সম্পাদকীয়, ১৪ মার্চঃ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অনিবার্য ও নবতর অধ্যায়ের সূচনা করেছে।দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ের টালমাটাল পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারের উত্থান কেবল সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং তা সমগ্র অঞ্চলের কৌশলগত স্থিতিশীলতার এক পরীক্ষাবিশেষ। প্রশ্ন হলো,এই পটপরিবর্তন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চিরাচরিত সমীকরণকে কোন পথে চালিত করবে? পরিবর্তনের হাওয়া কি কেবল ক্ষমতার অলিন্দেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দ্বিপাক্ষিক আস্থার পরিসরেও এক বাস্তবসম্মত পুনর্গঠনের পথ প্রশস্ত হবে?
বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ইতিবাচক বার্তা ও ভারতের প্রতি সহযোগিতার সদিচ্ছা ইঙ্গিতপূর্ণ। ২০০১-০৬ পর্বের তিক্ত স্মৃতি এবং তৎকালীন বিএনপির ভারত-বিদ্বেষী অবস্থানের ছায়া আজও দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মনে সংশয় জাগাতে পারে, কিন্তু কূটনীতি কেবল স্মৃতিরোমন্থন নয়। বর্তমানের রুক্ষ বাস্তব অনেক সময় ইতিহাসের বিপ্রতীপ পথও নির্মাণ করে দেয়। একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট আমূল পরিবর্তিত। ভারত আজ কেবল এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বৈশ্বিক জোগান-শৃঙ্খলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্য দিকে, কয়েক বছরের দ্রুত আর্থিক শ্রীবৃদ্ধির পর বাংলাদেশ আজ প্রবল অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন। দশ হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ এবং ক্রমহ্রাসমান মুদ্রার ভাণ্ডার (২০২১-২২ সালের ৪,৬০০ কোটি ডলার থেকে ২০২৫-২৬ সালে ২,৯০০ কোটি ডলার) ঢাকাকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই সংকটে আঞ্চলিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট।জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল সংখ্যায় জয়লাভ কিংবা জুলাই-আগস্টের গণবিক্ষোভের গর্ভ থেকে উদ্ভুত ‘জাতীয় নাগরিক দল’ (এনসিপি)-র আত্মপ্রকাশ সবই এক ভিন্নতর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সংকেত বহন করছে। তারেক রহমানের দল কেবল নির্বাচনি সাফল্যে সন্তুষ্ট থাকবে, নাকি এই ভিন্নধর্মী শক্তিগুলিকে নিয়ে একটি বৃহত্তর শাসন-দর্শন গড়ে তুলতে পারবে, এর উপরেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভরশীল। বেকারত্ব নিরসন ও বিনিয়োগকারীদের হৃত আস্থা পুনরুদ্ধার করতে গেলে ভারতের বাজারের প্রবেশাধিকার ও জ্বালানি সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা।
নয়াদিল্লির জন্যও এটিও এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সময়। সাউথ ব্লককে (বর্তমানের সেবাতীর্থ) আজ কৌশলগত বাস্তববাদ ও দূরদর্শিতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। ভারতের প্রত্যাশা অতি স্পষ্ট সীমান্তের নিরাপত্তা, মৌলবাদবিরোধী অবস্থান এবং আঞ্চলিক সংযোগের ধারাবাহিকতা। তবে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি হলো, বাংলাদেশকে কোনো অবস্থাতেই ভারতের বৈরী রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রচ্ছন্ন রণক্ষেত্রের সহযোগী হতে দেওয়া চলে না। একই সঙ্গে, দুই দেশের নিবিড় ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের খাতিরে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করার দায়ভার নবনির্বাচিত সরকারকে গ্রহণ করতেই হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব যে টলায়মান হয়, ইতিহাসের অজস্র পৃষ্ঠা এর প্রমাণ।
ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে।উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যকে যুক্ত করে রেখেছে মাত্র বাইশ কিলোমিটার প্রশস্ত এক সংকীর্ণ ভূখণ্ড, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘শিলিগুড়ি করিডর এবং সাধারণ ভাষায় “চিকেন’স নেক” বলা হয়। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের মধ্যবর্তী এই ভূখণ্ডটি ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ। শিলিগুড়ি করিডর কেবল একটি যাতায়াতের পথ নয়, এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের লাইফলাইন। যদি কোনও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শত্রুদেশ এই করিডরটি বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে, তবে ভারতের মূল ভূখণ্ড। থেকে সম্পূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এই অঞ্চলের মাধ্যমেই ভারত-চিন সীমান্তের ‘লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল’-এ সৈন্য ও রসদ পাঠানো হয়। অতীতে বিএনপির শাসনকালে ভারতের উত্তর-পূর্বের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি (যেমন উলফা) বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিল; তারেক সরকারকেই এই ঝুঁকির মূলোৎপাটন করতে হবে।
ক্ষমতা ও কূটনীতির এই জটিল বিন্যাসকে নৈর্ব্যক্তিক চশমায় ব্যবচ্ছেদ করতে হলে কিছু মৌলিক ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসে পড়েই। শাসকের চোখে যা কৌশলগত বিজয়, সাধারণ মানুষের চোখে তা অনেক সময় অস্তিত্বের সংকট। পরিশেষে প্রশ্ন থাকুক সেই নৈতিকতার কাছে ভারত কি তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির কাছে কেবল এক ‘বিগ ব্রাদার’-এর প্রতিচ্ছবি হয়েই থাকবে, নাকি এক বিশ্বস্ত ও সমমর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে? কূটনীতির ল্যাবরেটরিতে যখন সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ চলে, তখন যেন ভুলে না যাওয়া হয় যে মানচিত্রের কাঁটাতার কেবল ভূখণ্ডকে ভাগ করে, ইতিহাস ও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে নয়। ঠিক এখানেই মৈত্রীর বড় পরীক্ষা।