সম্পাদকীয়, ১৬ ফেব্রুয়ারী: নয়াদিল্লীর ভারত মণ্ডপমে শুরু হওয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬ নয়াদি একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির উৎসব, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থার এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’ মন্ত্র উচ্চারণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন একই সময়ে বিশ্বমঞ্চে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ভিন্ন আশঙ্কা-এ আই কি মানবসভ্যতার কর্মসংস্থান কাঠামোকেই ভেভে দেবে?
এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন প্রযুক্তি দুনিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিনিধিরা। উপস্থিত থাকছেন-সুন্দর পিচাই, স্যাম অল্টম্যান- সহ প্রায় ৪০ টি সংস্থার কর্ণধার। এছাড়া ২০ টি দেশের রাষ্ট্রনেতারা অংশ নিচ্ছেন। ভারতে আসছেন-ইমানুয়েল মাত্রেণ, লুলা দ্য সিলভা, রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস সহ একাধিক বিশ্বনেতার পাশপাশি উপস্থিত থাকবেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট, গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী প্রমুখ। প্রায় দুই লক্ষ মানুষের নিবন্ধন, যার মধ্যে কৃষক ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ, দেখিয়ে দেয়- এআই আর কেবল প্রযুক্তিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জীবিকা, রুটি-রুজি এবং সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন।
কিন্তু এই আশাবাদের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে আছে সতর্কবার্তা। এআই নিরাপত্তা গবেষক রোমান ইয়াম্পোলস্কি দাবি করেছেন, ২০২৭ সালের মধ্যেই আসতে পারে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI) যা মানুষের প্রায় সব মেধাভিত্তিক কাজ প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হবে। তার বক্তব্য পাঁচ বছরের মধ্যে ৯৯ শতাংশ চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। এই পূর্বাভাস অতিরঞ্জিত মনে হলেও, তা নিছক কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং দ্রুত অগ্রসরমান অটোমেশন, জেনারেটিভ এআই এবং রোবেটিক্সের বাস্তব প্রবণতার ওপর ভিত্তি করেই এই আশঙ্কা।
ইতিহাসে শিল্প বিপ্লব, বিদ্যুৎ, কম্পিউটার-প্রতিটি প্রযুক্তিগত রূপান্তরই প্রথমে কর্মহানি ঘটিয়েছে, পরে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো-এ আই কেবল কায়িক শ্রম নয়, জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল কাজেও প্রবেশ করছে। কোড লেখা, আইনি পরামর্শ, আর্থিক বিশ্লেষণ, এমনকি-সব ক্ষেত্রেই এআই দ্রুত ও কম খরচে কাজ করতে সক্ষম। ফলে ‘হোয়াইট কলা’র চাকরির নিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে। ভারতের মতো দেশে এই প্রশ্ন আরও জটিল। একদিকে বিপুল যুব জনসংখ্যা-যারা কর্মসংস্থানের অপেক্ষায়। অন্যদিকে, প্রযুক্তি খাতে দ্রুত অগ্রগতি। যদি এআই উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার উন্নত করে, কৃষিতে ফলন বাড়ায়-তাহলে তা উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। কিন্তু যদি একই সঙ্গে শ্রমবাজারে চাহিদা কমিয়ে দেয়, তাহলে সামাজিক বৈষম্য তীব্র হবে। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অল্প কয়েকজন লাভবান হবেন, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কর্মহীনতার ঝুঁকিতে পড়বেন।
এই প্রেক্ষাপটে দিল্লীর সম্মেলনের আসল গুরুত্ব প্রযুক্তি প্রদর্শনে নয়, বরং নীতি নির্ধারণে। মানুষকেন্দ্রিক এআই’ কেবল স্লোগান হলে চলবে না, তা বাস্তব নীতিতে রূপান্তরিত হতে হবে। প্রয়োজন- প্রথমত, ব্যাপক পুনঃপ্রশিক্ষন ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, যাতে শ্রমিকরা প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা বলয়- যেমন বেকার ভাতা, আংশিক মৌলিক আয়, অথবা নতুন ধরনের কর্মসংস্থান গ্যারান্টি-যাতে রূপান্তরের ধাক্কা সামল দেওয়া যায়। তৃতীয়ত, এআই নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার কঠোর আন্তর্জাতিক কাঠামো, যাতে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।
চতুর্থত, উৎপাদনশীলতার। যেন কেবল কর্পোরেটের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, বরং কর ও পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে বৃহত্তম সমাজে পৌঁছায়। রোমান ইয়াম্পোলস্কির ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো চরমপন্থী, কিন্তু তা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে। যদি এআই সত্যিই মানুষের চেয়ে অধিক দক্ষ হয়ে ওঠে, তাহলে কর্মসংস্থানের ধারণাটাই বদলে যাবে। হয়তো ভবিষ্যতে সমাজে ‘কাজ’ মানে জীবিকা নয়, বরং সৃজনশীলতা ও সামাজিক অবদান-আর জীবিকার নিশ্চয়তা আসবে অন্য কাঠামো থেকে। কিন্তু সেই রূপান্তরের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বৈশ্বিক সমন্বয় অপরিহার্য।
অতএব, দিল্লীর সম্মেলন এক প্রতীকী সন্ধিক্ষণ। একদিকে সীমাহীন সম্ভবনা-উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, দারিদ্র হ্রাস। অন্যদিকে গভীর অনিশ্চয়তা-বেকারত্ব, বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রযুক্তি আমাদের সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে?
এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারন করবে কেবল অ্যালগরিদম নয়, আমাদের নীতি, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যদি সত্যিই লক্ষ্য হয় ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’, তবে এখনই প্রয়োজন সাহসী, মানবকেন্দ্রিক এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ। নইলে প্রযুক্তির জোয়ারে উন্নয়নের স্বপ্ন ভেসে যেতে পারে, আর পিছনে পড়ে থাকবে অসংখ্য কর্মহীন মানুষ।