সাংবিধানিক ছদ্মবেশ!!

ভারতীয় গণতন্ত্রের অভিধানে ‘সংবিধান’ ও ‘গণতন্ত্র’ শব্দদ্বয় দীর্ঘকাল ধরে পরস্পরের পরিপূরক বলে গণ্য হয়েছে। আপামর ভারতবাসীর কাছে এটি এক ধ্রুব সত্য যে, সংবিধানই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ, আর গণতান্ত্রিক চর্চাই সংবিধানের প্রাণভোমরা। কিন্তু সাম্প্রতিক কালখণ্ডে এই দুইয়ের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে যে সংশয় ঘনীভূত হয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং রীতিমতো শঙ্কার কারণ। এক বিচিত্র জাদুবলে আজ বিড়াল রুমাল হয়ে যাচ্ছে- সংবিধানের দোহাই দিয়ে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে সাংবিধানিক চেতনার। যে রক্ষক ভক্ষক হয় না বলে আমরা জানতাম, আজ তার কাঠামোর ভিতর থেকেই এক প্রবল প্রতাপশালী কর্তৃত্ববাদের জন্ম হচ্ছে। এই কি তবে আধুনিক গণতন্ত্রের ভবিতব্য?

সমস্যার মূলে রয়েছে আইনের অনুশাসনের নামে এক প্রকার যান্ত্রিক বৈধতার আস্ফালন। ফরাসি তাত্ত্বিক পিয়্যের রোজাঁভ্যালোঁ যে ‘প্রতি-গণতন্ত্র’ বা ‘কাউন্টার ডেমোক্র্যাসি’-র কথা বলেছিলেন, ভারত আজ তারই এক চরম রূপ প্রত্যক্ষ করছে। সমাজের প্রান্তিক মানুষ, কৃষক বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে গণতন্ত্র আজ শুধু সম্পত্তি রক্ষার হাতিয়ার মাত্র। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কর্তৃত্ববাদী ঝোঁক কিন্তু সংবিধানকে আক্ষরিক অর্থে লঙ্ঘন করছে না; বরং সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও আইনের প্রতিটি ছিদ্রপথ ব্যবহার করেই এটি জনপরিসরের সংলাপকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে। যে রাষ্ট্রকে একদা ‘শক্তিশালী’ করার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সংবিধান প্রণেতারা, আজ সেই রাষ্ট্রই জনতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে মারার যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। বিচিত্র এই গণতন্ত্র, যেখানে ডিম না ভেঙে ডিমভাজা তৈরির মতো অসম্ভব এক যুক্তি খাড়া করা হয় বলা হয়, কড়া শাসন ব্যতীত গণতন্ত্র রক্ষা অসম্ভব!

এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারের পেছনে বিচারবিভাগের ভূমিকাও আজ প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়। বাবরি মসজিদ মামলা থেকে শুরু করে ৩৭০ ধারার বিলোপ, কিংবা বিনা বিচারে রাজনৈতিক বন্দিদের কারারুদ্ধ রাখা; একাধিক ক্ষেত্রে বিচারবিভাগ কার্যত শাসনবিভাগের পরিপূরক হয়েই অবতীর্ণ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির উপর যে অসীম ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে, তার লক্ষ্য কি সত্যই স্বচ্ছতা বজায় রাখা? নাকি আইনি বৈধতার মোড়কে জনমানসে এক ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করা? অতিমারির কাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিল যে, মানুষের প্রাণ বাঁচে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সংলাপের গুণে, পুলিশের লাঠি বা আদালতের পরোয়ানায় নয়। অথচ আজ নির্বাচনকে এক সামরিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করাই যেন শ্লাঘার বিষয় হইয়া দাঁড়িয়েছে।

আসলে ‘অধিকারবোধ’ যখন ‘ন্যায়বোধ’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল আইনি নিগড়ে বন্দি হয়, তখনই সমাজের অন্দরে কলহ ও অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়। জাতীয় আন্দোলনের সময় যে সংলাপী সমাজ ও সৃজনশীল ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখা গিয়েছিল, আজ তা পুলিশি পাহারায় পর্যবসিত। আইনি স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই জুটছে ‘সংবিধান-বিরোধী’ তকমা। আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন, সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়, এটি এক জীবন্ত নৈতিক চেতনা। রুশ ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক মিখাইল বাখতিনের চিন্তনবিশ্বের অন্যতম একটি স্তম্ভ -‘সংলাপবাদ’। বাখতিনের মতে, সত্য কোনও একক কণ্ঠের সম্পত্তি নয়। উপন্যাসের চরিত্রের মতোই সমাজেও বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন স্বর বা ‘ভয়েস’ থাকা আবশ্যক। কোনও একটি স্বর যখন অন্য সব স্বরকে ছাপিয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে চায় (মোনোলগিজম), তখনই গণতন্ত্রের সংকট ঘনীভূত হয়। যদি আইনের দোহাই দিয়েই মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেই সংবিধান কঙ্কালসার কাষ্ঠখণ্ড বৈ আর কিছুই নয়। গণতন্ত্রের অন্দরে আসীন এই ছদ্মবেশী একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটাতে হলে পুনরায় সেই সংলাপী রাজনীতি ও সহমর্মিতার কৃষ্টিতে ফিরে যাওয়া আবশ্যক। অন্যথায়, ‘বিচারের বাণী’ যে কেবল নীরবে নিভৃতে কাঁদবে তা নয়, একদিন হয়তো সেই অশ্রুতেই নিমজ্জিত হবে ভারতের গণতান্ত্রিক গৌরব। ‘সবাই কথা বলুক’- এই দাবিটি কেবল সৌজন্য নয়, বরং সুস্থ সমাজ ও গণতন্ত্রের অনিবার্য শর্ত।

প্রশ্ন জাগে, যে সংবিধান ও গণতন্ত্রের যুগলবন্দিকে আমরা পরম রক্ষাকবচ বলে মান্য করে এসেছি, তা কি তবে আজ কেবল ক্ষমতার বৈধতা আদায়ের এক যান্ত্রিক শিকল মাত্র? জনপরিসরের সংলাপ যখন রুদ্ধ হয় এবং আইনের অক্ষর যখন সহমর্মিতার আত্মাকেই গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন তা সুশাসন নাকি এক সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাচার সেই উত্তর ইতিহাস খুঁজবে। যদি আইনের শাসন শেষ পর্যন্ত মানুষের ন্যায়বোধকেই নির্বাসিত করে, তবে সেই কাগুজে গণতন্ত্র দিয়ে সমাজ কি করবে? অধিকন্তু, ক্ষমতার অন্দরে আসীন কুশীলবেরা এই নৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে প্রস্তুত কি?

Dainik Digital: