ব্যক্তিত্বের নতুন ব্যাকরণ

ঈশানী মল্লিক

একটা সময় মানুষ বড় হতো পরিবারের শেখানো শিষ্টাচার, পাড়ার মাঠ, শিক্ষক-শিক্ষিকার বকুনি আর বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সহাবস্থান থেকে। ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠত ধীরে ধীরে, প্রায় অদৃশ্য প্রক্রিয়ায়। এখন সেই জায়গা দখল করেছে পর্দা। স্মার্টফোনের আলোর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ শিখছে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে হাসতে হয়, কীভাবে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম শুধু আমাদের পছন্দ বোঝে না; আমাদের আকাঙ্ক্ষাকেও পরিচালিত করে। কোনও জীবনকে সফল বলে মনে হবে, কাকে অনুসরণযোগ্য মনে হবে, কেমন শরীর, কেমন পোশাক, কেমন সম্পর্ক— সব কিছুরই এক অদৃশ্য নকশা তৈরি হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিত্বও যেন এক ধরনের পারফরম্যান্সে পরিণত হয়েছে। সবাই দৃশ্যমান হতে চায়, কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেকে চিনতে চায়।
অথচ সত্যিকারের ব্যক্তিত্বের শুরুটা হয় নিঃশব্দে। নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে চিনে নেওয়ার মধ্যে। কখন কথা বলতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, কখন প্রতিক্রিয়া জানানো প্রয়োজন আর কখন নীরবতা অধিক শক্তিশালী— সেই বোধের মধ্যে। আজকের পৃথিবীতে তাৎক্ষণিক মতামত যেন নাগরিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা নিয়ে অবস্থান জানাতে হবে, বিচার করতে হবে, মন্তব্য করতে হবে। কিন্তু প্রজ্ঞা সব সময় দ্রুত নয়। কখনও কখনও প্রজ্ঞা মানে অপেক্ষা করা, পর্যবেক্ষণ করা এবং তারপর কথা বলা।
আত্মবিশ্বাস নিয়েও আমাদের ভুল ধারণা কম নয়। আমরা প্রায়ই ভাবি, আত্মবিশ্বাস মানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার এক অবিরাম চেষ্টা। অথচ প্রকৃত আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হল—নিজেকে সর্বক্ষণ প্রমাণ করার প্রয়োজন না অনুভব করা। প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগত অপমান না ভেবে অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারা। প্রশংসা না পেলেও নিজের কাজ করে যাওয়া।
সাম্প্রতিক গবেষণাও এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অতিরিক্ত সামাজিক তুলনা, অনলাইন প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা এবং ক্রমাগত নিজেকে প্রদর্শনের চাপ উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও একাকিত্বের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, প্রতি দশ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে অন্তত একজন সমস্যাজনক মাত্রায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলছে।
তবে ব্যক্তিত্বের বিকাশ কেবল মানসিক অনুশীলনের বিষয় নয়। শরীরও এই নির্মাণের অপরিহার্য অংশ। পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং বিশ্রামকে আমরা প্রায়ই গৌণ মনে করি। অথচ ক্লান্ত শরীর খুব কম সময়েই সুস্থ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আত্মযত্ন কোনও বিলাসিতা নয়; এটি মানসিক স্থিতির পূর্বশর্ত।
বডি ল্যাঙ্গুয়েজও এক ধরনের নীরব ভাষা। আপনি কীভাবে হাঁটেন, বসেন, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনেন বা চোখে চোখ রেখে কথা বলেন— সব মিলিয়ে তৈরি হয় আপনার উপস্থিতি। মানুষ প্রায়ই আপনার বক্তব্যের চেয়ে আপনার উপস্থিতির অনুভূতিটাই বেশি মনে রাখে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ডিগ্রি অর্জন আর শিক্ষিত হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। ইতিহাস মানুষকে বিনয়ী করে, কারণ সে বুঝতে শেখে— তার আগে অসংখ্য মানুষ এই পৃথিবীকে তৈরি করেছে। বিজ্ঞান শেখায় প্রশ্ন করতে। সাহিত্য শেখায় অনুভব করতে। অর্থনীতি শেখায় বাস্তবতার সঙ্গে আপস না করে তাকে বুঝতে। পৃথিবীকে যত বেশি জানা যায়, নিজের অজ্ঞানতার পরিধিও তত স্পষ্ট হয়।
স্টাইলের ধারণাটিও নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। বাজার আমাদের বোঝাতে চায়, ব্যক্তিত্ব কেনা যায়। নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, নির্দিষ্ট সুগন্ধি, নির্দিষ্ট সাজসজ্জা যেন আত্মবিশ্বাসের বিকল্প। অথচ পরিচ্ছন্নতা, পরিমিত রুচি, আন্তরিক হাসি এবং সুশৃঙ্খলতা— এই গুণগুলির কোনও বাজারদর নেই। এগুলো কেবল চর্চা করা যায়।
তবে ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো ঘটে অদৃশ্য জায়গাগুলোতে— যেখানে কোনও দর্শক নেই। সততা সেখানে সবচেয়ে বড় পরিচয়। কথা রাখার ক্ষমতা, সুবিধার জন্য মিথ্যা না বলা, অন্যকে ব্যবহার না করা, স্বার্থের জন্য নীতিবোধ বিসর্জন না দেওয়া— এই অভ্যাসগুলোই ধীরে ধীরে বিশ্বাস তৈরি করে। সুনাম তৈরি হতে সময় লাগে; ধ্বংস হতে লাগে কয়েক মুহূর্ত।
এই জায়গাতেই মানবিকতার প্রসঙ্গ উঠে আসে। আজকের প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতিতে সহমর্মিতাকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ মনোবিজ্ঞানের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বলছে, অর্থ, খ্যাতি বা সামাজিক মর্যাদার চেয়েও মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে তার সম্পর্কের গুণগত মানের উপর। হার্ভার্ডের প্রায় আট দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ‘স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—ভালো সম্পর্ক মানুষকে শুধু সুখীই করে না, বরং দীর্ঘায়ু ও মানসিক স্থিতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। গবেষণার পরিচালক রবার্ট ওয়াল্ডিঙ্গারের কথায়, “ভালো সম্পর্ক আমাদের আরও সুখী এবং সুস্থ রাখে।”
তবে ভালোবাসা মানেই সীমাহীন প্রবেশাধিকার নয়। সুস্থ সম্পর্কের জন্য যেমন আন্তরিকতা প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন সীমারেখা। সবাইকে খুশি রাখার দায় কারও নেই। বরং যাদের সঙ্গে আমরা সময় কাটাই, যেসব আলাপ শুনি, যে পরিবেশে নিজেদের সঁপে দিই—তা অদৃশ্যভাবে আমাদের চিন্তা ও আত্মপরিচয়কে গড়ে তোলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে প্রতি ছয় জনের একজন একাকিত্বের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা জনস্বাস্থ্যের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী সামাজিক সংযোগ সুস্থতা ও দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, নিজেকে গড়ে তোলা মানে কেবল নিজেকে নিখুঁত করে তোলা নয়; বরং অন্য মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার সক্ষমতাও।
তবু এই আলোচনার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। আত্মউন্নয়নের অধিকাংশ ভাষ্য ধরে নেয়, মানুষ ইচ্ছা করলেই বদলে যেতে পারে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, শৈশবের ট্রমা, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী চাপ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। যে মানুষটি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারছেন না, তিনি হয়তো অলস নন; তিনি ক্লান্ত। যে মানুষটি অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ, তিনি হয়তো দুর্বল নন; তিনি আহত। তাই আত্মউন্নয়ন কোনও প্রতিযোগিতা নয়। এটি অন্যকে হারানোরও গল্প নয়। বরং এটি নিজের সঙ্গে ধৈর্যশীল হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
আমি আসলে কে?
আমি কী হতে চাই?
আমার মন, শরীর, হৃদয়, আত্মা এবং জীবিকার মধ্যে কোনও সংলাপ আছে কি?
আমরা হয়তো অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের ভাষা ভুলে গিয়েছি। কিন্তু নিজেকে গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হয় সেই হারিয়ে যাওয়া ভাষাটিকে আবার শুনতে শেখার মধ্য দিয়ে।
ব্যক্তিত্ব কোনও মুখোশ নয়। কোনও অভিনয়ও নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সমষ্টি— কীভাবে কথা বলি, কীভাবে আচরণ করি, কীভাবে ব্যর্থ হই, কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াই, এবং কীভাবে অন্য মানুষের প্রতি মানবিক থাকি। নিজেকে বদলে ফেলার জন্য বড় কোনও বিপ্লবের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটু সচেতনতা, একটু শৃঙ্খলা, কিছুটা আত্মসহানুভূতি এবং সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস।
হয়তো জীবনকে নতুন করে সাজানোর সবচেয়ে উপযুক্ত দিনটি আগামীকাল নয়।
আজই।

Sumit Chakraborty: