মানুষের মূল্যায়ন'- এই শব্দ বা বাক্যযুগলের সংজ্ঞা কী?খুব 'মায়ের সহজ করে বললে, মানুষের মূল্যায়ন হলো 'একজন মানুষ তার কাজ ও আচরণের মাধ্যমে সমাজের বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বা যোগ্য, তা তুল্যমূল্য যাচাই বা বিচার করাকে বলে মানুষের মূল্যায়ন। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, একটি মানুষের মূল্যায়ন কখন হয়? সমাজবিজ্ঞানীদের দাবি, একটি মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই হয় যখন ওই মানুষটি চোখের আড়াল হয়ে যায়। যখন ওই মানুষটির অনুপস্থিতি হাজারো, লক্ষ, কোটি মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ওই মানুষটির অনুপস্থিতি কোটি কোটি মানুষকে ভাবায়, কাঁদায়।তার করে যাওয়া ভালো কাজগুলি নিয়ে মানুষ দিনভর আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মানুষ যখন উপলব্ধি করতে পারে যে হারিয়ে যাওয়া মানুষটিই সঠিক ছিল, মানুষ যখন বলে, চলে যাওয়া মানুষটি যখন ছিল, তখন আমরা সকলেই ভালো ছিলাম। কোনো মানুষের শূন্যতা, অভাব যখন লাখো মানুষকে প্রভাবিত করে, কোনো মানুষের না থাকাটাকে যখন লাখো মানুষ মন থেকে উপলব্ধি করে, মানুষের মধ্যে না থেকেও মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। অনেকে বলেন, মৃত্যুর পর মানুষের মূল্যায়ন হয়। ক্ষমতাচ্যুত বালাংদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হচ্ছেন সেই মানুষটি, যিনি বেঁচে থেকেও তার অনুপস্থিতি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের সিংহভাগকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। তার অনুপস্থিতি বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগণের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা এখন প্রকাশ্যেই বলতে শুরু করেছেন যে, উনি যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখনই আমরা ভালো ছিলাম। বলতে গেলে, বাংলাদেশের মানুষ এখন শেখ হাসিনার মূল্যায়ন করছেন। যখন ছিলেন, তখন কিন্তু তার এভাবে মূল্যায়ন হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ এখন তার অনুপস্থিতিটাকে, তাঁরা শূন্যতাটাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারছেন।মানুষ এখন বুঝতে পারছেন, তিনিই আসলে ঠিক ছিলেন। যা বলেছিলেন, সঠিক বলেছিলেন।আসল কথা এখন হাসিনার মূল্যায়ন করছেন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ।কিন্তু বাংলায় অতি প্রচলিত এবং জনপ্রিয় একটি প্রবাদ আছে। সেই প্রবাদটি হলো, 'আমরা কেউ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না'। এই সময়ে বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রচলিত প্রবাদ বাক্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হচ্ছে। কেননা, শেখ হাসিনা যখখ ছিলেন, তখন তারা হাসিনাকে ভুল বুঝেছেন। তার কথাকে অবিশ্বাস করেছেন। দাঁত হারালেই মানুষ দাঁতের মর্ম বা গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। হাসিনাকে হারিয়ে, হাসিনার গুরুত্ব,তাঁর যোগ্যতা উপলব্ধি করতে পারছেন।হাসিনাকে বাংলাদেশের ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করাটা যে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল, তা এখন বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পেরেছেন। 'কোটা আন্দোলন' যে সেই ষড়যন্ত্রেরই প্রাথমিক রূপ ছিলো, সেটা এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এই বুঝতে পারাটাই হাসিনাকে যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। হাসিনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আবার প্রমাণিত হয়েছে গতকাল শুক্রবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশিতত একটি ভাষণকে কেন্দ্র করে। খবরে প্রকাশ, এদিন শেখ হাসিনার ভাষণ শুধু লাইভ শুনেছেন কোটির বেশি মানুষ। ভারতের প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে তো বটেই, গোটা বিশ্বের প্রথম ও মাঝারি স্তরের সমস্ত টেলিভিশন, খবরের কাগজ, রেডিও এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ করেছে। ভারত এবং বিশ্বের প্রান্তে বহু সংবাদমাধ্যম হাসিনার বক্তব্য লাইভ সম্প্রচার করেছে।আন্তর্জাতিক মহলের একটা অংশের অভিমত, শুক্রবার হাসিনার ভাষণটি ছিল বিরল রেকর্ডের অধিকারী। সাম্প্রতিক অতীতে কোন নেতা বা নেত্রী, বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত এক প্রধানমন্ত্রী, যিনি কিনা নিজের দেশে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি! এমন একজনের ভাষণ এত বেশি মানুষ লাইব শোনেননি। এছাড়াও রয়েছে ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলি। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হাসিনার ভাষণ শুনতে বিপুল সাড়া নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা। তার ভাষণ শুনতে মানুষের এমন উৎসাহ এবং আগ্রহ থেকে স্পষ্ট বাংলাদেশের মানুষ অনেক দেরিতে হলেও হাসিনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে। ফলে দাঁত থাকতে দাঁতের যত্ন যে কতটা জরুরি সেটা আবারও প্রমাণিত। এই মূল্যায়ন আগামীদিনে বাংলাদেশের মানুষকে কতটা সুফল দেবে সেটাই এখন দেখার।