যাবার গাড়ি আসছে আর ওর নিজের গাড়ি যেটা কলকাতা যাবে, সে আসতে বেলা সাড়ে বারোটা।মানসও দেখল এই চার্ট।তবে এখনো দুজনের ট্রেন যে লেটে চলছে,সে ধৃতি মোবাইল অ্যাপে দেখে নিয়েছে।
রাত্তিরে ওদের কিছু খাওয়া হয়নি।সকালে স্টেশনের সেই কাগজের কাপে কফিই নিয়ে এল মানস।
আচ্ছা ধৃতি!ধর তোর ট্রেনই যদি না আসে,তুই কি যাবি আমার সাথে?
ক্ষেপেছিস?তোর বাকি জীবনটা নষ্ট করি আর কি!
কেন?কেন এ কথা বললি? কেন?
এক কথা বার বার বলাস না আমাকে।দ্যাখ মানস,আমার এই একটা ভদ্রস্থ জীবন,স্বামী ছাড়াও মনের সঙ্গে জুড়ে থাকা,মানে কেমন মানুষ আমার বন্ধু হবে,এ সব তো পেয়েই গেলাম।যে মানুষটার জন্য অনাথ থেকে নাথ হলাম, সে তো আমার বর।আর বর হিসেবে আমার তো তোকে সে সময় না পাওয়ারই কথা বল?
কেন?
যে কোনো সুস্থ বাবা-মাই মনে করেন, সুশিক্ষিত মেয়েকে সঠিক সময়ে এমন একটা মানুষের হাতে তুলে দিতে,যাতে তাঁর মেয়ের জীবন সুরক্ষিত থাকে।এই দিক থেকে মা না থাকলেও বাবা নিজের সে দায়িত্ব পালন করেছেন।তার মূল্য আমি দেবো না?
তা বলে,ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই তোর কাছে।এই যে আমার সঙ্গে ডিগ্রি থেকে থিসিস করার সময় পর্যন্ত এতদিনের সম্পর্ক এর কোনো?
মূল্য ছিল,আছে।এ তো বন্ধুত্বের ভালোবাসা।কিন্তু তোর কাছে তখন তো চাকরি- সংসার এসব নিয়ে কোনো ভাবনাই-
হয়তো তুই বললে-ভাবলে আমিও ভাবতাম।
কিন্তু বললাম না!যখন জানলাম,আমার আসল মা,বাবা সবই ওই হোমের আধিকারিক।তখন আমার আর কোনো কিছুই মাথায়–সে যাক গে।তুই তো এখন ভার্সিটিতে কাজ করছিস,তোর ওই পেপারে পড়লাম।
তা এতদিন-
বিয়ে করলাম না কেন?
আমাকে তো আজীবন সঙ্গী কেমন হবে শিখিয়েছিস তুই।আচ্ছা বল! নীরা কিম্বা চারুলতা কে?যদি একটা মেয়েকে চেনাতে হয়?যদি “শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা” বললে,কোনো মেয়ে আমাকে অসভ্য ভাবে, আমি সেখান থেকে কেমন করে ধৃতিকে খুঁজে বের করব?বাড়ির লোকের কাছে কখনো তো বলতে পারি নি, আমার ধৃতি আছে।বললে কী করে তোকে দেখাব বা চেনাব?সেই রাস্তাও তো বন্ধ করে রেখেছিলি। সবাই আমাকে গুডবই আর নারীবিদ্বেষী বলে তকমা দিয়ে দিয়েছে।এর থেকে বেরুবার পথ খুঁজে পাই না যে-
এবার পাবি।আমি যেমন তোকে রেখেছি তেমনি তুই ও রেখে দে সেই আমাকে মনের গহনে।দেখবি তুই একদিন পাবিই ধৃতির মতো মনের কাউকে,তবে সে অনাথিনী নয়,তাঁর পিতৃপরিচয় থাকবে ঠিকঠাক,”যে আছে অপেক্ষা ক’রে তার পরনে ঢাকাই শাড়ি–
তুই কি অরুনেষকে সন্তান দিতে পারিস নি বলে-
না রে!সে তো আমি যেমন এসেছি,ইচ্ছে করলেই আমিও ওকে দিতে পারি বা নিজেও সে পারে হোম থেকে নিয়ে আসতে।কিন্তু আমরা চাই নি কেউ।চাই জীবনটাকে যে যার নিজের মতো ক’রে কাটাতে।
ধৃতি! কত কঠিন জীবনের কত সহজ সমাধান করে ফেলিস তুই। আমিও কি পারব?
পারবি তো!তুই যে আমার মান্,মানস।এই যে যা, ওঠ্। তোর ট্রেন ঢুকছে,উঠে পর-
তোকে ফেলে?অসম্ভব।আমি তোকে তুলে দিয়ে যদি রাতের ট্রেনে যাই!
আর পাগলামী না।আমাকে যদি সত্যিই বন্ধু ভাবিস,এই একটা কথা রাখ।এই একটা বার তোকে আগে আমি দূর থেকে,হাত নেড়ে বিদায় জানাতে চাই।আমার এই শেষ ইচ্ছেটাকে তুই পুরণ করতে দিবি না?
তবে আর কী বলব?কথা দে এরপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবি।
বলতে বলতে স্টেশনে যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেল।অন্য যাত্রীরা সময়ের সাথে মিলিয়েই, প্ল্যাটফর্মে ঢুকেছে।
ধৃতি মানসের কথায় জবাব দিল,একদম।যা ওঠ।এই যে ট্রেন এসে গেল।ঘরে গিয়ে জানাস।
ট্রেন থেকে যতক্ষন দেখা যায়,ধৃতির হাত নাড়া দেখল,মানস।একসময় ট্রেন বাঁক নিয়ে ঢুকে গেল সুরঙ্গ পথে।
দু একটা স্টেশন পেরিয়ে,ট্রেনের কামড়ায় টি টি এল।সেই একই নিয়মে একটা জানালার ধারে বসে গেল।
জাটিংগা-লামপুর পেরিয়ে একটা স্টেশন আসতেই এক জায়গায় দেখতে পেল পাহাড় আর মেঘের কাছে খবর পৌঁছে দিতে যাচ্ছে যে রাস্তা,আসলে এর নাম দিতকছেরা,মনে হচ্ছে রাস্তার মতো বয়ে চলেছে এই ছড়া। দেখ ধৃতি,ওটা কিন্তু রাস্তা নয় ছড়া।জোরে শব্দ করে বলে,পাশে তাকাতেই!মনে মনে লজ্জা পেল।ধৃতিকে তো সে ছেড়ে এসেছে।পাশের লোক কী ভাবল কে জানে! চন্দ্রনাথপুর আসতেই মনে হল,এখান থেকেই তো!– এবার মানস মনে মনে ঠিক করে ফেলল,না, আর ধৃতিকে নিয়ে সে ভাববে না।
নির্দয় ভাবে ভেবে নিল,ও তো নিজের জীবন,নিজের জীবনসঙ্গী নিয়ে, খুশিই আছে।হয়তো একদিন কোনো হোম থেকে একটা সন্তানও নিয়ে আসবে।হয়তো তার নামও ইচ্ছে করলে মানস রেখে দেবে।কিন্তু আমার জীবনটা তো আমাকেই বাঁচতে হবে।অনেক কাজ বাকি।এই যে হঠাৎ ক’রে হলেও এই দুদিনে এত রকমের মানুষ দেখল,তাদের মুখে বাংলা ভাষা শুনল,তাতেই আশ্চর্য হল।আমি বাংলার বাইরে মাত্র দুটো ভাষা জানি।আমাকে জানতে হবে ডিমাসাদের ভাষার ইতিহাসটা কী?হঠাৎ মনে পড়ল, ত্রিপুরী ভাষাভাষীদের সঙ্গে তাঁদের চেহারার যেমন মিল ,হয়তো থাকবে ভাষাতেও। এইসব ভাবতে ভাবতে আগরতলা স্টেশনে পৌঁছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ওর গম্ভীর মুখ দেখে মা,বাবা কোনো কিছু জিজ্ঞেস করবে না,ঠিক করলেও,মা নিজেকে ধ’রে রাখতে পারল না।
কোথায় গেলি,একবার বলে যাওয়াটাও দরকার মনে করলি না?অনেক বড় হয়েছিস।ভার্সিটিতে পড়াচ্ছিস।নিজে রোজগার করছিস।কী দরকার আমাদের ভাবনাকে গ্রাহ্য করার?
মা বকেই চলেছে,বাবা বরাবরের মত চুপ।
মানস ব্যাগ রাখল।বাথরুমে গেল ফ্রেস হতে।যেতে যেতে বলল,মা আগে এক কাপ চা কর।আমি আসছি।
বাথরুম থেকে শুনতে পেল,মা বলছে,বিয়েটা দিই,যে দিন বাপ হবি, সেদিন বুঝবি। মায়ের কথার কোনো উত্তর দিচ্ছে না বাবা।
বাথরুম থেকে এসে ভাবল,প্রথম ধৃতিকেই জানানো দরকার ওর ঘরে ফেরার কথাটা।ওর পৌঁছানোর খবরটাও নেওয়া দরকার।ফোন হাতে নিয়ে মনে হল, ওর কাছে তো ধৃতির এখনকার নম্বরটাই নেই।ওরটাও তো নেয় নি ধৃতি!
(সমাপ্ত)