যন্ত্র ও যন্ত্রী

বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক বাহিনী ভারতীয় জনতা পার্টির সাংগঠনিক শীর্ষাসনে নীতিন নবীনের অভিষেক কেবল এক তরুণ নেতৃত্বের আকস্মিক উল্কাপাত নয়, বরং সঙ্ঘ-বিজেপি সম্পর্কের চিরাচরিত রসায়নের এক গুণগত রূপান্তর। সঙ্ঘের 'শাখা'র ধুলোয় যাদের পদচারণা শুরু হয়নি, যাদের মনন মজ্জায় নাগপুরের সেই প্রথাগত অনুশাসনের কঠোর অনুবৃত্তি ব্রাত্য, এত বছর বিজেপির সর্বোচ্চ অলিন্দে তাদের প্রবেশাধিকার ছিল অলিখিতভাবে নিয়ন্ত্রিত। ৪৫ বছরের নীতিন নবীনের ক্ষেত্রে সেই দুর্ভেদ্য আগল ভাঙল। ঘটনাচক্রে নীতিন ও বিজেপি উভয়ের জন্ম একই বছরে ১৯৮০! জন্মের পঁয়তাল্লিশ বছর পর একে কি সংঘের অভিভাবকত্ব ছেড়ে বিজেপির 'সাবালক'হয়ে একা হাঁটতে শেখা বলা চলে? সম্ভবত এর চেয়েও রূঢ় সত্য এই যে, সংগঠনের চাবিকাঠি এখন আর কোনো আদর্শিক যৌথ পরিবারের শলা-পরামর্শের অপেক্ষায় নেই। নীতিন নবীনের উত্তরণ আদতে এক নিঃশব্দ রাজকীয় ঘোষণা: আগামীদিনে বিজেপির গতিপথ নির্ধারিত হবে কেবল নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের ইচ্ছার মানচিত্রে। তারাই এখানে আদিকথা, তারাই অন্তিম যন্ত্রী: আর সভাপতি সেই যন্ত্রের এক কুশলী চালক মাত্র।এই নিয়োগের নেপথ্যে সক্রিয় ছিল এক সুদীর্ঘ ও স্নায়ুক্ষয়ী টানাপোড়েন। প্রায় একবর্ষব্যাপী সঙ্ঘ ও মোদি-শাহ জুটির মধ্যে যে অদৃশ্য 'দড়ি টানাটানি' চলেছে, তা দিল্লীর রাজনৈতিক অলিন্দে গোপন থাকেনি। আরএসএস চেয়েছিল এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি সংঘের ঘরানায় লালিত ও পালিত এবং যার মুখচ্ছবিতে সংগঠনের চিরাচরিত চেতনার ধ্রুপদী প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু বাস্তববাদী রাজনীতির কুশীলবরা চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ অনুগত এক সহায়ককে, যার পৌরোহিত্যে সরকার ও দলের কাজে কোনো ছায়াযুদ্ধের বিড়ম্বনা থাকবে না। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সেই লড়াইয়ে মোদি-শাহ জুটিই শেষ হাসি হাসলেন। নীতিন নবীনের উত্তরণ মেনে নিয়ে সঙ্ঘও কার্যত স্বীকার করে নিলো, সাফল্যের উদ্ভাসে নীতি ও আদর্শের পুরাতন পাণ্ডুলিপি আজ ঈষৎ ম্লান। বাস্তববাদী রাজনীতির এই রূঢ় দর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে সঙ্ঘ আজ নরেন্দ্র মোদিকে কোনোপ্রকার অস্বস্তিতে ফেলতে নারাজ। সাফল্যই যেখানে ক্ষমতার একমাত্র ছাড়পত্র, সেখানে সংঘের ধ্রুবতারা আজ এক সশ্রদ্ধ পিছুটানে পর্যবষিত।নীতিন নবীন বিহারি, এবং উচ্চবর্ণের কায়স্থ পরিবারের সন্তান। তার ধমনীতে রাজনীতির রক্ত প্রবাহিত হলেও বিজেপি যাকে 'পরিবারতন্ত্রের বিষ' বলে কংগ্রেসকে নিরন্তর বিদ্ধ করে আসছে, নীতিন সেই ঘরানারই এক অন্য সংস্করণ। বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহার উত্তরসূরি হিসাবে নীতিনের রাজনীতিতে আসা এবং নীতীশ মন্ত্রিসভার গুরুদায়িত্ব পালন - সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক পরীক্ষিত সৈনিক। কিন্তু তার প্রকৃত শিল্পায়ন ঘটল অমিত শাহের জহুরির চোখে। বিহারের ভোট বৈতরণী পার করা হোক বা ছত্তিশগড় ও দিল্লীর কঠিন লড়াই, নীতিনের যান্ত্রিক ক্ষিপ্রতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অগাধ আস্থা অর্জন করেছে। এই নিঃশর্ত বিশ্বস্ততাই আজ তাকে সভাপতির গদিতে আসীন করল। আসলে নীতিন নবীন বা সম্রাট চৌধুরীদের মতো চরিত্ররা এখন মোদি-শাহের জয়যাত্রার সেই তুরুপের তাস, যারা সঙ্ঘের ধ্রুপদী আদর্শের চেয়েও নির্বাচনি জয় আনতেই বেশি পটু।রাজনীতির পাটিগণিতে নীতিনকে সামনে রেখে বিজেপি আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইল। একদিকে অনগ্রসর শ্রেণীর রাজনীতির চাপে থাকা উচ্চবর্ণের ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমন করা, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সলতে পাকানোর গুরুভার এখন এই তরুণ সভাপতির স্কন্ধে। তবে নীতিনের সামনে প্রথম ও প্রধান অগ্নিপরীক্ষা অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ। ইতিমধ্যেই তিনি বাংলার রাজনৈতিক সরণিতে পদাচারণা শুরু করেছেন। এই মুহূর্তে তিনি বঙ্গ সফরেই ব্যস্ত। তবে নীতিনের সবথেকে বড় সুবিধা ও অসুবিধা সম্ভবত একবিন্দুতেই নিহিত। নীতিনকে প্রধানমন্ত্রীর 'আমার বস্' সম্বোধনের আড়ালে যে গভীর শ্লেষ ও রাজনৈতিক বাস্তব লুকিয়ে আছে, তা লঘিষ্ঠ পাঠকের কাছেও স্পষ্ট, দলের রিমোট কন্ট্রোল রয়ে গেছে অন্যত্র। নীতিন নবীন এই মহানাটকের এক সুকৌশলী অভিনেতা মাত্র। সাফল্যের গৌরব যেমন শীর্ষদ্বয়ের মুকুটে উজ্জ্বল হবে, ব্যর্থতার গ্লানিও ঠিক তেমনই তাদের দায়ভার হয়ে থাকবে। এই নতুন বিজেপি বিন্যাসে সঙ্ঘ এখন কেবল এক দূরবর্তী পরামর্শদাতা, আর ক্ষমতার এককেন্দ্রিক মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদি-শাহ জুটি। যন্ত্র এখানে সচল ও ঝকঝকে, কিন্তু যন্ত্রীরা পর্দার আড়ালে থেকে পরম নিশ্চিন্তে সুর বাঁধছেন।তবে প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিবদল বা বয়সের নয়, প্রশ্নটি ক্ষমতার সেই অমোঘ বাস্তুতন্ত্রের, যেখানে আদিকথা কেবল আনুগত্য। আদর্শের সেই পুরাতন বটবৃক্ষটি কি তবে ক্রমে এক এককেন্দ্রিক মহীরুহের ছায়ায় ম্লান হয়ে পড়ছে? উত্তরটি হয়তো সময়ের গর্ভেই নিহিত, তবে বাতাসের এই ইঙ্গিতটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই।
Dainik Digital: