কর্পূর : থ্রিলার, ইতিহাস ও কয়েকটি প্রশ্ন

সব্যসাচী মজুমদার

ঘন বৃষ্টির রাতে কালু, একটা কালো কুকুর, ক্ষিদে পেটে রাস্তা পেরোতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি বারান্দার দিকে। তাকে পাশ কাটিয়ে তখন গাড়ি বারান্দা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে একটি এম্বাসেডর। কালো। রাত তখন এগারোটা। নিশুতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি চলেছেন ইউনিভার্সিটির এক্সাম কন্ট্রোলার মৌসুমী সেন।
দীপান্বিতা রায়ের গল্পের ওপর নির্ভর করে পরিচালক অরিন্দম শীল তৈরি করেছেন একটি আপাদমস্তক থ্রিলার— কর্পূর। থ্রিলারের সঙ্গে সবসময় রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব এবং তার তারতম্য জড়িত থাকে। ‘কর্পূর’ অবশ্য একটি রিয়েল লাইফ গল্পকে পুনর্নির্মাণ করে দেখতে চেয়েছে মানুষের দুর্নীতির বিভিন্ন মাত্রাকে। ফলে তার সঙ্গে রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের প্রত্যক্ষ যোগ থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। এবং এই পুনর্নির্মাণটিতে পরিচালক ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতকে। একটি তুলনামূলক আবহাওয়ায় অরিন্দম নির্মাণ করেছেন সাসপেন্স।
এই ছবিতে সাসপেন্স কিন্তু হলিউড, বলিউড বা দক্ষিণকে পাশ কাটিয়ে গল্প বলার প্রশস্ত এবং নিজস্ব প্রবণতাকে অবলম্বন করে। ফলে, দর্শক কেবল উত্তেজনা বা রোমহর্ষেই আবিষ্ট হন না, বরং একটি নিটোল গল্প দেখতে দেখতেই আবিষ্কার করে ফেলেন অপরাধের বিভিন্ন অন্ধকারকে, গুপ্তকক্ষকে।
মৌসুমী সেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী অথচ যোগ্যতায় দুর্বল পার্টিকর্মী এবং মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী গৃহবধূ। নব্বই দশকে শাসক পার্টির সুনজরে আসার চেষ্টায় সফল হন। সুনজরের ফলাফলবশত পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামকের পদ তার জন্য বরাদ্দ হয়। এবং সেই পদে আসীন হয়ে মৌসুমী বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক বছরের ইতিহাসে সংগঠিত সবচেয়ে বড় আর্থিক দুর্নীতিটি ঘটিয়ে ফেলেন, এক অর্থে শাসক দলের নির্দেশে। প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকার দুর্নীতি। নব্বই দশকের তুলনায় বিশাল অঙ্কের এই দুর্নীতি কুড়ি বছর পর যখন ধূসরতম একটি স্মৃতি, রিয়া তামাং নামক এক তরুণী তা খুঁড়ে বের করে। সাহায্য নেয় উদীয়মান সাংবাদিকের। এই অনুসন্ধানের পথে আমাদের সঙ্গে আলাপ হয় যোগ্যতার অভিশাপে অভিশপ্ত প্রাক্তন পুলিশ অফিসার রাখোহরি গোস্বামীর সঙ্গে। আমাদের আলাপ হয় নিলয় বিশ্বাস, শংকর মল্লিকদের সঙ্গে। অত্যন্ত নিপুণ ফ্ল্যাশব্যাকে বারবার দুটো সময়কে সমান্তরালভাবে চলতে দিয়েছেন অরিন্দম। একটি নব্বই দশক, আরেকটি দু’হাজার পনেরো-পরবর্তী কাল। একটি সময় স্বয়ং ঘটনা। আরেকটি সময় ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে, উন্মোচন করতে উদ্যত। এই দ্বন্দ্ব সিনেমাকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান করে রাখে। দর্শকের অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণের জন্য যথেষ্ট।
রিয়া কীভাবে তার পরিচয় বদলে ফেলে, শংকর আর নিলয়ের টানাপোড়েন দর্শককে শেষ পর্যন্ত বুঝতে দেয় না— অপরাধী আসলে কে? ক্লাইম্যাক্স পর্যন্ত রাইজিং অ্যাকশনকে ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত রিয়া তামাংকে নতুন ভূমিকায় আবিষ্কৃত করে পরিচালক বস্তুত থ্রিলারের যাবতীয় স্বভাবকে যথার্থতা দিলেন না কেবল, উপরন্তু একটি ঐতিহাসিক কলঙ্কের গোপন সন্দেহগুলির নিরসন করতে চাইলেন। মানুষকে কীভাবে অপরাধী করে তুলতে পারে পার্টির রেজিমেন্টেশন— এ সিনেমা তার একটি ঘনিষ্ঠ দলিল তো বটেই।
সাহেব চট্টোপাধ্যায় কখনও হতাশ করেননি। এ সিনেমাতেও বিশ্বাসযোগ্যতায় নির্মাণ করেছেন নিলয় বিশ্বাসকে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অত্যন্ত সাবলীলতায় একজন দায়বদ্ধ অথচ অসহায় অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক তারতম্য ও বিবিধ মাত্রাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এরকম বহু স্তরীয় বিন্যাসে একটি চরিত্র গড়ে তোলার দুরূহ কাজটি ঋতুপর্ণা ইতিপূর্বেও সাফল্যের সঙ্গে করেছেন— বলাই বাহুল্য। রিপোর্টার চরিত্রে আরেকটু স্বচ্ছন্দ হওয়ার সুযোগ কিন্তু পেয়েছিলেন অর্পণ ঘোষাল। তবে সেই খামতি ঢেকে দিয়েছেন রিয়া তামাঙের ভূমিকায় লহমা ভট্টাচার্য। লহমার সহজ, নির্ভার, সতেজ উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এই ছবির লাবণ্য।
ব্রাত্য বসু স্বয়ং একটি ইনস্টিটিউশন। অভিনয়ের ইনস্টিটিউশন। রাখোহরির মতো বিষাদগ্রস্ত, পারদর্শী, মেধাবী নিম্নমধ্যবিত্ত প্রাক্তন পুলিশ ও পার্টটাইম পুরোহিতের চরিত্রটিকে যেন ধীরে ধীরে, স্তরে স্তরে খুলে ধরেছেন দর্শকের সামনে। গোটা ছবিটিকেই যেন পোস্টমর্টেম করে রাখোহরি। পাইস হোটেলে কিংবা গঙ্গার ঘাটের দৃশ্যে কৌতুক, কৌতূহল ও রহস্যকে একসঙ্গে, এক মাত্রায় এনে চরিত্রটি স্বতন্ত্র গমক তৈরি করে দর্শকের যাবতীয় আকর্ষণ কেড়ে নেয় স্বাভাবিকভাবেই। সবমিলিয়ে ব্রাত্য বসু রাখোহরিকে কেবল গল্পের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং অভিনয়ের অন্তর্ঘাত চরিত্রটিকে একই সময়ে একটি সমান্তরাল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেও পেশ করে। আমাদের জন্য আরেকটি আলাদা প্রসঙ্গ, একটি সাবপ্লট তৈরি করে রাখে যেন।
এই সূত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত কুণাল ঘোষ চরিত্রাভিনেতা হিসেবে চমক তৈরি করেছেন— কথাটি বলে রাখা দরকার। একটি রিয়েল লাইফ চরিত্রকে, তার ম্যানারিজম বহন করতে করতে ফুটিয়ে তোলা একটি অত্যন্ত জটিল কাজ। দুরূহ কাজ। কুণালের অভিনয় বুঝতে দেয় না দায়িত্বের ভারকে। বরং আমাদের পরিচিত নব্বই দশকের হাড়হিম করা পরিস্থিতি যেন আবার ফিরে আসতে থাকে। দর্শক যেন সেই পুরোনো দমবন্ধ করা পরিবেশকে মর্মে মর্মে অনুভব করতে থাকে। অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুখেন সেনের ভূমিকায় পরিচালক অরিন্দম শীল নিপুণ ও যথাযথ।
সিনেমাটি টেক্সট-প্রধান। একটি গল্পকে বলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন— পরিচালক থেকে শিশু অভিনেতা পর্যন্ত সঠিকভাবে সেটুকু পালন করেছেন। পরিচালকের নিক্তিবোধের এই পরিচয়টিকে আমরা ধন্যবাদ জানাব। এবং শেষতক গল্পটি বলা হয়ে গেলে আমাদের স্মৃতি যখন আবার আক্রমণ করে বসে আমাদের— বুঝতে পারি ছবিটি তার লক্ষ্য পূরণ করেছে। লক্ষ্য পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে যে ভয়ের বোধ জাগিয়ে তোলা— এটি তার সার্থকতা। রথীজিৎ ভট্টাচার্যের সুর, জয়তী চক্রবর্তীর গান চমৎকার আবহ তৈরি করে।
সমস্ত জটিলতা সেরে যায়। অসুখের অবসান হয়। কুয়াশা-কবলিত অঞ্চলে মিশে যেতে থাকে সুখেন আর মৌসুমী। হুইলচেয়ারে বসে থাকা মৌসুমীকে ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে সুখেন পরিকল্পনা করে ভবিষ্যতের। তখন সন্ধে। কালু ফিরে আসে। আবার পেরিয়ে যেতে থাকে মৌসুমীকে। কেবল এখন কুয়াশা। মৌসুমী-সুখেন মিশে যেতে থাকে কুয়াশায় আর কালুর সিলুয়েট ধীরে ধীরে দখল করে নেয় সমস্ত পর্দা।
সিনেমাটি দেখে আসুন। ইতিহাসের কারণেও দেখাটা জরুরি। ইতিহাস সবসময় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক।

Sumit Chakraborty: