সুপ্রিম পর্যবেক্ষণ

ভারত কি শুধুই একটি আধুনিক রাষ্ট্র? নাকি হাজার বছরের বহুত্ব, বিশ্বাস, সংস্কার, আচার এবং সহাবস্থানের এক চলমান সভ্যতা? সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির বেঞ্চে সবরিমালা এবং দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের ধর্মচ্যুতির প্রথা নিয়ে শুনানির সময়ে এই প্রশ্নটাই যেন নতুন করে সামনে এল। আর সেই কারণেই বৃহস্পতিবারের পর্যবেক্ষণ নিছক একটি মামলার আইনি মন্তব্য হয়ে থাকল না, বরং তা ভারতের রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজচিন্তা এবং সাংবিধানিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে আঘাত করল।

বিচারপতি বি. ভি. নাগরত্না যেভাবে বললেন, “ভারতের শক্তি তার বৈচিত্র্য ও বহুত্বে”, সেটি নিছক সৌজন্যমূলক মন্তব্য নয়। বরং বর্তমান ভারতের ক্রমবর্ধমান মেরুকৃত আবহে এই পর্যবেক্ষণ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গত এক দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংবিধানিক অধিকারের সংঘাত বারবার সামনে এসেছে। কখনও হিজাব, কখনও সবরিমালা, কখনও মসজিদ-মন্দির, কখনও ব্যক্তিগত আইন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠেছে- রাষ্ট্রের সীমা কোথায়? আদালতের সীমা কোথায়? আর ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানাই বা কোথায়? সুপ্রিম কোর্ট কার্যত সেই সূক্ষ্ম সীমারেখাটিই নির্ধারণ করতে চাইছে।

ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু ভারতীয় সমাজ ধর্মশূন্য নয়। এখানেই ভারতের জটিলতা। ইউরোপের বহু দেশের মতো এখানে ধর্ম ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে ধর্ম, আচার, সংস্কার, উৎসব, বিশ্বাস এমনভাবে মিশে রয়েছে যে, সেগুলিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে বিচার করা প্রায় অসম্ভব। বিচারপতি নাগরত্নার বক্তব্যের মূল সুরও সেখানেই- আদালত যদি প্রতিটি ধর্মীয় আচারে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে, তাহলে একসময় আদালতই হয়ে উঠবে ধর্মীয় সংস্কারের প্রধান মঞ্চ। আর তখন সাংবিধানিক আদালতের উপর এমন চাপ তৈরি হবে, যার পরিণতি সুদূরপ্রসারী।

এই আশঙ্কা অমূলক নয়। কারণ, ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। মন্দিরে কে ঢুকবেন, কে ঢুকবেন না; ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত কতটা বৈধ; সমাজচ্যুতি বা বহিষ্কার কি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী- এই সমস্ত প্রশ্ন আদালতের সামনে ক্রমাগত আসছে। অর্থাৎ আদালত শুধু আইন ব্যাখ্যা করছে না, ধীরে ধীরে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে বাধ্য হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। সংবিধান কি ধর্মীয় প্রথার উপরে? নাকি ধর্মীয় স্বাধীনতারও একটি স্বশাসিত পরিসর রয়েছে? প্রবীণ আইনজীবী রাজু রামচন্দ্রনের বক্তব্য সেই কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ভারত একটি সভ্যতা হলেও সেটি “সংবিধান দ্বারা শাসিত সভ্যতা”। অর্থাৎ কোনও ধর্মীয় প্রথা যদি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে আদালত নীরব থাকতে পারে না। এই যুক্তিও সমানভাবে শক্তিশালী। কারণ, সমাজচ্যুতি বা একঘরে করে দেওয়ার মতো প্রথা শুধু ধর্মীয় শাস্তি নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যক্তির সামাজিক মৃত্যু ডেকে আনে। চাকরি হারানো, বিবাহ ভেঙে যাওয়া, সামাজিক বয়কট, এমনকী মৃত্যুর পর ধর্মীয় সৎকার থেকেও বঞ্চিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, কোনও সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসনের নামে ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার কতদূর পর্যন্ত বিসর্জন দেওয়া যায়?

ভারতের বিচারব্যবস্থা এই দুই মেরুর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা, অন্যদিকে মৌলিক অধিকার। একদিকে সভ্যতার ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে আধুনিক সাংবিধানিক মূল্যবোধ। এই সংঘাত নতুন নয়। সতীদাহ প্রথা, অস্পৃশ্যতা, ত্রিপল তালাক- প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয় সমাজকে একই দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সবরিমালা বা দাউদি বোহরা মামলা আরও জটিল। কারণ, এখানে আদালতকে শুধু একটি প্রথার বৈধতা বিচার করতে হচ্ছে না, বরং নির্ধারণ করতে হচ্ছে ধর্মীয় বিষয়ে বিচার বিভাগের সীমা কতটা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সুপ্রিম কোর্ট নিজেও এই সীমা নিয়ে সতর্ক। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আদালত কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে বসেনি। বরং তারা বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। অর্থাৎ আদালতও বুঝতে পারছে, এই রায়ের অভিঘাত শুধু সবরিমালা বা দাউদি বোহরাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে দেশের অসংখ্য ধর্মীয় বিতর্কে এই রায় নজির হয়ে দাঁড়াবে।

আর সেখানেই ভারতের গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।কারণ, ভারতকে শুধু আইন দিয়ে চালানো যায় না, আবার শুধুই বিশ্বাস দিয়েও চালানো যায় না। এই দেশ টিকে আছে দুইয়ের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর। আদালতের সামনে এখন সেই ভারসাম্য রক্ষার কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনও দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাবে না, যাতে রাষ্ট্র বা আদালত ধর্মীয় জীবনের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।

ভারতের শক্তি তার বৈচিত্র্যে- এই মন্তব্য নিছক কাব্যিক শোনালেও বাস্তবে সেটাই ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সত্য। কারণ, এই বহুত্বই ভারতকে সভ্যতা করেছে। কিন্তু সেই বহুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রয়োজন সংবিধানের ন্যায়বোধ। আর সেই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করাই এখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

Dainik Digital: