কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৬ – সাফল্য, ব্যর্থতার এক ঝলক

সুদর্শনা চক্রবর্তী

ঠিক কী কারণে ভারতীয়দের মনে থেকে যাওয়া উচিৎ ২০২৬-এর কান চলচ্চিত্র উৎসব? না, রেড কার্পেট-এ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের ফ্যাশন-এর তুলকালামের জন্য নয়। কান শুধুমাত্র রেড কার্পেট-এ ফ্যাশনিস্তাদের শরীরী হিল্লোল দেখার জায়গা নয়। বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র উৎসবগুলির মধ্যে একটি, যা গত কয়েক বছরে মূলত ভারতীয়রা বিভিন্ন ব্র্যান্ড-এর দূত হিসাবে উপস্থিত হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের, বিশেষ করে, নতুন প্রজন্মের সিনেমা নির্মাতাদের মাধ্যমে যে ধরনের পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে তা অনেকাংশেই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে ক্যামেরার ঝলকানিতে আর সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্র্যান্ড প্রমোশন-এ। ঠিক তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে কারণেই চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ভারত তো বটেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাপ্তি ২০২৬ কান চলচ্চিত্র উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে থাকবে।
কান-এর সম্মানীয় জুরি পায়েল কাপাডিয়া
চলচ্চিত্র নির্মাতা পায়েল কাপাডিয়া কান-এর অত্যন্ত সম্মানীয় ক্রিটিকস উইক বিভাগে জুরি বিভাগের প্রেসিডেন্ট হিসাবে মনোনীত হয়েছিল। কাপাডিয়া-র ‘অল উই ইম্যাজিন অ্যাজ লাইট’ সিনেমাটি বিশ্বমঞ্চে বিশেষভাবে পুরষ্কৃত ও সম্মানিত হওয়ার পর, বিশ্ব সিনেমার মঞ্চে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি আরোও দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে কান উৎসবে নতুন ও প্রতিভাশালী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সিনেমা প্রদর্শনের এই বিভাগে পায়েল কাপাডিয়ার জুরি বিভাগের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব লাভ ও সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্পক্ষেত্রের শিল্পীদের সঙ্গে ক্রিটিকস’ উইক বিভাগের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন, তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের দক্ষতার উপরে বিশ্ব সিনেমার জগতের আস্থার কথাই সামনে নিয়ে আসে। উল্লেখ করা যেতে পারে ২০২৫-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জুরি বিভাগের অন্যতম জুরি সদস্য হিসাবে মনোনীত হয়েছিলেন। পরপর দু’বছর তাঁর এই সম্মান নিঃসন্দেহে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে থাকবে।
ফিরে এল আম্মা আরিয়ান, ফিরলেন জন
ভারতের যুগান্তকারী ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র নির্দেশক জন আব্রাহাম। তাঁর সিনেমা শুধু সিনেমা শিক্ষার্থীদের নয়, সিনেমার দর্শকদের জন্যও এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। জন আব্রাহাম-এর সিনেমা শিল্প হিসাবে সিনেমা কতটা প্রগতিশীল, আধুনিক ও বৈপ্লবিক হতে পারে, সিনেমার নন্দনতত্ত্ব অনুসরণ করে তার এক পাঠ হয়ে রয়েছে। ভাবনার গভীরতা, সিনেমার ইমেজারি, রাজনৈতিক আবহ, ক্যামেরার ব্যবহার, সম্পাদনা এই সব মিলিয়ে জন আব্রাহাম ভারতীয় বিকল্প ধারার সিনেমার পথিকৃৎ। ভারতীয় দর্শকদের কাছে, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে ২০২৬-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে জন-এর অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র আম্মা আরিয়ান-এর রেস্টোর্ড ভার্শন-এর প্রদর্শন। শিবরাজ দুঙ্গারপুর-এর তত্ত্ববধানে ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এই রেস্টোরেশন-এর কাজ করেছে। এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ বিভাগ কান ক্লাসিক সেকশন-এ এই সিনেমাটি দেখানো হয়। দর্শক, সমালোচক, সিনেমা বিশেষজ্ঞদের ভূয়সী প্রশংসা ও মুগ্ধতায় আরো একবার প্রমাণিত হয় যে, অন্য ধারার সিনেমায় ভারতীয় সিনেমা অতীতেও পথিকৃত ছিল এবং কান-এর মতো বিশ্বমঞ্চে প্রযুক্তির সহায়তায় তা আবারোও ফিরে আসতে পারছে। তৈরি হওয়ার ৪০ বছর পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই প্রদর্শনে আম্মা আরিয়ান-এর মূল সদস্যদের মধ্যে উৎসবে হাজির থাকতে পেরেছিলেন মুখ্য অভিনেতা জন ম্যাথিউ ও সম্পাদক বীনা পল।
কান-এ ইতিহাস নেপালি সিনেমার
৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইতিহাস তৈরি করল নেপালি সিনেমা ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অবিনাশ বিক্রম শাহ-র এই সিনেমাটি এবার আন সার-টান রুহ-গার বিভাগে সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতে নিয়েছে প্রথম নেপালি সিনেমা হিসাবে ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’। প্রান্তিক কিন্নর সম্প্রদায়ের এক মানুষ ও তাঁর মেয়ের হারিয়ে যাওয়া ও তার পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়েই আবর্তিত হয়েছে এই সিনেমা। কেন এই সিনেমাটি উল্লেখযোগ্য? কারণ এটি যে শুধু পরিচালকের প্রথম সিনেমা তাই নয়, এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন নেপালের ক্যুইয়ার ও প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচতি গোষ্ঠীর মানুষেরা। রূপান্তরকামী মানুষদের জীবন ঘিরে তৈরি হওয়া এই সিনেমাটি নেপালের এক অন্য চিত্র হাজির করে সামনে। পুরস্কার প্রদান মঞ্চে অবিনাশ বলেন অদৃশ্য জীবনগুলিতে আলো জ্বালার ক্ষমতা রাখে সিনেমা।
রেড কার্পেট, ফ্যাশন বিপর্যয়, কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের ভিড়
কিছুটা অনভিপ্রেতভাবেই ভারতীয়রা এক অন্য ক্ষেত্রে নজর কাড়লেন। তা হল রেড কার্পেট। মেট গালা ও কান চলচ্চিত্র উৎসবের মধ্যে পার্থক্য করতে যেন ভুলে গেছিলেন ভারতীয় সেলিব্রিটিরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বহুজাতিক ফ্যাশন কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হয়ে উপস্থিত হলেও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে উপেক্ষিত থাকতে দেখা গেল প্রথম সারির বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভাটকে। তাঁর স্টাইল স্টেটমেন্টও বিশেষ দাগ কাটতে পারেনি এবং নিজের পোশাক নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাবও দৃষ্টি এড়ায়নি। অন্যদিকে অদিতি রাও হায়দারি, হুমা কুরেশিরা একই সূত্রে কান-এ হাজির হয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও অফিশিয়ালি নির্দিষ্ট মিডিয়া হাউজের ব্যানারে যত প্রচার করেছেন, গ্ল্যামার বা ফ্যাশন স্টেট্মেন্ট-এ তাঁর এক শতাংশও তৈরি করতে পারেননি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ও কান রেড কার্পেটে।
অন্যদিকে উর্বশী রাউটেলা থেকে নিরঞ্জন মন্ডল – দেশের বিভিন্ন রাজ্যের কন্টেন্ট ক্রিয়েটার-রা হাজির হয়ে পড়েছিলেন এ বছরের কান-এ। উদ্দেশ্য-বিধেয় কিছুই যদিও আঁচ করা যায়নি। টিকিট কেটে এই কার্পেটে হাঁটার সুযোগ পাওয়া গেলেও কীভাবে তা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আদৌও কোনোও ছাপ ফেলতে পারছে কি না, তা অবশ্যই দেখার বিষয়। দুর্ভাগ্যবশত, কোনোও ক্রিয়েটারই তা করতে সক্ষম তো হননিই, উপরন্তু তাঁদের ফ্যাশন যথেষ্ঠ প্রশ্ন তুলে দেয়। নিজের রাজ্য তথা নিজের দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য অতি-নাটকীয়, উগ্র, প্রবল জাঁকজমকপূর্ণ যে স্টাইলিং তাঁরা করেছেন তা যে কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে মানানসই নয় তা আগামীতে তাঁরা বুঝবেন বলেই আশা করা যায়।
এলেন, দেখলেন, জয় করলেন – ডিভা ঐশ্বরিয়া
২৪ বছর ধরে একটানা। যে ভারতীয় সেলিব্রিটির অপেক্ষায় থাকে গোটা আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও ফ্যাশন দুনিয়া তিনি এক ও একমাত্র ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। এই বছর বহুজাতিক ফ্যাশন সংস্থার বিলবোর্ডে তাঁর ছবি না থাকায় ও শেষ দিনের আগে পর্যন্ত তাঁর অনুপস্থিতি আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলে দেয়। তাঁকে বাদ দেওয়া হচ্ছে ভেবে নিয়ে তুমুল কথা চলতে থাকে। উৎসবের শেষের ঠিক আগে যখন তাঁকে সকন্যা মুম্বই বিমানবন্দরে দেখা যায়, সকলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। এবং ইংরাজিতে বললে, “হোয়াট অ্যান এন্ট্রি!’ শেষ দিন তিনি হাজির হলেন গভীর নীল গাউনে। স্বল্প আভরণ আর সেই গাউন বুঝিয়ে দিল যাবতীয় বডি শেমিং-কে তিনি হেলায় হারিয়ে যে ডিভা সুলভ ভঙ্গিমায় রেড কার্পেট জিতে নিতে পারেন, যেভাবে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মিডিয়া ও সেলিব্রিটিরা তাঁর এক ঝলকের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন, তা তাঁর অপার্থিব সৌন্দর্য শুধু নয়, তাঁর অপ্রতিদ্বন্দ্বী আত্মবিশ্বাসের ফসল। এরপর পাউডার পিঙ্ক কেপড গাউন, বেইজ রঙের গাউন এবং সাদা ট্রাউজার-স্যুট ও ফার উংইস, ঢেউ তোলা চুল, অতি কম অলঙ্কার ও একেবারে মানানসই প্রসাধনে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন তাঁকে কান রেড কার্পেট-এর ‘কুইন’ বলা হয়। তাঁকে ঘিরে যে জনোচ্ছাস এবং ডিভা-সুল্ভ ভাবমূর্তি, গ্ল্যামার বজায় রেখেও তাঁর যে সুন্দর, সাবলীল, সহজাত, আন্তরিক উপস্থিতি তাই বুঝিয়ে দেয়, কেন তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। বয়স, বদলে যাওয়া বডি ইমেজ, সৌন্দর্যে বয়সোচিত পরিবর্তন – এইসব নিয়েই তিনি ডিভা ছিলেন, আছেন, থাকবেন।

Sumit Chakraborty: