ফ্রিজ হওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে প্রয়োজনে টাকা ব্যবহার করতে পারবে কালীঘাট তৃণমূল, শর্ত চাপিয়ে অন্তর্বর্তী নির্দেশ আদালতের

কলকাতা, ৯ জুলাই– ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় আপাতত স্বস্তি কালীঘাট পন্থী তৃণমূলের। যে তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে সেই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা খরচ করতে পারবে তারা, বৃহস্পতিবার এমনই নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। এমনকী এই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে আইনি খরচের টাকাও নেওয়া যাবে বলে জানিয়ে দিয়েছে আদালত।

            অ্যাকাউন্টের টাকা খরচ করতে পারলেও আপাতত অ্যাকাউন্ট পরিচালনার দায়িত্ব থাকছে না কালীঘাট তৃণমূলের হাতে। এজন্য একজন স্পেশ্যাল অফিসার নিয়োগ করেছে আদালত। আপাতত তিনিই ওই অ্যাকাউন্টগুলি পরিচালনা করবেন। ওই স্পেশ্যাল অফিসারের মাধ্যমেই ফ্রিজ হওয়া অ্যাকাউন্টগুলি থেকে টাকা তুলতে পারবে কালীঘাট তৃণমূল। সংশ্লিষ্ট তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে যে কোনও দু’জনের সই করা চেকে স্পেশ্যাল অফিসারের পাল্টা স্বাক্ষরের পরেই ব্যাঙ্ক থেকে অর্থ তোলা যাবে। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে এই মামলাটি ওঠে। বিচারপতি নির্দেশ দেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই স্পেশাল অফিসার থাকবেন। সই করতে যে দু’জন অনুমোদিত তারাই এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কাউন্টার সই থাকতে হবে বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের। এখানেই শেষ নয়, প্রতিদিনের খরচের হিসাব আদালতকে জানাতে হবে বলেও নির্দেশ বিচারপতির।

            অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় একদিকে যেমন কালীঘাট তৃণমূল আপাতত স্বস্তি পেয়েছে তেমনই মামলাকারী তথা বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়কের আইনজীবীকে কার্যত নজিরবিহীন ভাষায় ভর্ৎসনা করল আদালত। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জয়নগরের দলত্যাগী বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস বর্তমানে ঋতব্রত শিবিরের অনুগামী হিসেবে পরিচিত। এদিন শুনানির শুরুতেই তার আইনজীবীকে তীব্র আক্রমণ করেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। মামলার দ্রুত এফআইআর এবং পুলিশের অতি-সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি বলেন, ‘আপনার মক্কেল তৃণমূলের প্রতীকে জিতেছেন। এই দলীয় তহবিল থেকেই তিনি ভোটের যাবতীয় খরচ নিয়েছেন। অথচ ৪ তারিখের পর ডিগবাজি খেয়ে এখন নতুন করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন? ভোটের আগে যখন এই তহবিলের টাকা নিয়েছিলেন, তখন তো কিছু মনে হয়নি?’ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, ‘পুলিশ এই মামলায় এত দ্রুত কাজ কেন করল? সন্ধেবেলা থানায় অভিযোগ দায়ের হল, আর তার পরদিন সকালেই পুলিশ তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিল। এত দ্রুততা অন্য কোনও মামলায় দেখা যায় কি?’

            মামলায় এদিন কালীঘাট তৃণমূলের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি। আদালতে তার প্রশ্ন, অভিযোগ করলেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা যায়? এক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ দরকার। শুধু তাই নয়, যে সমস্ত বিধায়করা অভিযোগ করলেন তারা ২৫ লাখ টাকা নেওয়ার পর সন্দেহ প্রকাশ করলেন। আর এখানেই আইনজীবীর আরও প্রশ্ন, কীভাবে জয়ী বিধায়করা অভিযোগ করতে পারেন? অভিষেক মনু সিংভি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে টাকার প্রয়োজন। দলের প্রতিটি টাকার হিসাব নির্বাচন কমিশন এবং আয়কর দফতরের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মধ্যে থাকে। এগুলি নগদ লেনদেনের অ্যাকাউন্ট নয়। দলের মোট ৯টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলটি কী ভাবে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালাবে? কোনও রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এর আগে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি।’

            বিক্ষুব্ধ তৃণমূল শিবিরের অভিযোগকারী বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী নীরজ কিশান কউল এবং কে পরমেশ্বর। অভিযোগকারীর আইনজীবীদের বক্তব্য, ‘আমাদের দলত্যাগী বলা হচ্ছে। কিন্তু আমরাই আসল তৃণমূল। তাই দল নিয়ে অধিকার আমাদেরই থাকবে।’ বিচারপতির মন্তব্য, ‘এখন আপনাদের অবস্থান সুযোগসন্ধানীর মতো মনে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বিষয়টি বিবেচনা করছে, আদালত নয়। এখানে পুলিশের পদক্ষেপ সঠিক কি না, সেটাই দেখা হচ্ছে। কে আসল তৃণমূল, সেই বিষয় বিবেচনা করব না।’

            আদালতের এই নির্দেশের পরেই বিদ্রোহী তৃণমূলীদের তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন কালীঘাট পন্থী শিবিরের বিধায়ক কুণাল ঘোষ। ঋতব্রত এবং সন্দীপন সাহা শিবিরের বিধায়কদের সরাসরি নাম করে কুণাল প্রশ্ন তোলেন, ‘এই বালিশ চাটা ঋতব্রত, সন্দীপনদের অ্যাকাউন্টে ভোটের আগে ২৫ লক্ষ টাকা করে ঢুকেছে না ঢোকেনি? তৃণমূলের টাকায় ভোটে জিতেছিলেন, তখন তো টাকাটা খারাপ লাগেনি! অভিযোগ করার আগে ওই টাকাটা ফেরত দিলেন না কেন? যখন জানতে পারলেন টাকাটা খারাপ, তখনই ফেরত দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল!’

Sumit Chakraborty: