পুস্তক পর্যালোচনা : মহাভারত কালান্তরের পাঠ : নব চিন্তার উন্মেষ

সুস্মিতা দাস
রামায়ণ ও মহাভারতকে আমাদের দেশে ধর্মগ্রন্থ আখ্যা দেওয়া হয়। অতীত থেকে আজ অব্দি ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই রামায়ণ, মহাভারত পঠিত এবং বিশ্লেষিত হয়। ধার্মিক লোকেদের কাছে রামায়ণ, মহাভারতের ঘটনার সত্যতা চন্দ্র সূর্যের উদয়ের মতোই স্পষ্ট। প্রাঞ্জল। মহাভারত সম্বন্ধে একটা কথা প্রচলিত আছে, ভূ-ভারতে এমন কিছু নেই, যার উল্লেখ মহাভারতে নেই। শ্রীমদভাগবতে বর্ণিত শ্লোকগুলো মানুষকে জীবনের পাঠ শেখায়। ধর্মপ্রাণ ভারতবাসীরা রামায়ণ, মহাভারত ও শ্রীমদ্ভাগবতকে লাল শালুতে মুড়ে পুজো করে। রামায়ণ, মহাভারত আমাদের কাছে মহাকাব্যও। এই আখ্যানগুলো আমাদের সাহিত্য-সম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছে। এর সাহিত্য মূল্য অনস্বীকার্য বলেই শিশু-কিশোরদের জন্যও নানাভাবে পরিবেশিত হয়েছে সচিত্র মহাভারত। শিশু-কিশোরদের মনে এই কাহিনিগুলো তাদের কল্পনার আকাশে ডানা মেলে উড়তে শেখায়। তাদের মনোরাজ্যে রাজপুত, রাজকন্যে ও রাক্ষস নানা রঙ ও রূপে প্রকাশ পেত, তাদের মনের রাজ্যে কল্পনার পাখি যেমন ডানা মেলত, তেমনি নানা প্রশ্নও তাদের মনে উঁকি দিত। সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে তাদের শৈশব-কৈশোর ও যৌবনে পদার্পণ করত।

আজকের আলোচ্য ‘মহাভারতের কালান্তরের পাঠ’ বইটির লেখক রাহুল সিনহার মনে তেমনভাবেই জেগে উঠেছিল অসংখ্য প্রশ্ন। সেসব প্রশ্ন মনে গেঁথে রেখেই তিনি পড়তে থাকেন মহাভারতের নানা পাঠ, আলোচনা, আখ্যান বৃত্তান্ত। আর পড়তে পড়তে, জানতে জানতে মনের মধ্যে উত্থিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেয়ে যান। সেসব উত্তরের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেই তাঁর নির্মাণ এই বই; যার মধ্যে বিষয়ীভূত হয়েছে মহাভারত আখ্যানের কিছু ঘটনার এক নবতর বিশ্লেষণ।

এগারটি অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে বইটির বিষয়সূচী। প্রথমেই বইটি কেন লেখা হয়েছে সেই ‘কৈফিয়ৎ ও কবুলনামা’। তারপর প্রতিটি অধ্যায়ে একটি করে সংশয় এবং এই সংশয়ের নিরসনের প্রচেষ্টা। এই বই বা বইয়ের আলোচনা পাঠকের অস্তিত্ত্বে জাগিয়ে তুলতে পারে হাজারো প্রশ্নের। মহাভারতের ঘটনার ঐতিহাসিক অস্তিত্ত্ব বা এর সত্যতা নিয়ে ধারণা এক বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

যেহেতু মহাভারতকে ধর্মগ্রন্থ মানা হয় এবং মহাভারতের বিচ্ছিন্ন অংশ শ্রীমদ্ভাগবতগীতার সঙ্গে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, আবেগ জুড়ে আছে, জীবনের একটা শক্তিশালী আধার হিসেবে; সেখানে মহাভারতের বৃত্ত-বৃত্তান্ত-চরিত্র-ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে এক সাহসী পদক্ষেপ। তবে এক্ষেত্রে একথা বলা যেতেই পারে যে, বিশ্বাসেরও চোখ আছে, সেই চোখ দিয়েই না-হয় আমরা দেখবো। ‘মহাভারত কালান্তরের পাঠ’-এ বিধৃত উত্তর-বিশ্বাসকে।

বইটির ভূমিকায় লেখক, আলোচক শুভাশিস তলাপাত্র বলেছেন, ‘এই বহুশ্রোতা মহাকাব্যটির নির্যাস গড়ে তোলা খুবই দুরূহ। তবে একথা আমরা বলতেই পারি যে, সোজাসাপ্টা নৈতিকতার কালো-শাদা বর্গ মহাভারতেই ছেড়ে প্রথম দেখি মানব ও সমগ্রভাবে সমাজজীবনকে গহন থেকে অনুভব করার প্রয়াস। এর জন্য কখনো সখনো এই মহাকাব্যে অন্ধকারের দিকটি অধিকতর স্পষ্ট। বিপ্রতীপের এমন ব্যবহার শুধু আধুনিক জনই করতে পারে। এই মননে শেষ পর্যন্ত পাঠক পেয়ে যান মানব চরিত্রের গভীর অন্তরবলোকন। ‘ন্যায়’ পরায়ণ জীবনের জন্য দ্বন্দ্বদীর্ণ পরিক্রমা আধুনিক মনকে মবতর ব্যাখ্যার জন্য প্রণোদিত করবে, এটাই স্বাভাবিক।’

দশটি অধ্যায়ের শিরোনাম পাঠককে অধ্যায়ের ভেতরের বক্তব্য সম্পর্কে অবহিত করে।

এই অধ্যায় সমাবেশের মধ্যে জিজ্ঞাসাগুলো আমাকে চমকিত ও বিস্মিত করেছে তার কিছু তুলে ধরছি। ‘কুরু-পান্ডব, কুরু-পাঞ্চাল যুদ্ধ?’ নামাঙ্কিত অধ্যায়ে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পেছনে যে কারণ নিহিত আছে তা কৌরব-পান্ডব বৈরিতা নয়, বরঞ্চ তার চেয়ে বেশি তা কুরু ও পাঞ্চালদের বংশানুক্রমিক শত্রুতা। যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কৌরব এবং পাঞ্চালরাই সর্বস্বান্ত হলেন। অক্ষত রইলেন পান্ডব। এই যুদ্ধের লক্ষ্য কি তবে কৌরব ও পান্ডব? না কৌরব ও পাঞ্চাল? সন্দেহের স্বপক্ষে যুক্তি শানিত করেছেন লেখক।

‘মহাকাব্যে উপেক্ষিত’ পরিচ্ছদে দ্বিতীয় পান্ডব ও হিরিম্বার পুত্র ঘটোৎকচের কথা বলা হয়েছে যার জন্মই বোধহয় পান্ডবদের সাহায্য করার জন্য হয়েছে। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে অসীম বীরত্ব প্রদানের পর যার মৃত্যু ঘটে কর্ণের প্রেরিত একাঘ্নী বাণে, যে বাণ অর্জুনকে বধ করার জন্য সযত্নে রক্ষিত করে রেখেছিলেন কর্ণ। তাই ঘটোৎকচ হত্যার পর, আমরা দেখি কৃষ্ণের হর্সোল্লাস। এই পুরস্কারই কি ঘটোৎকচের প্রাপ্য ছিল? লেখক বলছেন, ‘যুদ্ধে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে মৃত্যুর পরেও কৃষ্ণ তাঁর নামে ব্রাহ্মণদ্বেষী যজ্ঞদ্বেষী ধর্মনাশক বলে কালিমা লেপন করেছেন। অনার্য ঘটোৎকচ তাই কেবলই ব্যবহৃত হয়েছেন। ব্যবহারের পরে অনাদৃত আর উপেক্ষিতই থেকে গেছেন ব্যাসের মহাকাব্যে।’ এই মনোভাবেরই পুনরাবৃত্তি ঘটে ‘জতুগৃহ এক পরিকল্পিত নিষাদ হত্যা’ এবং ‘একলব্য: এখনও নিষাদ’ পরিচ্ছদ দুটোতে, আর্য ও অনার্য সম্পর্কের এক চিরাচরিত সংবাদ আমরা পাই। সমাজের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত আর্য সম্প্রদায়, অরণ্যাচারী, শূদ্র অনার্য বা নিষাদকে কখনো মানুষ বলেই গণ্য করেনি। তাই নিজের স্বার্থে, পরিকল্পনামাফিক অনার্য জীবনকে হত্যা বা ধ্বংস করতে তাদের বিবেক বিন্দুমাত্র কাঁপেনি। তেমনি ‘একলব্য: এখনও নিষাদ’-এ অনার্য একলব্যকে শিক্ষা না দিয়ে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তার জীবনের শেষ্ঠ সম্পদ তার বুড়ো আঙ্গুল কেটে নিয়ে তিলমাত্র বিবেকের দংশন অনুভূত হয়নি দ্রোণাচার্যের। আর তা কেন করেছেন তিনি? না তার প্রিয় শিষ্য ক্ষত্রিয় অর্জুনকে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর উপাধিতে ভূষিত করার জন্যে।

‘খান্ডবদহন: আর্য সম্প্রসারণের জন্য এক গণহত্যা’ অধ্যায়েও আর্য ও অনার্য সংবাদ পাই আমরা। মহাভারতের আখ্যানের সময়কালকে যদি আমরা বিচার করি, তাহলে দেখবো এটা এমন এক সময়ের কাহিনি যখন সমাজব্যবস্থায় ধরে পড়েছিল জাতপাত, শূদ্র বা অনার্যদের প্রতি বঞ্চনা, আর্যদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি আর্যদের বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজন নতুন নতুন জনপদ; সেইরকমই এক পরিস্থিতিতে খান্ডবদহন, এক দখলদারির ঘটনা।

‘এখানে একটা বিষয় বুঝে নেওয়া ভালো যে রামায়ণ, মহাভারত কিংবা তারও আগের বৈদিক সাহিত্যে যাদের দানব, রাক্ষস বা নাগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা মনুষ্য সমাজের বাইরের কোন জীব নয়। এরা মূলত অনার্য, ভারতের আদি আদিবাসী। আর্যদের ভারতে আসার আগে এরাই সিন্ধু উপত্যকায় সমৃদ্ধ নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন।’ আর্যদের কাছে এই অসুর নাম্নী অনার্যদের সমূলে বিনাশ করা আর্যদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

‘যাদবদের বড় অংশকে এবং পান্ডবদের নিজের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথের অনুসারী করার পর তিনি গোটা ভারতেই এই ‘ধর্মবিজয়’ চাইছিলেন। কার সম্বন্ধে এই উক্তি? মহাভারত মহাকাহিনির অন্যতম নায়ক কৃষ্ণ, যার কূটনৈতিক বুদ্ধিতে চালিত হয়েছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। ‘ভারতযুদ্ধ কৃষ্ণ ও এক উচ্চকাঙ্ক্ষী স্বপ্নের অপমৃত্যু’ পরিচ্ছদে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের পেছনের আসল উদ্দেশ্য কৃষ্ণের উচ্চাকঙ্ক্ষা। কি সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা? লেখক বলছেন, ‘কৃষ্ণ নিজে চক্রবর্তী সম্রাট হয়ে বসতে চাননি। চেয়েছেন সিংহাসনের নেপথ্যে থেকেও সমগ্র ভারত জুড়ে এক অপ্রতিহত রাজনৈতিক আধিপত্য ও কর্তৃত্ব।’ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ফলস্বরূপ কৃষ্ণ যে আসমুদ্রহিমাচল রাজনৈতিক মর্যাদা লাভ করেছিলেন, শেষ অব্দি তা তিনি বজায় রাখতে পারলেন না; সব জয়ের অধিকারী হয়েও নিজের বংশরক্ষায় অপারগ কৃষ্ণ মৃত্যুবরণ করলেন নিঃসঙ্গ একাকী অসহায়ের মত।

মহাভারতের এই ট্র্যাজিক পরিণতির পেছনে হাজারো প্রশ্নের উত্থাপন করেছেন লেখক যা পাঠককে এক নতুন দিগন্তের দিকে নিয়ে যায়। পাঠকের বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে তার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছেন শেষপর্যন্ত।

বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ইমানুল হক্। লেখক রাহুল সিনহার ভাবনার সফল প্রয়াস ‘মহাভারত কালান্তরের পাঠ’ পাঠকের দরবারে আদৃত হোক।

মহাভারত কালান্তরের পাঠ
রাহুল সিনহা
অক্ষর পাবলিকেশানস্
মূল্য ২০০ টাকা

Sumit Chakraborty: