সংবিধান প্রদত্ত রক্ষাকবচ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের পেশিশক্তির সংঘাত কোনও বিষয় না, তবে বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক ভূখণ্ডে এই লড়াই যে বীভৎস রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা গভীর উদ্বেগের। ইডি বা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট-এর অতি সক্রিয়তা এবং তার বিপরীতে বিরোধীদের সরব অবস্থান কেবল নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল নয়, বরং এটি আজ গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো ও নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রশ্নটি আর নির্দিষ্ট কোনোও রাজনৈতিক দলের দুর্নীতির সীমারেখায় আবদ্ধ নেই, প্রশ্নটি এখন কেন্দ্রীয় এজেন্সির বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার।গত কয়েক বছরে ভারতের রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট ধাঁচ বা 'প্যাটার্ন' অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। শীতের বারতা নিয়ে যেমন পরিযায়ী পাখিরা আসে, তেমনই ভারতের নির্বাচনি নির্ঘন্ট ঘোষিত হওয়ার আগে বিরোধীদের দুয়ারে কড়া নাড়ে ইডি বা সিবিআই। বাংলার প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক আগ্রাসীন অবস্থান সেই দীর্ঘকালীন ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। কলকাতার রাজপথে মিছিল করে তিনি যখন 'সম্মান পারস্পরিক' হওয়ার বার্তা দেন, তখন তা কেরল কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের শিষ্টাচার নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি কঠোর রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি হিসেবেই প্রতিধ্বন্বিত হয়।তদন্তকারী সংস্থার কাজের ধরন নিয়ে উচ্চ আদালত যে সব পর্যবেক্ষণ করেছে, তা পিলে চমকে দেওয়ার মতো। ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের ক্ষেত্রে পাঁচ মাস জেলবাসের পর হাইকোর্ট যখন জানায় যে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই, তখন রাষ্ট্রপক্ষের মুখ রক্ষার জায়গা থাকে না। একই ভাবে হরিয়ানার নির্বাচনের মুখে কংগ্রেস বিধায়ক সুরেন্দ্র পনওয়ারের গ্রেপ্তারিতে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট যে 'Indefensible in law' বা 'আইনের চোখে অরক্ষনীয়' শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে, তা কোনও সাধারণ বিচ্যুতি নয়। এটি প্রমাণ করে যে, অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তের উদ্দেশ্যে অপরাধ দমন নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করা। ইডির আইনজীবীর উদ্দেশ্যে বিচারপতি মহাবীর সিং সিন্ধুর সেই অমোঘবানী- ১৪ ঘন্টা জেরা করলেই হিরো হওয়া যায় না- আসলে এজেন্সির আস্ফালনের মুখেই এক সপাটে চড়।অদ্ভুত এক বৈপরীত্যের সাক্ষী থাকছে দেশ। যে আইপ্যাক-এর দপ্তরে হানা নিয়ে আজ এত শোরগোল, সেই একই সংস্থা যখন ২০১৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে জগনমোহন রেড্ডির ছায়াসঙ্গী ছিল, তখন কিন্তু কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সির ঘুম ভাঙেনি। কারণ তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণে জগনমোহন ছিলেন শাসকের পরোক্ষ সহযোগী আবার মহারাষ্ট্র নির্বাচনি বৈতরণী পার করতে শত কোটি নগদ-সহ ধরা পড়া শাসকদলের নেতার ক্ষেত্রেও আইন তার স্বাভাবিক মন্থরতা বজায় রাখে। এই দ্বিচারিতা, তদন্ততের পরিভাষায় যাকে বলে 'সিলেক্টিভঅ্যামনেসিয়া' বা সুবিধাবাদী স্মৃতিভ্রম; তা আজ সাধারণ মানুষের কাছেও দিনের আলোর মতো পরিস্কার। ধরা যাক, একজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ ছিল, কিন্তু তিনি দলবদল করে শাসক শিবিরে যেতেই তদন্তকারী সংস্থা সেই ফাইল গুলি খুঁজে পাচ্ছে না বা ভুলে গেছে, তখনই বলা হয় এজেন্সির 'সিলেক্টিভঅ্যামনেসিয়া' হয়েছে।সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো তথাকথিত 'চাঁদা' বা নির্বাচনি বন্ডের রসায়ন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে লোকসানে চলা তেত্রিশটি সংস্থা যখন শাসকের তহবিলে ৫৮২ কোটি দান করে এবং তার অব্যবহিত পরেই তাদের বিরুদ্ধ চলা তদন্ত থিতিয়ে যায়, তখন আইনের শাসন আর অন্ধ থাকে না, তা সোজাসুজি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে। এই বিপুল অর্থের ভারসামহ্যহীনতা- যেখানে শাসক ও বিরোধী দলের তহবিলের অনুপাত ৯৯:১- সেখানে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' বা সমান সুযোগের তত্বটি হাস্যকর ঠেকে।আইন নিজের পথে চলবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই পথ যদি কেবল বিরোধীদের অন্দরমহল দিয়ে যায় এবং শাসরে দুয়ারে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে তাকে আর ন্যায়বিচার বলা চলে না। সন্দেশখালি বা আরজি কর-এর মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলি জনমানসে যে আলোড়ন তোলে, এজেন্সির দীর্ঘসূত্রতায় তার নির্যাস শেষ পর্যন্ত তলানিতে গিয়ে ঠেকে। গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা তার নিরপেক্ষতায়। ইডি বা সিবিআই যদি কেবল রাজনৈতিক প্রভুদের ইশারায়া পরিচালিত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর কুঠারাঘাত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম কেন্দ্র, কিংবা হেমন্ত সোরেন বনাম ইডি-এই খণ্ডচিত্র গুলি আসলে এক বৃহত্তর সংকটের ইঙ্গিতবাহী। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অতি-ব্যবহার যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে আগামীদিনে বিচারব্যবস্থা প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসটুকুই হারিয়ে যাবে। আর একটি দেশ যখন তার আইনি প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা হারায়, তখন গণতন্ত্রের কঙ্কালসার রূপটিই কেবল অবশিষ্ট থাকে।