কলকাতা, ২২ জুলাই– বিধানসভার অধিবেশনে বক্তৃতা রাখতে গিয়ে এবার নজিরবিহীনভাবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আক্রমণ শানালেন শুভেন্দু অধিকারী। নারী নিরাপত্তা থেকে শুরু দুর্নীতির মতো একের পর এক ইস্যুকে সামনে রেখে লাগাতার আক্রমণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর একের পর এক মন্তব্যকে সামনে রেখে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘কামদুনিকে আপনারা ‘ছোট্ট ঘটনা’ বলেছিলেন। বারাসত প্রসঙ্গে মন্তব্য ছিল—‘শরীর থাকলে যেমন শরীর খারাপ হয়, তেমনই একটু-আধটু রেপ-টেপ হয়’! ময়নাগুড়ির ঘটনাকে ‘লাভ অ্যাফেয়ার’ আখ্যা দিয়েছিলেন। আর আরজি করের ক্ষেত্রে বলেছিলেন, ‘ওর বাবা-মা চাইলে ১০ লাখ দিতে পারি’। আগের সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে নারী নিরাপত্তা নিয়ে এসব কথা তো আমরা শুনেছি!’ আর জি কর মামলা প্রসঙ্গেও বিষ্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন শুভেন্দু। তার মন্তব্য, ‘আমার কাছে স্পষ্ট প্রমাণ আছে, আগের মুখ্যমন্ত্রী এক বছর ধরে আরজি করের ফাইল চেপে রেখেছিলেন। আর আমি ক্ষমতায় আসার পর এক সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়েছি। সন্দীপ ঘোষ বা বিরূপাক্ষদের বিরুদ্ধে আমরাই কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি।’ সিপিএম ও তৃণমূলকে একযোগে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সিপিএম চৌত্রিশ বছরে রাজনৈতিক দুর্নীতি করেছে, আর আপনি চালিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। যে সব দাবি আর প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে আপনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তার একটার বাস্তবায়নও করেননি। এই ভাইপো-পন্থী তৃণমূলের নাম-নিশানা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমরা তুলে দেব।’
বিড়লা তারামন্ডলের সামনে ক্যাথিড্রাল রোডে একুশে জুলাইয়ের সমাবেশ থেকে বর্তমান বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আক্রমণের জবাবে আজ শুভেন্দু বলেন, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে অনেক কথা বলেছেন। আমি বলছি, বেঁচে থাকতে থাকতেই দেখে যাবেন যে আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত চোর। ভাবছেন ছাড় পেয়ে যাবেন? সমস্ত এফআরটি-র পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্তদন্ত হবে।’ এখানেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘মিত্র ইনস্টিটিউশনের চারটে বুথেই তো হেরেছেন। নিজের বাড়ির কাজের লোক চোখ মেরে আমাকেই ভোট দিয়েছেন বলে গিয়েছেন। অথচ এখানে দাঁড়িয়ে আপনি আমাকে বলতেন, আমি নাকি নিজের ওয়ার্ডে জিততে পারি না। ভগবানের এমন মার যে, নিজের ওয়ার্ডেই চার হাজার ভোটে হেরে বসে আছেন। যত মুখ বন্ধ রাখবেন, ততই আপনার মঙ্গল। যত দাঙ্গা বাঁধিয়েছেন, তার জন্য কোনও সনাতনী আপনাকে কোনওদিন ক্ষমা করবে না।’ তৃণমূলনেত্রী বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলকে কটাক্ষ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আপনি একসময় জননেত্রী ছিলেন, আপনার মাথায় অটলজীর আশীর্বাদ ছিল। কিন্তু পরে আপনি দুটো খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি চালিয়েছেন — একদিকে পুলিশ, অন্যদিকে ‘প্যাক প্যাক’ (আইপ্যাক)। এখন এই দুটোর একটাও আপনার পাশে নেই। তাই বলছি, রাজনৈতিকভাবে আপনি আর কোনওদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না। আপনি যা খুশি বলতে পারেন, করতে পারেন; কিন্তু মনে রাখবেন, আইন ভাঙলে আইনের ঊর্ধ্বে আপনি নন।’
আমপান দুর্নীতির ক্যাগ (কম্পট্রলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া) রিপোর্ট শনিবারই বিধানসভায় প্রকাশ করা হবে, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অভিযোগ, ক্যাগ রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করে তার উপর আলোচনা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও আগের সরকার তা প্রকাশ করেনি। এ বার সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হবে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত যত বড় নেতা বা মন্ত্রীই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ করা হবে। বুধবার মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বলেন, ‘ক্যাগ রিপোর্টগুলি এই সদনে পেশ করা, তার উপরে আলোচনা ইত্যাদি বাধ্যতামূলক ছিল। বিগত সরকার তা করেনি। আগামী ২৫ তারিখ ক্যাগের রিপোর্টগুলি পেশ হবেই। পরবর্তী সেশনে আমরা সেই রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা এবং যা সুপারিশ রয়েছে, তার উপর সিদ্ধান্ত নেব। যেখানে যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ থাকবে, আমরা মহামান্য রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করব। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হোন, মন্ত্রী হোন আর যত বড় নেতাই হোন— তার বিরুদ্ধে এফআইআর করার জন্য আমরা রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করব।’