রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যের প্রশংসা সিন্ধিয়ার!!

অনলাইন প্রতিনিধি :-ত্রিপুরা এবং ভারতের আগর শিল্পের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা হলো শনিবার। উত্তর ত্রিপুরা জেলার কদমতলা ব্লকের বড়গোল গ্রামে এদিন রাজ্যের প্রথম আগর প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন কেন্দ্রীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ মন্ত্রী টিংকু রায়, বনমন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা, সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা মন্ত্রী শান্তনা চাকমা, মুখ্য সচিব রবীন্দ্র কুমার শ্যামল, ডোনার মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব অংশুমান দে, বিধায়ক যাদব লাল দেবনাথ, উত্তর জেলার জেলাশাসক চাঁদনী চন্দ্রন এবং জেলা পুলিশ সুপার অবিনাশ রাই সহ আরও
অনেকেই। কার্যক্রমের শুরতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কদমতলার উত্তর ফুলবাড়িতে অবস্থিত মামান ইন্ডাস্ট্রি নামক একটি বেসরকারী আগর কারখানা পরিদর্শন করেন।সেখানে তিনি আগর চাষি ব্যবসায়ী এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। মন্ত্রী আগর উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিপণনের বিভিন্ন পর্যায় গভীর মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আগর শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার কীভাবে একযোগে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। এরপরই বড়গোল গ্রামে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে তিনি প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।স্বাগত ভাষণ রাখতে গিয়ে বনমন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা এই প্রকল্পকে রাজ্যের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন। মন্ত্রী টিংকু রায় এবং শান্তনা চাকমাও তাদের বক্তব্যে রাজ্য সরকারের তরফে যাবতীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন এদিন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া তার ভাষণে ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যের ভূয়সী প্রসংসা করেন। তিনি বলেন, মা ত্রিপুরেশ্বরীর এই আশীর্বাদপ্রাপ্ত দেবভূমিতে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। আগরকে তরল সোনা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এই প্রাকৃতিক সম্পদ ত্রিপুরার অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে উত্তর-পূর্বের অষ্টলক্ষ্মীর বিকাশকে পাখির চোখ করা হয়েছে। আরও বলেন, বিগত ৬৫ বছরে আগর চাষিরা অবহেলিত হয়েছেন। তিনি আশ্বাস দেন, এই প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট স্থাপিত হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন। তিনি ঘোষণা দেন, কৃষকদের স্বার্থে কেন্দ্র সরকার আগর চিপসের রপ্তানি কোটা পঁচিশ হাজার কেজি থেকে বাড়িয়ে দেড় লক্ষ কেজি এবং আগরতেলের কোটা দেড় হাজার কেজি থেকে বাড়িয়ে সাত হাজার কেজি, অর্থাৎ ছয়গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের পর আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এই দিনটিকে ত্রিপুরার ইতিহাস এবং কৃষকদের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, ত্রিপুরা এবং আসাম, এই দুই রাজ্যেকে কেন্দ্র করে দেশের আগর সম্ভবনাকে নতুন শক্তি জোগাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন, ত্রিপুরা এবং আসামের মোট দুটিপ্রকল্পে ৭৮.৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এই প্রকল্পের অধীনে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত আগরের সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের স্থানীয় কৃষকরা, যারা গাছে পোকা লাগিয়ে বাড়িতে আগর উৎপাদন করেন, তারা যাতে তাদের ফসলের সম্পূর্ণ মূল্য পান, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। এই প্রকল্পের আওতায় আসামের গোলাঘাট এবং ত্রিপুরার কদমতলায় দুটি কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে আগরকাঠ থেকে সুগন্ধি তেল নিষ্কাশন পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি একটি সংঘঠিত রূপ পাবে। প্রধানমন্ত্রীর স্থানীয় থেকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন,এক জেলা-এক পণ্যের সর্বোত্তম উদাহরণ আমাদের এই ফুলবাড়িতে পাওয়া যায়।দেশ বর্তমানে প্রায় পনেরো কোটি আগর গাছ রয়েছে। যার প্রায় নব্বই শতাংশ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে। ত্রিপুরার সম্ভাবনা এতটা যে আগামী তিন থেকে চার বছরে এর উৎপাদন ক্ষমতা পঞ্চাশ শতাংশই বৃদ্ধি পাবে এবং বার্ষিক টার্নওভার দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ত্রিপুরার সংযোগ স্থাপনের জন্য ঘন ঘন বিক্রেতা বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। সম্প্রতি কাতারের ক্রেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগর প্রকল্পের পাশাপাশি তিনি রাজ্যে আরও দুটি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে বাইশ কোটি টাকায় ব্যয়ে সৌর মাইক্রোগ্রিড ও স্বাস্থ্য প্রকল্প এবং আগরতলায় দশ কোটি টাকার সরকারী ডেন্টাল কলেজ ও কুড়ি কোটি টাকার মা ও শিশু হাসপাতাল।কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় গত এক বছর ধরে আমরা প্রতিটি রাজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছি এবং আজ তার ফলাফল প্রকাশিত হচ্ছে। আমি আত্মবিশ্বাসী যে ত্রিপুরা সরকারের সাথে একসাথে আমরা এই অঞ্চলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাব। এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন যে ত্রিপুরার সার্বিক উন্নয়নে এক নতুন গতি আনবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রকের (ডোনার) মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য এম, সিন্ধিয়ার ত্রিপুরা সফরকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে উন্নয়নমুখী কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক তৎপরতা চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গণ্ডাছড়া মহকুমায় এই সফরে প্রথমবারের মতো রাত্রি যাপন করছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে রাজ্যের দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ পর্যটন এবং অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি আসবে বলেও আশা করা হচ্ছে।গণ্ডাছড়া মহকুমা জুড়ে প্রশাসনিক কাজকর্ম তুঙ্গে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসন পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনী সফরের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী ইতিমধ্যেই নারকেল কুঞ্জে অবস্থান করছেন, যেখানে মন্ত্রী সিন্ধিয়া রাত্রি যাপন করবেন। এটি গণ্ডাছড়া মহকুমায় কোনো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম রাত্রি যাপনের ঘটনা। সফরের মূল আকর্ষণ হল রবিবার, ২৫ জানুয়ারী সকাল ১০ টায় নারকেল কুঞ্জে তিনি মাতাবাড়ি টুরিজম সার্কিট প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।

Dainik Digital: