মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্যে বাংলাদেশের রাজনীতি সরগরম। সেই দেশের এক যুবনেতা হাদি হত্যা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে কী কথাবার্তা তাঁর হয়েছিল, এই নিয়ে মমতার বক্তব্যে বাংলাদেশের পথে আবার মিছিল নেমেছে। স্লোগান উঠেছে,- নাম বল মমতা/ জানতে চায় জনতা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনে হারের পর তাঁর প্রথম প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে এই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন। নির্বাচনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দল বিজেপির কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর বিক্ষোভসভায় দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণে নেমে হাদি হত্যার প্রসঙ্গ আনেন। যদিও বিষয়টি ছিল দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যেকার একটি গোপন বিষয়, যা সরাসরি কূটনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
মমতা যা বলেছেন, তার সার হল, সেই সময়ে বাংলাদেশ হাদি হত্যার খুনিকে গ্রেফতার করেছিল পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনী। ওই খুনি মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার পর গ্রেফতার হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনায় তাঁকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন, গ্রেফতারের খবর যেন প্রকাশ না হয়, এই বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেহেতু একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তাই তিনি নিজেও এই নিয়ে এতদিন কোনও কথা বলেননি। আজ দায়িত্ব হারিয়ে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দলের কাছে পরাজিত হয়েই যে পুরোনো কথা প্রকাশ্যে আনলেন এবং গোপন সব কথা ফাঁস করার হুমকি দিলেন, তা কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন। বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরে একটি রাজনৈতিক সাধারণ ঝগড়া হলেও দেশের বাইরে এক স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ এবার মমতার মুখ থেকে হত্যাকারীর নাম জানতে চাইছেন। তাঁরা হত্যাকারীর নাম জানার জন্য দেশের সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবেন, এটি স্বাভাবিক বিষয়।
এতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চাপ বাড়তে পারে নয়াদিল্লির ওপর। এতে প্রশ্ন আসবে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় থাকা একজন মুখ্যমন্ত্রী কি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছাপিয়ে দেশের ভেতরকার সংসদীয় রাজনীতির তরজা গানের আসরে আন্তর্জাতিক বা কূটনৈতিক বিষয়কেও টেনে আনতে পারেন? এটি দেশের জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর? প্রসঙ্গত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শিলিগুড়ি সাইবার থানায় ইতিমধ্যেই লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এতে অন্যান্য অভিযোগের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারত সরকারকে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। এক আইনজীবী বৃহস্পতিবার এ অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, জনসমক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু বক্তব্য দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার জন্য উসকানিমূলক ও মানহানিকর।
অভিযোগে অন্য যে বিষয়গুলি আনা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে,-সম্প্রতি বিভিন্ন জনসভা, রাজনৈতিক মঞ্চ ও সংবাদমাধ্যমে নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী-সহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সততা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস ও অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। গত ২ জুন রাজনৈতিক মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাদি হত্যা-সংক্রান্ত বক্তব্যের উল্লেখ করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান অভিযোগকারী। তাতে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার মমতা দাবি করেছেন, ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত গোপনীয় আলাপ-আলোচনা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সরকার ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে নানা অভিযোগ তোলেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুন্ন করার এবং দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে বৈরী মনোভাব সৃষ্টির স্পষ্ট উদ্দেশ্যে জনসমক্ষে ও সংবাদমাধ্যমের সামনে এ ধরনের অভিযোগ তিনি এনেছেন।
প্রসঙ্গত, এক সপ্তাহ আগেও মমতার বিরুদ্ধে একটি এফআইআর করা হয়েছে। এতে গত বছর কলকাতায় এক ইদ উৎসবে সনাতন ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য সনাতন ধর্মের অনুসারীদের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করেছে। সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ধরছে মামলা, হাদি হত্যা এই ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে চলেছে হয়তো।