কলকাতা, ১৫ মে- আর জি কর কান্ডে এবার নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে তিন হেভিওয়েট আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করার কথা ঘোষণা করলেন তিনি। এমনকী আর জি কর কান্ডে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী ভূমিকা ছিল তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।
আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বহুদিন ধরে সরব ছিলেন শুভেন্দু। এবার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরেই এ নিয় কড়া অবস্থান গ্রহণ করলেন তিনি। যে তিন আইপিএসকে সাসপেন্ড করা হয়েছে তারা হলেন, এডিজি আইবি বিনীত গোয়েল, আইপিএস ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং আইপিএস অভিষেক গুপ্তা। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু জানিয়েছেন, ওই সময় কাদের নির্দেশে সাসপেন্ডেড আধিকারিকরা কাজ করেছেন, সাংবাদিক বৈঠক করেছেন, সেটা মুখ্যমন্ত্রী নাকি অন্য কোনও মন্ত্রীর নির্দেশে, সমস্ত বিষয় তদন্তের আওতায় এনে খতিয়ে দেখা হবে।
তার কথায়, ‘ওই আইপিএসদের ফোনকল, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট সব বের করব। দেখতে হবে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রীর কথায় তারা সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন কি না। তবে প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া এবং নির্যাতিতার পরিবারকে টাকা দিতে চাওয়ার অভিযোগের তদন্ত হবে।’ ভোটের প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহরা কথা দিয়েছিলেন, বিজেপি বাংলায় সরকার গড়লে আর জি করে অভয়া মামলার ফাইল নতুন করে খোলা হবে। একই আশ্বাস দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারীও। আর সেই প্রতিশ্রুতিমতো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেই তৎপরতা শুরু করে দিলেন শুভেন্দু।
নবান্ন সভাঘরের এই সাংবাদিক বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অভয়া কাণ্ডে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ আমাদের কানে এসেছিল, নির্যাতিতার মায়ের তরফে, তা হল তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই পুলিশ অফিসার পরিবারকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, রাজ্য সরকারের তরফে তাদের এই প্রস্তাব। এটা কারা, কেন বলেছিল, রাজ্য সরকারের কথায় নাকি অন্য কিছু – এসবের তদন্ত করা প্রয়োজন, তদন্ত হবে। আর যাঁদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, সেসব অফিসারদের সাসপেন্ড করে তারপর তদন্ত শুরু করা দরকার। নাহলে তদন্তে স্বচ্ছতা থাকবে না।’ এরপরেই এই তিন অফিসারের সাসপেনশনের কথা ঘোষণা করেন তিনি। বর্তমানে গোয়েল রাজ্যের ডিজি (আইবি) পদে কাজ করছেন। অভিষেক ইএফআরের কমান্ডান্ট পদে কাজ করেন। পদমর্যাদায় ডিআইজি। আর ইন্দিরা এখন সিআইডি-র স্পেশ্যাল সুপারিনটেনডেন্ট।
২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার সময় আইপিএস বিনীত ছিলেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার। আরজি কর কাণ্ডের পর প্রবল আন্দোলনের মুখে তাঁর পদত্যাগের দাবি ওঠে। জুনিয়র চিকিৎসকদের লাগাতার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সে বছরের সেপ্টেম্বরে বিনীত কলকাতার সিপি থেকে সরিয়ে এসটিএফের এডিজি ও আইজিপি পদে বদলি করে দেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক গুপ্ত ছিলেন কলকাতা পুলিশের ডিসি (নর্থ) পদে। তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে তাঁকেও ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আইপিএস ইন্দিরা তখন কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) পদে দায়িত্বরত ছিলেন। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘অ্যাজ আ হোম মিনিস্টার, আমি চার্জ নেওয়ার পর মাননীয় চিফ সেক্রেটারি এবং মাননীয় হোম সেক্রেটারির কাছে লিখিত চেয়েছিলাম আরজি করের ঘটনা এবং তার পরবর্তী কিছু বিষয় নিয়ে। কী ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকেরা সেটা হ্যান্ডল করেছিলেন, তা জানতে চেয়েছিলাম। তথ্য অনুসন্ধানের পর আপাতত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিলাম।’
মুখ্যমন্ত্রী আজ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সিবিআইয়ের তরফে যে তদন্ত হচ্ছে, সেখানে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন নেই। রাজ্য সরকারের তরফে রাজ্যের পুলিশের ভূমিকা দেখা হচ্ছে। শুভেন্দু বলেন, ‘এক রকমের ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তার তদন্ত হবে। ওই সময়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের সঙ্গে কাদের কাদের কথা হয়েছিল, কল লিস্ট, হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাট খতিয়ে দেখা হবে। পরে পরে বার করব। তখন কার কার সঙ্গে কথা হয়েছে, তখনকার মুখ্যমন্ত্রী কিংবা কোনও মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে কি না, কোনও নির্দেশ ছিল কি না, সব বার করব। এগুলো তদন্তের অংশ।’