হাতুড়ির শব্দ থেমে যাচ্ছে, নিস্তব্ধ কামারপাড়া!!

অনলাইন প্রতিনিধি :-গ্রাম ত্রিপুরার চিরচেনা শব্দ আগুন জ্বালানো চুলোর তাপ, হাপড়ের দমে দাউ দাউ আগুন আর হাতুড়ির টুংটাং আওয়াজ একসময় যে শব্দে মুখরিত থাকত তেলিয়ামুড়া মহকুমার ডিএম কলোনি সহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা, আজ তা প্রায় নিস্তব্ধ। কালের বিবর্তনে আধুনিক যন্ত্রপাতির দাপটে ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ কামার শিল্প।
একসময় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দা, বটি, ছুরি, কাস্তে, কোদাল কিংবা লাঙ্গলের ফলা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন এলাকার কামার কারিগররা

কৃষিকাজ ও গৃহস্থালির দৈনন্দিন প্রয়োজনে গ্রামবাসীদের নির্ভর করতে হতো এই কামার পাড়াগুলির উপরেই। প্রতিটি গ্রামেই ছিল অন্তত একাধিক কামার পরিবার, যাদের হাতের তৈরি লোহার সরঞ্জাম ছাড়া কৃষিকাজ কল্পনাই করা যেত না। সেই কর্মচাঞ্চল্যের ছবি আজ আর চোখে পড়ে না।বর্তমানে তেলিয়ামুড়া এলাকার ডিএম কলোনি ও সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেলো হাতেগোনা কয়েকজন প্রবীণ কামার কারিগরকে কোনোমতে পেশাটি আঁকড়ে থাকতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, আর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য পেশার খোঁজে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে।কারিগরদের কথায়, বাজারে সহজলভ্য কারখানায় তৈরি সস্তা লোহার সামগ্রী ও আধুনিক মেশিনের আগ্রাসনে হাতে গড়া
সামগ্রীর চাহিদা দ্রুত কমে গেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, নিয়মিত কাজের অভাব এবং চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে এই পেশা আর লাভজনক হয়ে উঠছে না। ফলে নতুন প্রজন্ম এই বংশানুক্রমিক পেশায় আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর ফলেই শতাব্দী প্রাচীন এই শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে।একজন প্রবীণ কামার কারিগর আক্ষেপের সুরে বলেন, আগে দিনে আমাদের কাজের শেষ থাকত না। এখন মাসের পর মাস কাজ জোটে না। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।এই পরিস্থিতিতে গ্রামীণ কামার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগররা সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারী উদ্যোগ। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা, আধুনিক সরঞ্জাম এবং নির্দিষ্ট বাজার ব্যবস্থার ব্যবস্থা করা হলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি সরকারী প্রকল্পে কামার শিল্পজাত সামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে, তেমনি রক্ষা পাবে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক মূল্যবান ঐতিহ্য।বিশেষজ্ঞদের মতে, কামার শিল্প শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, আত্মনির্ভরতা এবং ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারী সহায়তা পেলে এই শিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।এখন দেখার বিষয়, গ্রামীণ কামার কারিগরদের এই দাবি বর্তমান সরকার ও প্রশাসন কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।
Dainik Digital: