রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকার সুরক্ষা আইনের সংশোধনের ফলে নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি দেশজুড়ে

কলকাতার রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতিবাদ

সুদর্শনা চক্রবর্তী

সম্প্রতি দেশে চালু হয়েছে ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬। সংসদের উভয় কক্ষে প্রস্তাবিত বিল পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি এই বিলে স্বাক্ষর করার পরই তা আইনে পরিণত হল। ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের যে অধিকার সুরক্ষা আইন ইতিমধ্যেই ছিল, তার মধ্যে এই নতুন আইন করে সংশোধনী আনার ফলে বিপদে পড়তে চলেছেন সারা দেশের প্রান্তিক লিঙ্গ পরিচিতির এক বড় অংশের মানুষ। সামাজিকভাবে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় বৈষম্যের মধ্যে দিয়ে চলেছে এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জীবিকার ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত থাকছেন দশকের পর দশক, পারিবারিক ও সামাজিক হিংসার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত যাদের, তাদের জন্য এই নতুন আইন তাদের চলমান অধিকার আন্দোলনে আবার এক মাত্রা যোগ করতে চলেছে।


এই আইনে রয়েছে এমন বেশ কিছু উল্লিখিত বিষয়, যা রূপান্তরকামী মানুষদের চরম দুশ্চিন্তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হল, লিঙ্গ পরিচিতি স্ব-নির্ধারণের অধিকার আর থাকছে না রূপান্তরকামী মানুষদের। এর ফলে জন্মগত লিঙ্গচিহ্ন নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও নিজের লিঙ্গ পরিচিতি নিজেই নির্ধারণ করার যে অধিকার রূপান্তরকামী মানুষদের এতদিন আইনিভাবেই ছিল, তা আর থাকছে না। এর ফলে অস্ত্রোপচার না করেও যে মানুষেরা নিজেদের রূপান্তরকামী হিসাবে লিঙ্গ পরিচিতি নির্ধারণ করতেন, তারা সেই অধিকার হারাতে চলেছেন। মনে রাখা দরকার, সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে বহু রূপান্তরকামী মানুষ অস্ত্রোপচার করান না, অথবা স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নেন। লিঙ্গ-পরিচিতি স্ব-নির্ধারণের অধিকার চলে যাওয়া এক্ষেত্রে তাদের কাছে অস্তিত্ব চলে যাওয়া।
লিঙ্গ পরিচিতি স্ব-নির্ধারণের অধিকার চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে পড়তে চলেছেন বলে মনে করছেন রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এই অধিকারের বলেই তারা পরিবারে, সমাজে নিজেদের যাবতীয় আইনি অধিকারের দাবি জানাতে পারতেন। কিন্তু এই অধিকার চলে যাওয়ায় এখন তারা নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়েই সবচেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। যে সমাজে এখনও ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির মানুষদের নিজেদের বেছে নেওয়া জীবন বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেখানে এই স্ব-নির্ধারণের অধিকার চলে যাওয়া তাদের নতুন করে বিপদের মুখে ফেলতে চলেছে বলেই তারা আশঙ্কা করছেন। বিশেষত মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে নিজেদের লিঙ্গ পরিচিতির প্রমাণ দেওয়ার যে অপমানজনক ও হীনমন্যতার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, তাই তাদের নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলছে।

এই আইনে নতুন করে বলা হচ্ছে যে একটি সুনির্দিষ্ট মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে পরীক্ষার ফলে যখন বোঝা যাবে, বা বলা যায়, সেই বোর্ড যখন সন্তুষ্ট হবে, রূপান্তরকামী পরিচিতি নিয়ে তখনই তারা সার্টিফিকেট দেবে এবং তারপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে সেই সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। একবার ভেবে দেখা প্রয়োজন, কোনো নারী বা পুরুষকে এই পরিচিতি নির্ধারণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। সেক্ষেত্রে রূপান্তরকামী মানুষদের এই যে পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে এবং তাতে পাশ না করলে তাদের যে পুরো অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে, এই বোধই তাদের আরও বেশি করে যেন মর্যাদাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হচ্ছেন সারা দেশের রূপান্তরকামী মানুষেরা।
এখানে আরও যে বিষয়টি দেখার তা হল, রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের যে মানুষেরা ইতিমধ্যেই রূপান্তরকামী পরিচয়পত্র বহন করছেন, তাদের এই পরিচয়পত্র আর বৈধ থাকবে কি না, যারা এই পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে শিক্ষাক্ষেত্রে বা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতায় জায়গা পেয়েছেন, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল কি না, তার উত্তর অজানা। উত্তর অজানা থাকার কারণেই এক ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চাকরি হারানোর ভয়, যে আত্মপরিচিতি বহু বছরের লড়াই ও বর্তমানেও নানা ঝঞ্ঝার মধ্যে দিয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে এবং যা বজায় রাখার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, রাষ্ট্র যে পরিচিতিতে আইনি শিলমোহর দিয়েছিল এবং যে পরিচয়পত্র স্ব-নির্ধারিত পরিচিতিকে বৈধতা দিয়েছিল, বর্তমানে সংশোধিত আইন তাকেই বাতিল করে দিচ্ছে কি না— দিলে ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করে রয়েছে— এই সব কিছু ঘিরেই চরম দুশ্চিন্তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।


অপর যে বিষয়টি ঘিরে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তা হল, এই আইনে রূপান্তরকামী পুরুষদের বিষয়ে কোনো কথাই বলা হয়নি। ফলত, তারা আর আদৌ রূপান্তরকামী মানুষ হিসাবে গণ্য হবেন কি না, তা নিয়ে এক সঙ্কটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে বহু কাজের জায়গাতেই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রূপান্তরকামী পুরুষদের কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ করা হয়, কিন্তু এই আইনে রূপান্তরকামী পুরুষদের সম্পূর্ণ অনুল্লেখ তাদের জীবন ও জীবিকার সামনেই প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিচ্ছে। দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ-আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেখানে এই রূপান্তরকামী মানুষেরা কী পরিস্থিতিতে থাকবেন তা নিয়ে চূড়ান্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের জায়গা তৈরি হয়েছে। যারা হরমোন থেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে রূপান্তরকামী পুরুষ পরিচিতি হিসাবে স্ব-নির্ধারণ করেছেন, এমনকি আইনিভাবে নাম পরিবর্তন করে নিয়েছেন, তাদের প্রশ্ন— যে জীবন ছেড়ে তারা নিজেদের পরিচয়ের জীবন বেছে নিয়েছেন, আইন সংশোধনের ফলে তাদের যদি আবার পুরোনো পরিচিতিতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়, তা তো একপ্রকার অসম্ভব। এমনিতেও আইনিভাবে একবারই লিঙ্গ পরিবর্তন করা যায়, তাই দ্বিতীয়বার তা কীভাবে তারা করবেন, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের জন্মসূত্রে পাওয়া শরীরে তারা যে লিঙ্গ পরিচিতি মেনে নিতে না পেরে নিজেদের মন-মস্তিষ্কে যে লিঙ্গ-পরিচিতি রয়েছে তা বেছে নেন, তা বর্জন করে আবার পুরোনো পরিচিতিতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব কাজ।


এই প্রেক্ষিতেই বলা প্রয়োজন, নতুন সংশোধনী আইন অনুযায়ী রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মানুষদের সংজ্ঞার মধ্যে রাখা হচ্ছে নির্দিষ্ট সামাজিক-সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীকে, যার মধ্যে পড়ছে— কিন্নর, হিজড়া, ইউনাক, আরাভানি, যোগতা। এই গোষ্ঠীগুলি মূলত ঘরানা হিসাবে বা অনেক ক্ষেত্রে পেশা হিসাবে পরিচিত। বহু মানুষ যেমন এই ঘরানাগুলির অন্তর্ভুক্ত হন, তেমনি আবার অনেকেই এর বাইরেই থাকেন। এবং সেই সংখ্যাটি এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেকটাই। ফলে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বাদ দিয়ে দেওয়া অগণতান্ত্রিক। তাছাড়া এখানে নির্দিষ্ট ৫টি ইন্টারসেক্স ভ্যারিয়েশন আছে এমন ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বাদ দেওয়া হচ্ছে রূপান্তরকামী পুরুষ ও নারীদের, অস্ত্রোপচার ব্যতিরেকে। এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ফলে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মধ্যে স্ব-নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচিতির মানুষ, জেন্ডার-ফ্লুইড মানুষেরা থাকছেন কি না, তাই নিয়েও প্রশ্ন উঠছে; স্বচ্ছতা থাকছে না, পরিসর সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।


প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির মানুষদের সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করেন, তাদের অধিকার ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা করেন এমন মানুষেরা, এই গোষ্ঠীর মানুষদের বেছে নেওয়া পরিবারেরা— তারা সকলেও এর ফলে এক চূড়ান্ত সমস্যার মধ্যে পড়তে চলেছেন। কারণ এই নতুন অ্যাক্টে বলা হচ্ছে, কাউকে জোর করে রূপান্তরকামী পরিচিতি নিতে বাধ্য করা হলে অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণিত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অথচ এক্ষেত্রে বাধ্য করা নয়, তার লিঙ্গ পরিচিতির পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলিও বিপদে পড়তে পারেন।


আশ্চর্যজনকভাবে ২০১৯ সালে এ দেশে যে ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) অ্যাক্ট চালু হয়েছিল, তার অধীনে এখনও পর্যন্ত কয়েক শ’ হাজার স্ব-নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচিতির মানুষকে যে পরিচিতির সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে, তারা এবার যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন হচ্ছেন সে বিষয়ে এই সংশোধিত আইনে কোনো সদুত্তর নেই।


সারা দেশজুড়ে এই বিল পেশ হওয়ার পরেই শুরু হয়েছিল #নোগোয়িংব্যাক, #রিজেক্টট্রান্সবিল২০২৬ প্রতিবাদ আন্দোলন, যা এই মুহূর্তেও একই রকম বা বলা যায়, আরও বেশি জোরদার হয়েছে। দেশের প্রতিটি রাজ্যে এই সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কোয়ালিশন তৈরি করে পরবর্তী পর্যায়ের আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।


২০১৪ সালে নালসা রায়ের মধ্যে দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট লিঙ্গ পরিচিতি স্ব-নির্ধারণের যে অধিকার রূপান্তরকামী মানুষকে দিয়েছে, সংশোধনী আইন তাই পুরোপুরি খর্ব করছে। নিজস্ব পরিচিতি স্থির করার জন্য এখন থেকে লিঙ্গ পরিচিতি নির্ধারণকে এক ধরনের মেডিক্যাল শর্তসাপেক্ষ রাখা হচ্ছে, যা আদৌ মানবিক ও গণতান্ত্রিক নয়। এই আইনের ফলে নন-বাইনারি, রূপান্তরকামী নারী যারা হিজড়া ঘরানায় যান না, রূপান্তরকামী পুরুষ— তারা বাদ পড়বেন। হাজার হাজার রূপান্তরকামী মানুষকে আরও কঠিন শর্তসাপেক্ষে নতুন করে নিজেদের পরিচিতি প্রমাণ করতে হবে।


২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের দেশের নাগরিক হিসাবে যাবতীয় মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের পরিচিতি তথা অস্তিত্বকেই নতুন করে প্রশ্নের, অনিশ্চয়তার ও নিরাপত্তাহীনতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল এই সংশোধনী আইন। যদিও ইতিহাসকে সাক্ষী রেখেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষদের জীবন, পরিচয় ও নাগরিকের অধিকারের লড়াই নতুনভাবে শুরু হয়েছে আসমুদ্রহিমাচল।

ছবি- লেখক।

Sumit Chakraborty:
Related Post