অনলাইন প্রতিনিধি :-আগরতলা-সাক্রম জাতীয় সড়ক থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে চাম্পামুড়া।মানচিত্রে ছোট্ট একটি বিন্দু হলেও, আজ এই প্রান্তিক গ্রাম যেন নিজের পরিচয় নতুন করে লিখছে ফুলের রঙে। চারদিকে টিলাভূমি ঘেরা এই গ্রামে একসময় কৃষিকাজ মানেই ছিলো লড়াই- কম জমি, কম ফলন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।বছরের পর বছর ধরে চিরাচরিত চাষাবাদ করেও কৃষকদের জীবন তেমন কোনো বদল আসছিল না।
চাম্পামুড়ার বেশিরভাগ মানুষই বরাবর কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।কিন্তু বিস্তীর্ণ টিলাভূমির কারণে সমতল চাষযোগ্য জমি খুবই সীমিত। দুই-আড়াই দশক আগে যাদের হাতে তুলনামূলক বেশি টিলাভূমি ছিল, তাঁরা রাবার চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। রাবার বাগান গ্রামের একাংশকে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বী করলেও, যাদের জমি কম ছিলো তাদের জীবনযাত্রার মান প্রায় একই রয়ে যায়।ধীরে ধীরে অনেকের মনেই জন্ম নিতে থাকে প্রশ্ন- এই কৃষিকাজ করে আর কতদিন?এই প্রশ্নের উত্তর যেন হঠাৎ করেই এসে গেলো ২০২৪ সালের এক শীতের সকালে। বিশালগড় কৃষি সেক্টরের উদ্যোগে আত্মা প্রকল্পের অধীনে গ্রামের ৫০ জন কৃষককে নিয়ে আয়োজন করা হয় ফুল চাষ বিষয়ক একটি কর্মশালা। নতুন ফসল, নতুন চিন্তাভাবনা আর সরকারী সহায়তার সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে সেই কর্মশালাই চাম্পামুড়ার কৃষকদের জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।বিশালগড় কৃষি উদ্যান অফিসের তত্ত্বাবধানে প্রথমবারের মতো ১৪ জন কৃষক ২ হেক্টর জমিতে গাঁদা ফুল চাষের সিদ্ধান্ত নেন। কৃষি দপ্তরের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ওই জমির জন্য ৮০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদানও মেলে। প্রথম দিকে অনেকের মনেই সংশয় ছিলো- ফুল চাষ কি সত্যিই লাভজনক হবে? কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সংশয় কেটে যায়। মাঠজুড়ে ফুটতে থাকা হলুদ-কমলা গাঁদা যেন শুধু ফুল নয়, কৃষকদের জীবনে নতুন আশার প্রতীক হয়ে ওঠে। চাম্পামুড়ার ফুলের খবর দ্রুতই পৌছে যায় আগরতলায়।শহর থেকে সরাসরি ক্রেতারা গ্রামে আসতে শুরু মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে, কৃষকরা নিজের হাতে নিজের ফসলের দাম ঠিক করার সুযোগ পান। একটি গাঁধা ফুল ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২৫ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হতে থাকে।
বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের উৎসবের মরশুমে ফুলের চাহিদা ও দামে দুটোই বেড়ে যায়। এখন প্রতিদিন চাম্পামুড়া থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার ফুল পাড়ি দিচ্ছে আগরতলার বাজারে।ফুল চাষ যে কতটা লাভজনক হতে পারে, তার হিসেবও চোখে পড়ার মতো। মাত্র আধা কানি জমি থেকেই একজন কৃষক সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন। একটানা প্রায় তিন মাস ফুল বিক্রি করা যায়। যারা আগে চাষবাস ছেড়ে অন্য কাজের কথা ভাবছিলেন, তারা আবার মাঠে ফিরেছেন। এই সাফল্য দেখে গ্রামের অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হয়েছেন। চলতি বছরে নন্দন নট্ট, শিবু শীল, আশিস চক্রবর্তী, রিপন চৌধুরী,কাজল নমঃ, মানিক দেবনাথ-সহ মোট ৫৫ জন কৃষক এখন ফুল চাষের সঙ্গে যুক্ত।কৃষি দপ্তরও চাম্পামুড়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে আরও প্রকল্প অনুমোদন করেছে। জারবেরার মতো দামি ফুল চাষের জন্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গ্রিনহাউস তৈরি করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক চাষের জাতীয় মিশনের অধীনে দেওয়া হয়েছে ২.৫ লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদান। বিশালগড় কৃষি উদ্যান দপ্তরের সেক্টর অফিসার প্রবীর দত্ত বলছেন, দোআঁশ মাটি ফুল চাষের জন্য সবথেকে উপযোগী। তার কথায়, 'এখানে কিছু ফুলের ভ্যারাইটি এখনও ত্রিপুরায় সহজে পাওয়া যায় না, অথচ সেগুলি সারা বছর চাষ করা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা করলে ফুল চাষ চাম্পামুড়ার অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।' মানুষের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব আর রুচিবোধের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বজুড়েই ফুলের চাহিদা বাড়ছে। সেই চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে চাম্পামুড়ার কৃষকরা আজ শুধু নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছেন না, তৈরি করছেন এক নতুন কৃষি মডেল। টিলাভূমি ঘেরা এক প্রান্তিক গ্রামে ফুটে ওঠা এই ফুলচাষের গল্প প্রমাণ করে-সঠিক দিশা আর একটু সাহস থাকলে মাটির বুক থেকেও জন্ম নিতে পারে সম্ভাবনার নতুন রঙ।