অনলাইন প্রতিনিধি :-আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও কনকনে খোয়াই শীতের রাতে শিয়ালের ডাক শোনা যেতো শহরের অঞ্চলগুলোতে। আশপাশ গ্রামাঞ্চলের জঙ্গলগুলোতে শীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই তাদের উপস্থিতি টের পেতো সাধারণ মানুষজন। কালের বিবর্তনে আজ আর সেই ডাক শোনা যায় না শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলগুলোতে। প্রশ্ন উঠে বিগত দশ-পনেরো বছরের মধ্যে কী তাহলে এই পশুরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো? বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে সিংহভাগ সাধারণ মানুষ এটাই বলবেন, শিয়াল তো মানুষের কোনও কাজে আসে না বরং মানুষের ক্ষতিসাধন করে, তাদের বিলুপ্ত হওয়াটা ভালোই। বন্যপ্রাণীদের বিলুপ্তি হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন না হলেও পরিবেশবিদরা কিন্তু যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।অতীতে গ্রাম-বাংলায় রাতে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকে জনজীবন ছিল অতিষ্ঠ। ছিল ভয়ে গা ছমছম করা পরিবেশ। তখন দাদু-দিদিমারা তার নাতি-নাতনিদের ঘুম পাড়ানোর সময় খেঁকশিয়ালের গল্প শোনাতেন। সেই গল্পের চরিত্রে শিয়াল ছিল বাঙালির 'পণ্ডিত'।
গৃহপালিত না হলেও 'শিয়াল পণ্ডিতের' সঙ্গে যেন বাঙালির ছিল খুব পরিচিত ব্যাপার-স্যাপার। কিন্তু নানা কারণে এই প্রাণীটি আজ বিলুপ্তির পথে। জানা যায়, দুই প্রজাতির শিয়ালের মধ্যে পাতি শিয়াল অনেক কষ্টে টিকে থাকলেও খেঁকশিয়াল বিপন্ন হয়ে পড়েছে। রাজ্যের কয়েকটি জেলায় খেঁকশিয়ালের দেখা মিললেও তা একেবারেই নগণ্য। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হতো শিয়ালের হাঁকডাক। যা আমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিতো। অনেক সময় ক্ষুধার জ্বালায় লোকালয়ে ঢুকে পড়তো শিয়াল। খাদ্য সংগ্রহে বাধা দিলে শিয়ালের কামড়ে আহতও হতো গ্রামের মানুষজন। সম্প্রতি এমন ঘটনা আর শোনা যায় না। শিয়াল, ইঁদুর, পোকামাকড়, মৃত প্রাণী, পচা-গলা এক কথায় সব ধরনের খাবার খেয়ে পরিবেশকে ভালো রাখতো। তাই এই পরিবেশে ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শিয়াল প্রকৃতি ও মানুষের জন্য উপকারী প্রাণী ছিল।পরিবেশবিদরা বলছেন, শিয়াল সমাজের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কারণ তারা ইঁদুর, পোকামাকড় ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এছাড়া ময়লা আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে এবং ফসলের ক্ষতি করে এমন প্রাণী খেয়ে কৃষকদের সাহায্য করে। এরা বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা রোগ প্রতিরোধ ও জীববৈচিত্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই প্রসঙ্গে বন দপ্তর বলছেন, নির্বিচারে গাছপালা ঝোঁপঝাড় কাটার পাশাপাশি গর্ত ভরাট করে ফেলায় অন্য সব প্রাণীর মতো শিয়ালের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। কেন বর্তমান সময়ে শিয়ালের সংখ্যা কমছে সে বিষয়ে প্রাণীবিদরা বলছেন, বনভূমি কাটা এবং কৃষিজমি ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে শিয়ালের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।এছাড়া কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে তাদের প্রধান খাদ্য (যেমন ছোট ইঁদুর, পোকামাকড়) কমে যাচ্ছে। মানুষের সঙ্গে সংঘাতও আরেকটি অন্যতম কারণ। এছাড়া রয়েছে শিয়াল শিকার করা এবং এদের মাংস ভক্ষণ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো। বন্য শিয়াল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন প্রাণীবিদরা। কারণ প্রাণীবিদদের ভাষায় শিয়াল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শস্য খেতে পেঁচার মতো প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, যা কৃষির জন্য ক্ষতিকর। তাই, তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।