সম্পাদকীয়, ১৩ ফেব্রুয়ারীঃ সত্যি অর্থে কামব্যাক হয়তো এটাকেই বলে। বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৮ সালে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল তাঁকে। পরবর্তী কালে জামিন পেয়ে চিকিৎসার জন্য দেশ ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি দিয়েছিলেন। তারপর থেকে গত দেড় দশকে পদ্মা-মেঘনা-বুড়িগঙ্গা দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। নানা কারণে দেশ উথাল-পাতাল হলেও, তিনি আর দেশে ফেরেননি। এমনকি মায়ের ভয়ানক অসুস্থতা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জেনেও তার দেশে ফেরা নিয়ে নানা জল্পনা ও সংশয় তৈরি হয়েছিল। তিনি তারেক রহমান। দীর্ঘ সতের বছর সপরিবারে লন্ডনে কাটিয়ে ঢাকা যখন ফিরলেন, তখন বাংলাদেশ উত্তাল। তার ঠিক একমাস পরেই সেই তারেক রহমান বসতে চলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে।
একে রূপকথার গল্প বললেও হয়ত কম বলা হবে। ‘লন্ডন-টু-ঢাকা, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন গল্পের নায়ক হিসাব উঠে এলেন খালেদা পুত্র তারেক রহমান। ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট তথাকথিত ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে বহু রক্ত ঝরেছে। এই অশান্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্টিত আওয়ামী লীগ হীন প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় বিজয় পেয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই জয় প্রত্যাশিত ছিল। কেননা, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহল এমনই পূর্বাভাস দিয়েছিলো।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯ টি আসনে ভোট হয়েছিল ১২ ফেব্রুয়ারী। বিকেল সাড়ে চারটায় ভোট গ্রহণ পর্ব শেষ হতেই গণনা শুরু হয়। গণনার শুরু থেকেই প্রত্যাশিতভাবে বিএনপি প্রার্থীদের একের পর এক জয়ের খবর আসতে থাকে। রাতভর গণনা চলে, সেই গণনা আজ সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পর্যন্ত চলে। রাতে এই সম্পাদকীয় যখন লেখা হচ্ছে, তখনও কয়েকটি কেন্দ্রে গণনা চলছে বলে খবর। তবে এখনও চূড়ান্ত ফলাফল জানা না গেলেও, ইতিমধ্যে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেছে পদ্মাপাড়ের দেশের আগামীর ভবিষ্যৎ। বিএনপি এককভাবে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। আর এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান।
অপরদিকে কট্টর ভারত বিরোধী জামায়াত ইসলাম সহ এগার দলের জোটকে বসতে হবে বিরোধী দলের আসনে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, যে তথাকথি ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন হয়েছিলো, সেই ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) তেমন কোনও সুবিধা করতে পারেনি। দলের প্রথমসারির অনেক নেতাই ভোটে পরাজিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহলের একটা অংশ বিষয়টিকে আবার অন্যভাবে দেখছে। কারণ, হাসিনাকে উৎখাত করার পিছনে মুখ্য ভূমিকা যারে ছিলো, তারা কোনও সুবিধাই করতে পারেনি। বরং এই আন্দোলনকে হাতিয়ার করে সব থেকে বেশি লাভ কুড়িয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ হীন নির্বাচন মূলত দ্বিমুখী জোটের লড়াইয়ের ফসল তুললো ধানের শীষ।
তবে এই নির্বাচন থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ মনে প্রাণে চায়নি এবং চায়না, জামাতের মতো কট্টরপন্থী দল এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল ক্ষমতায় বসুক। বাংলাদেশের জনগণ সেটা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন। জনগণ জামাত-কে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নতুন যুগের সূচনা করেছে। বিএনপির এই বিপুল জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন- ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আগামীর সম্পর্কটা ঠিক কেমন হবে? দিল্লী- ঢাকা দূরত্ব আগের অবস্থানে ফিরে যাবে কি? সেটাই এখন দেখার।